স্বাস্থ্য

ঘুমোনোর সময় কোথায় রাখেন ফোন? এখনই সতর্ক হওয়ার বার্তা স্নায়ু বিশেষজ্ঞের

ঘুমের ব্যাঘাত হলে মনোযোগ কমে, স্মৃতি দুর্বল হয় এবং পরের দিন ক্লান্তি ও ঝিমুঝিম ভাব দেখা দিতে পারে।

Truth Of Bengal: দ্রুতগতির জীবনে সকালে ঘুম ভাঙতেই ফোন হাতে নেওয়া, রাতে চোখ বন্ধ করার আগেও শেষবারের মতো স্ক্রিন দেখা- সবটাই যেন অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই ফোন বালিশের পাশেই রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। এই অভ্যাস যে ঘুমের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে, তা জানালেন ফর্টিস নয়ডার নিউরোলজি বিভাগের ডিরেক্টর ডা. জ্যোতি বালা শর্মা।

তিনি জানান, ফোনের আলো, হঠাৎ নোটিফিকেশনের কম্পন, আর ঘুমোনোর ঠিক আগে স্ক্রিন চেক করার অভ্যাস-সব মিলিয়ে শরীরের প্রাকৃতিক ঘুমচক্রে গোলমাল তৈরি হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই অভ্যাস বজায় থাকলে শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক ভারসাম্য এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতায় প্রভাব পড়তে পারে।

ডা. শর্মার মতে, ঘুম শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দিনের ক্লান্তি থেকে সেরে ওঠে, টক্সিন বের করে দেয়, আবেগ স্থিতিশীল রাখে এবং শেখার ক্ষমতা বাড়ায়।

বিশ্রামপূর্ণ ঘুমের সময় শরীর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে, কোষ মেরামত করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মজবুত করে। তাই ঘুমের ব্যাঘাত হলে মনোযোগ কমে, স্মৃতি দুর্বল হয় এবং পরের দিন ক্লান্তি ও ঝিমুঝিম ভাব দেখা দিতে পারে।

কীভাবে ফোন ব্যাহত করে শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি

আমাদের শরীরের একটি প্রাকৃতিক ঘড়ি আছে—‘সারকাডিয়ান রিদম’। আলো–অন্ধকারের উপর ভিত্তি করে এটি শরীরে ঘুম–জাগরণের সংকেত দেয়। রাতে অন্ধকার হলে মস্তিষ্ক মেলাটোনিন নামক ঘুমের হরমোন নিঃসরণ করে।

কিন্তু স্মার্টফোন, ট্যাব বা ল্যাপটপের নীল আলো এই প্রাকৃতিক সংকেতকে ভুল পথে নিয়ে যায়। নীল আলো দিনের আলোর মতো কাজ করে এবং মেলাটোনিন বিচ্ছুরণে বাধা দেয়। ফলে রাতে হলেও মস্তিষ্ক ভাবতে শুরু করে এখনো দিন চলছে।

২০২৫ সালে JAMA Network Open-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, শোবার ঠিক আগের এক ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহারকারীদের ঘুমের মান ৩৩ শতাংশ কম থাকার সম্ভাবনা বেশি। তাদের ঘুমের সময়ও সামান্য কমে যায় এবং সকালে ঘুমঘোর কাটতে দেরি হয়।

সমস্যা শুধু আলো নয়। ফোনের কনটেন্টও মস্তিষ্ককে সক্রিয় করে রাখে। সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিং, ভিডিও দেখা, মেসেজ পড়া বা কাজের ইমেইল চেক করা—সবই মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে তোলে, যা ঘুমিয়ে পড়াকে কঠিন করে দেয়। ফলে ঘুম বারবার ভেঙে যায় এবং গভীর ঘুমে পৌঁছনো যায় না।

ঘুম রক্ষা করতে যে সহজ অভ্যাসগুলি কাজে আসবে

ডাক্তারদের পরামর্শ, শোবার আগে অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা উচিত। এতে মেলাটোনিন স্বাভাবিকভাবে বাড়তে সাহায্য করে।

  • ঘর অন্ধকার রাখা
  • প্রয়োজনে হালকা লাল আলো ব্যবহার
  • সকালে কিছুক্ষণ রোদে থাকা
  • এসব অভ্যাস ঘুমচক্রকে নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

রাতে ফোন দূরে রাখা কেন জরুরি?

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ফোন শোবার ঘরের বাইরে রাখা বা অন্তত হাতের নাগালের বাইরে রাখা উচিত। এতে ঘনঘন ফোন দেখার প্রবণতা কমে। ডা. শর্মার মতে, “ফোন দূরে থাকলে মনও আরাম পায়। অনেকেই বুঝতে পারেন না ফোনের উপস্থিতিই ঘুমে কতটা ব্যাঘাত ঘটায়।” নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ মোড ব্যবহার বা অন্য ঘরে ফোন চার্জ করাও উপকারী।

শুধু স্ক্রিন নয়, ঘুমের জন্য আরও যে অভ্যাস জরুরি

  • রাতের খাবার ঘুমের কয়েক ঘণ্টা আগে সেরে ফেলা
  • অতিরিক্ত ভারী বা মশলাদার খাবার এড়ানো
  • প্রতিদিন ৩০–৪৫ মিনিট ব্যায়াম
  • ঘুমের আগে বই পড়া, হালকা সঙ্গীত শোনা বা রিল্যাক্সেশন অনুশীলন
  • এগুলো ঘুমকে আরও স্বস্তিদায়ক করে তোলে

ডিজিটাল ডিভাইস আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে এগুলোর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি। অনেকেই বুঝতে পারেন না খারাপ ঘুম কীভাবে দিনের কাজ, মন-মেজাজ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা উৎপাদনশীলতায় প্রভাব ফেলে।

Related Articles