ভোটার তালিকা সংশোধন: নাগরিকের অস্তিত্ব ও সম্মানের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ
ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে এখন চলছে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া।
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম: একটা সময় ছিল, যখন নাগরিক হওয়ার মানে শুধু একটা দেশের মাটি, ভাষা, সংস্কৃতি আর সংবিধানে বিশ্বাস রাখা। আজ সেই পরিচয় আর এতটা সহজ নয়। আজ ‘নাগরিক’ পরিচিতির পেছনে খেলা করে অবিশ্বাস, রাজনৈতিক কৌশল, বিভাজনের রণনীতি। বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য নাগরিকত্ব যেন এক অবিরাম সংশয়ের পরীক্ষাকেন্দ্র। এক অদৃশ্য বৃত্ত, যার কেন্দ্রে প্রশ্ন, তুমি আদৌ এই দেশের কিনা (Voter List)?
ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে এখন চলছে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া। খাতায়-কলমে এটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, নিয়মিত রুটিন। বাস্তবে, এটি ক্রমেই রূপ নিচ্ছে এক নির্মম সামাজিক প্রকল্পে, যেখানে কিছু জনগোষ্ঠীকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। এই সংশোধন, যা মূলত ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য হওয়া উচিত, আজ যেন নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার এক ছায়াযুদ্ধে পরিণত হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের বহু সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলায়, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলিতে, বহু মুসলিম পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য হঠাৎ করেই ‘ডিলিটেড’ তালিকায়। কেউ জানেন না কেন, কী কারণে। নির্বাচন কমিশনের (Voter List) মাঠকর্মীরা মাঝেমধ্যে জানান— নথির অসঙ্গতি, স্থায়ী ঠিকানা যাচাই হয়নি, অথবা ‘ডাউটফুল’ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই ‘ডাউট’ কে তৈরি করছে? কীসের ভিত্তিতে?
এই সংশোধনের পিছনে এক গভীর রাজনৈতিক অভিসন্ধি লুকিয়ে আছে। মুখে বলা হচ্ছে, নির্ভুল তালিকা, ভুয়ো ভোটার শনাক্তকরণ। অথচ বাস্তবে কিছু নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয়, অনিশ্চয়তা আর অসম্মানের বীজ বোনা হচ্ছে। এক ধরনের ‘NRC by stealth’— অর্থাৎ ছদ্মবেশে জাতীয় নাগরিক পঞ্জির প্রয়োগ, যার লক্ষ্য আলাদা করে চিহ্নিত করা, মূল স্রোত থেকে একপাশে ঠেলে দেওয়া।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন বা রাজ্য প্রশাসনের তরফে দেওয়া প্রতিক্রিয়াগুলি প্রায়ই অস্পষ্ট, দায়সারা। তাদের যুক্তি, নিয়ম মেনেই যাচাই হচ্ছে। অথচ, এই নিয়মগুলিই যেন গোপন অস্ত্র। লোককে বিভ্রান্ত করা, দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ফাঁসিয়ে রাখা, দফায় দফায় কাগজপত্র জমা দিতে বাধ্য করা— এসব কি শুধুই প্রশাসনিক ত্রুটি, নাকি এক পরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণা?
এই ‘ছায়াযুদ্ধ’ শুধুমাত্র ভোটার তালিকার (Voter List) মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এক ধরনের স্মৃতি ও পরিচয়ের মুছে ফেলার প্রয়াস। আপনি দেশপ্রেমিক, আপনি স্বাধীনতা সংগ্রামীর বংশধর, আপনি করদাতা— এসবের মূল্য এখানে কিছুই নয়। যদি আপনার নাম সংশয়পূর্ণ তালিকায় পড়ে, আপনি একজন ‘সন্দেহভাজন’— যেন এক অপরাধী, যাঁকে প্রমাণ করতে হবে নিজের ভারতীয়তা।
সবচেয়ে যন্ত্রণার বিষয় হল, এই প্রক্রিয়ার শিকার হওয়া মানুষগুলির অধিকাংশই দরিদ্র, অশিক্ষিত বা সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দা। তাঁরা জানেন না কোথায় গেলে অভিযোগ জানাতে হয়, কীভাবে নথি সংশোধন করতে হয়, বা কেন তাঁদের নাম হঠাৎ তালিকা থেকে উধাও হয়ে গেল। কেউ কেউ তো এখনও জানেন না যে তাঁদের নামই নেই। তারা ভোটের দিন বুথে গিয়ে বুঝতে পারেন— তাঁরা আর ভোটার নন। এ যেন এক চূড়ান্ত অসম্মান— নাগরিকের অস্তিত্ব খারিজ করে দেওয়া, বিনা নোটিশে, বিনা অপরাধে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন এক দৃঢ়, নিরপেক্ষ, মানবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। যেখানে নাগরিকের পরিচয় তার ভাষা, ধর্ম, অঞ্চল দেখে নয়, বরং সাংবিধানিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে স্বীকৃত হবে। নাগরিকত্ব কোনও শর্তসাপেক্ষ অনুগ্রহ নয়— এটি একটি রাষ্ট্রের কাছে তার মানুষের প্রতি ন্যায্যতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি।
ভুলে গেলে চলবে না, এই দেশ গঠিত হয়েছে বহু জাতি, ভাষা, ধর্মের মিলনে। বিভাজনের রাজনীতি হয়তো তাৎক্ষণিক নির্বাচনী সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের ভিত ধ্বংস করে দেয়। ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো প্রক্রিয়া কখনওই এমন জায়গায় পৌঁছনো উচিত নয়, যেখানে নাগরিককে তার অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হয় বারবার, নিজের দেশেই।
একজন নাগরিকের ভোটাধিকার (Voter List) কেবল ভোট দেওয়ার অধিকার নয়, সেটি তার সম্মান, তার আত্মপরিচয়, তার মর্যাদার স্বীকৃতি। আর সেটি কেড়ে নেওয়া মানেই এক মৌলিক অধিকার হরণ। আজ যখন রাষ্ট্রের একাংশ সেই অধিকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে উদ্যত, তখন চুপ করে থাকা মানে এই ছায়াযুদ্ধের কাছে আত্মসমর্পণ করা।
প্রতিরোধই একমাত্র পথ। প্রতিটি সচেতন নাগরিক, সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব— এই লজ্জাজনক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। কারণ এই লড়াই শুধু মুসলমান বা প্রান্তিক মানুষের লড়াই নয়— এটি ভারতের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং সংবিধানের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।






