জয়ন্ত চক্রবর্তী: এই বদলটা খুব চোখে পড়ার মতো। সত্তর দশকের একজন বাঙালির সঙ্গে আজকের বাঙালির তফাৎটা চোখে লাগে। একটু যেন বড় বেশিই লাগে। বলতেই পারেন যুগ পাল্টে যাচ্ছে আর সময়ের সঙ্গে চলার নামই– জীবন। অস্বীকার করি না, পাশাপাশি মনে হয় নাকি দাও ফিরে সেই জীবন যা অনেক বেশি সরল ছিল। অনেক বেশি সহজ ছিল। সেই যুগের সঙ্গে এই যুগের একটি বড় তফাৎ হল তখন মোবাইল ফোনের চল হয়নি। আমাদের মা-কাকিমারা হা-পিত্যেশ করে বসে থাকতেন কখন বাড়ির কর্তা আপিস থেকে ফিরবেন কিংবা বাড়ির ছোট ছেলেটা কলেজ থেকে ফিরবে। আজকের মতো ফোনের কয়েকটা বোতাম টিপেই কর্তার সুলুক সন্ধান নেওয়া যেত না কিংবা ছোট ছেলের হাল হকিকতও জানা যেত না (Bengali lifestyle transformation)।
আজকের মোবাইল ফোন অনেক প্রগতি এনেছে, কিন্তু হারিয়ে গেছে সেই উদ্বেগ কিংবা আবেগ। মোবাইল ফোন বেগ দিয়েছে নিশ্চয়ই কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ। স্মার্টফোন তো আজ বাঙালির হাতে হাতে। সকালবেলা খবরের কাগজের জন্য আকুলতা বা অফিস অথবা কলেজের জন্য জামা ইস্ত্রি করতে করতে রেডিয়োর খবর শোনা কিংবা রাতের বেলা ডিডি সেভেন-এর বাংলা সংবাদ শোনার তাগিদ এখন নেই। মুঠো ফোনেই সব খবর চলে আসছে। আমেদাবাদে ভয়াবহ প্লেন অ্যাক্সিডেন্ট হলে তার খবর জানার জন্যে সকালের কাগজ পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। স্মার্ট ফোন বাঙালিকে আজ সব খবর দিয়ে দিচ্ছে। দিচ্ছে বিনোদনের সম্ভারও। অতএব বাঙালি এখন আর খবরের দাস নয় বরং খবরই বাঙালির দাস (Bengali lifestyle transformation)।
আরও পড়ুন: Flamengo: ক্লাব বিশ্বকাপে ফ্ল্যামেঙ্গোদের কাছে হার ব্লুজদের, জয় বায়ার্ন, বেনফিকার
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে পাড়ার দাস কেবিন কিংবা ব্যানার্জি কেবিনে একটা ডাবলহাফ চা আর কড়কড়ে টোস্ট খেতে খেতে রাজা-উজির মারার দিন শেষ। টি ব্যাগ এসে গিয়েছে! টোস্ট মেকারও এসে গিয়েছে। এখন শুধু একটা বোতাম টেপার অপেক্ষা। ব্যাস তৈরি চা-টোস্ট। বাঙালির সকালের জলখাবারও বদলে গিয়েছে। আগে পাড়ার উড়ের দোকান থেকে সিঙ্গারা, কচুরি, রাধাবল্লভী আর আলুর দম আসতো। এখন বাঙালি সকালের জল খাবারকে ব্রেকফাস্ট বলতে শিখেছে। কচুরির জায়গা নিয়েছে ব্রেড বাটার ওমলেট। কিংবা জ্যাম-জেলি।। মা-কাকিমারা হলুদ গুঁড়ো ফুরিয়ে গেলে আজ আর পাড়ার মুদির দোকানে বাড়ির ছোট ছেলেকে পাঠান না। অনলাইন করে নেন (Bengali lifestyle transformation)।
এই অনলাইন আজকের বাঙালির এক অস্ত্র হয়েছে। আজকের প্রজন্ম খাবারও আনাচ্ছে সুইগি-জোম্যাটো মারফত অনলাইনে। পরনের জাঙ্গিয়াও আনাচ্ছে অনলাইনে। সেদিন পাড়ার এক রিক্সাওয়ালা খুচরো দিতে অপারগ হওয়ায় বলে বসলেন, অনলাইন করে দিন না। আমার ফোন পে, গুগল পে সব আছে। আরে বাবা! বাজার দোকানে গিয়ে বাজারি কিংবা দোকানির সঙ্গে দু-দণ্ড গল্প করার সুখ কী এই অনলাইনে পাওয়া যায়? নাকি পাড়ার মুদি দোকানির সঙ্গে বিনা আত্মীয়তার অচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা পড়া যায়?
