রাজ্যের খবর

Behula River: স্বামী লখিন্দরকে নিয়ে যে নদীতে ভেসেছিল বেহুলার ভেলা

মনের সাহস ও শক্তিতে ভর করে যাত্রা চলতে থাকে। লক্ষ্য একটাই যে করেই হোক লখিন্দরের প্রাণ ফিরিয়ে আনা।

Truth Of Bengal: কলার ভেলায় লখিন্দরের দেহ নিয়ে বেহুলা নদীতে (Behula River) পাড়ি দিয়েছিলেন বেহুলা। জনশ্রুতি আছে, তারা ছয় মাস ধরে যাত্রা করে এবং গ্রামের পর গ্রাম পাড়ি দিতে থাকে। এই অবস্থায় মৃতদেহ পঁচে যেতে শুরু করে। তবুও দমে যাননি বেহুলা। মনের সাহস ও শক্তিতে ভর করে যাত্রা চলতে থাকে। লক্ষ্য একটাই যে করেই হোক লখিন্দরের প্রাণ ফিরিয়ে আনা।

গ্রামবাসীরা তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন মনে করতে থাকে। কান দেননি বেহুলা। মনসার কাছে প্রার্থনা অব্যাহত রাখে সে। বেহুলা নদীতে ভেলায় ভাসতে ভাসতে মনসার সহচরী নেতার ঘাটে এসে ভিড়ল তার ভেলা। বেহুলার প্রার্থনা শুনে নেতা তাঁকে মনসার কাছে নিয়ে গেলেন। তখন মনসা বললেন, তুমি লখিন্দরকে ফিরে পাবে, যদি তুমি তোমার শ্বশুড়কে আমার পূজারী করতে পারো।

প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন অংশে বেহুলা নদীর উল্লেখ পাওয়া যায়। বিশেষ করে মনসামঙ্গল কাব্যে বেহুলা ও লখিন্দরের কাহিনীর সাথে এই নদীর সম্পর্ক রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে, বেহুলা নদী পাঁশকুড়া এবং তমলুকের উপর দিয়ে বয়ে যেত। বেহুলা নদীকে কেন্দ্র করে জনপদ গড়ে উঠেছিল এবং সেখানকার মানুষজন নদীর জলে চাষাবাদ করতেন। ঐতিহ্যবাহী বেহুলা নদী আজ অস্তিত্ব হারাতে বসেছে।

এই নদীকে (Behula River) ঘিরে রয়েছে একাধিক গল্পগাথা। এই নদীর দু’ধার ছিল একসময় জন-কল্লোলিনি। গড়ে উঠেছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। এখন শুধুই আঁধার। স্রোত হারিয়ে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যের বেহুলা। বেহুলা-লখিন্দরের ঘটনা নিয়ে দুই বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে নানা লোককাহিনী প্রচলিত আছে। এই লোককাহিনীকে কেন্দ্র করেই কানা হরিদত্ত, বিপ্রদাস পিপলাই, বিজয়গুপ্ত, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ, দ্বিজ বংশীদাস প্রমুখ মনসামঙ্গল-পদ্মপুরাণসহ নানা কাব্য রচনা করেছেন। আর মনসামঙ্গল কাব্যে যে উজানীনগরের কথা বলা আছে, সেটা যে কোথায় ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না। তবে জনশ্রুতি অনুযায়ী পুরাতন মালদার শহর ঘেঁষে বয়ে গেছে যে বেহুলা নদী তার তীরেই ছিল উজানী নগর।

এক সময় সারা বছরই নদীখাত দিয়ে বয়ে যেত জল‌। মালদা জেলার ঐতিহ্যবাহী নদী গুলির মধ্যে এটি (Behula River) ছিল অন্যতম‌। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসেও উল্লেখ ছিল এই নদীর কথা। কিন্তু বর্তমানে এই নদী ছোট নালার মত আকার ধারণ করেছে‌। অধিকাংশ জায়গায় তার অস্তিত্ব হারিয়েছে। পুরাতন মালদার নারায়ণপুর এলাকার শিল্পতালুকের নির্গত বর্জ্য সরাসরি বেহুলা নদীতে মিশছে। ফলে দুর্গন্ধে নদীর ধারে যেতে পাড়ছেন না পুরাতন মালদা ব্লকের মঙ্গলবাড়ী অঞ্চলের জলঙ্গা মৌলপুর সহ একাধিক গ্রামের বাসিন্দারা।

একটা সময়ে নদী খাত দিয়ে সারাবছর জল বয়ে যেত। আশেপাশের গ্রামের বাসিন্দারা নিয়মিত ব্যবহার করতেন এই নদীর জল। এই নদীর জলের উপর ভরসা করেই অনেকে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। স্থানীয় মৎস্যজীবীরা নিয়মিত মাছ ধরতেন। আশেপাশে গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, নারায়ণপুর এলাকায় যে সমস্ত কলকারখানা রয়েছে তার দূষিত বর্জ্য সরাসরি মিশছে বেহুলা নদীতে। ফলে বিষাক্ত হয়ে উঠেছে বেহুলা নদীর জল। এর ফলে নদীর জল আর ব্যবহার করা যায় না। কোন কারণবশত ছেলেমেয়েরা নদীর জলে হাত পা ধুয়ে নিলে চুলকানি হয়ে যায়।

অন্যদিকে এই দূষিত জল থেকে মশা মাছির উপদ্রব বাড়ছে। মশারি টাঙানো ছাড়া বাড়িতে থাকা যায় না। তাই অবিলম্বে এই বেহুলা নদী সংস্কারের দাবি তুলেছেন তারা। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বেহুলা নদীর অস্তিত্ব এখনও স্পষ্ট। পাঁশকুড়ার বেশ কিছু এলাকার মানুষজন এখনও বালির প্রয়োজনে মজে যাওয়া বেহুলার (Behula River) খাত খনন করে বালি তুলে আনেন।  বেহুলা নদীকে হয়তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না। কিন্তু এখনও বন্যা হলে বেহুলা জেগে ওঠে। বয়ে যায় আপন ছন্দে। বেহুলা আসলে কংসাবতীরই স্রোত ছিল এক সময়ে। পাঁশকুড়া পুরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের গড় পুরুষোত্তমপুর থেকে প্রতাপপুর, চাঁচিয়াড়া, আটবেড়িয়া সুন্দরনগর, রঘুনাথবাড়ি হয়ে তমলুকে রূপনারায়ণ নদের সঙ্গে মিশেছিল কাঁসাইয়ের সেই স্রোত। গড় পুরুষোত্তমপুর থেকে তমলুক পর্যন্ত কাঁসাইয়ে অংশটি বেহুলা নদী নামে পরিচিত ছিল।

Related Articles