আজকাল সিনেমা দেখতে কোনও বাঙালি আজ রাধা, পূর্ণ, প্রাচীতে কিংবা মিনার, বিজলি, ছবিঘরে ছোটে না। বরং শপিং মলের সিনেপ্লেক্সে বসে পপকর্ন চিবোতে চিবোতে উত্তম-সুচিত্রার পুরোনো বই থুড়ি ছবি দেখে আপ্লুত হয়। সেই ম্যাটিনি শো-এ রোদে পুড়ে সিনেমা দেখার কিংবা রাতের শো-এর রহস্যর হাতছানি আজ আর বাঙালির জন্যে নেই। হলগুলিই তো আজ আর নেই। কোথায় গেল প্রাচী? কোথায়ই বা ছবিঘর !সবই তো ছবি হয়ে গিয়েছে শপিং মলের আগ্রাসনে। বাঙালি আজ বাইরে বিলাস ভ্রমণে কিংবা খুব প্রয়োজনে হলুদ ট্যাক্সির সন্ধান করে না। ওলা কিংবা উবের খুঁজে নেয়। সেলুনে বাঙালি আজ আর চুল কাটাতে গিয়ে সেলুন মালিকের সঙ্গে সুখ-দুঃখের কথা ভাগ করে না। বাঙালি আজ ছোটে স্টাইলিশের কাছে। চুলের ছাট ফেরাতেও সেই স্টাইলিশ। বাঙালি আজ ডার্বির টিকিট কাটতে রাত জেগে লাইন দেয় না। অনলাইনে টিকিট কেটে নিলেই হল। টিফোর মাধ্যমে অনুরাগ কিংবা ক্লাবপ্রীতি বোঝানোর জন্যে অসংখ্য ফ্যান ক্লাব আছে না! সেই পাড়া থেকে একদঙ্গল মিলে পছন্দসই ক্লাবের পতাকা হাতে মাঠে যাওয়ার আনন্দটা যে আজ আর বাঙালির নেই। পাড়ার রোয়াকের আড্ডা আজ দূরঅস্ত! আজ বাঙালির যাবতীয় আড্ডা ফেসবুকে। লাইক আর শেয়ারের মৌতাতে গা ভাসিয়েছে বাঙালি। এই অবস্থা থেকে মুক্তি নেই (Bengali lifestyle transformation)।
Bangla Jago fb page: https://www.facebook.com/share/193NB43TzC/
আজকের বাঙালি জীবন-যন্ত্রণা ভুলতে বসেছে। বাড়িতে বসে নিমেষে জানতে পারছে স্বামী কিংবা ছেলের অবস্থান, অনলাইনে ঘরে বসে পেয়ে যাচ্ছে কচুর লতি পর্যন্ত। পথে বের হলেই ওলা-উবের মিলছে। জীবন অনেক সুগম হয়েছে। কিন্তু এতদ্বারা বাঙালি কি হারিয়ে ফেলছে না বহুশ্রমে আয়ত্ত করা ট্রেডমার্ক যা বাঙালিকে আলাদা করে রেখেছে ভারতের অন্য প্রদেশ থেকে? (Bengali lifestyle transformation)






