দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘স্বপ্নের ভারতবর্ষ’ ও আজকের ভারত
অন্যদিকে জাতীয় জীবনে যে-সব শিল্পী-সাহিত্যিক বিশেষভাবে অবদান রেখেছেন, তাঁদের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করা হয়ে থাকে।
স্বপনকুমার মণ্ডল: দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৯.০৭.১৮৬৩-১৭.০৫.১৯১৩) ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাঁর নিশ্চিত সাহিত্যচর্চা শুরু হয়েছিল বিলেত থেকে ফেরার পর। সাধারণভাবে বলা যায়, তিনি বাংলা সাহিত্যসেবায় সচেতন ভাবে আত্মনিয়োগ করেছিলেন উনিশ শতকের শেষ দশক থেকে। সেদিক থেকে তাঁর সাহিত্যচর্চার পরিসর দুই দশকের মতো। অথচ এই উনিশ-কুড়ি বছরের মধ্যেই দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর স্বকীয় প্রতিভায় বাংলা সাহিত্যে নানাদিক থেকে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। জনপ্রিয়তা ও মান্যতার দিক থেকে তিনিই রবীন্দ্রনাথের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিলেন। শুধু তাই নয়, বাঙালির জাতীয় জীবনের উন্মেষে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেই তাঁর নাম উচ্চারিত হয়েছিল।
অন্যদিকে জাতীয় জীবনে যে-সব শিল্পী-সাহিত্যিক বিশেষভাবে অবদান রেখেছেন, তাঁদের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করা হয়ে থাকে। সেদিক থেকে পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিসরে বাংলা কবি-সাহিত্যিকদের ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়। আর সেই কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে দ্বিজেন্দ্রলালের অবদান সবিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। বিশেষ করে তাঁর দেশাত্মবোধক গান ও নাটক সেক্ষেত্রে স্মরণে বরণীয় হয়ে রয়েছে। অথচ তারপরেও দ্বিজেন্দ্র-স্মরণ চাঁদসাগরের বা-হাতের পুষ্পাঞ্জলির মতোও নয়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, যেখানে রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’ থেকে ‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!’-র শতবর্ষ নানাভাবে উদযাপিত হয়েছে, সেখানে দ্বিজেন্দ্রলালের ‘ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’র জনপ্রিয় গানটি নিয়ে সেভাবে উচ্চবাচ্য হয়নি। অন্যদিকে তাঁকে শুধু ‘ধনধান্য’-এর কবি বা গীতিকারে সীমায়িত করে দেখানোর সঙ্কীর্ণ প্রয়াসও লক্ষ করা যায়। আসলে দ্বিজেন্দ্রলালের প্রতি বরাবরই নীরব উদাসীনতা বর্তমান। কেননা তিনি তো রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের মতো জনমোহিনী প্রভায় সমাদৃত হননি। সরকারি ঔদাসীন্যও সেক্ষেত্রে সমান সক্রিয়। সেবছর সরকারিভাবে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার পঁচাত্তর বছর পূর্তি উৎসব পালিত হয়েছে। অথচ সেক্ষেত্রে দ্বিজেন্দ্রলালের ভাগ্য বড়ই করুণ মনে হয়। তাঁর সুবিখ্যাত ‘যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিল জননী ! ভারতবর্ষ!’ কবিতাটির শতবর্ষ অতিক্রান্ত হয়েছে। তা নিয়ে কোনোরকম আশার বাণী শোনা যায়নি। শুধু তাই নয়, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রসঙ্গে তাঁর দেশাত্মবোধক নাটকগুলি বিশেষভাবে স্মরণীয়। অথচ তা নিয়েও দ্বিজেন্দ্রলালের প্রাসঙ্গিকতা বাঙালির মননচর্চায় কখনও ঠাঁই পায়নি। সেক্ষেত্রে তাঁকে নিয়ে আলোচনার পরিসর স্বদেশি যুগেই সীমিত হয়ে রয়েছে।
দ্বিজেন্দ্রলাল সাহিত্যিক হতে চেয়েছিলেন। শুধুমাত্র গীতিকার হওয়ার সদিচ্ছা তাঁর ছিল না। এজন্য তিনি কায়মনোবাক্যে সাহিত্যপ্রীতির কথায় অকপট হতে পেরেছিলেন। স্ত্রী-বিয়োগের (২৯ নভেম্বর ১৯০৩) পর হতাশাগ্রস্ত দ্বিজেন্দ্রলাল যখন বাকি জীবন কাটানোর দায় অনুভব করেছিলেন, তখনও তিনি সাহিত্যিক খ্যাতির প্রতি দৃষ্টিনিবদ্ধ করে চলেছিলেন। তা থেকে তাঁর সাহিত্যিক হওয়ার লক্ষ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯০৬-এর ২২ জুলাই-এ লেখা চিঠিতে তিনি দেবকুমার রায়চৌধুরীকে প্রসঙ্গক্রমে জানিয়েছেন ‘মাঝে মাঝে মনে হয় যে, আমার জীবনের উজ্জ্বল অধ্যায় শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন এ জীবন কেবল ধারণ করা মাত্র। পুত্র-কন্যা যদি না জন্মিত ও হয়ত এক দিন সন্ন্যাসী হয়ে বেরিয়ে যেতাম। নিজের ভোগ-লালসা বড় বেশী নাই যা আছে তা বোধ হয় বিনা বেশী আয়াসে ত্যাগ করতে পারি। তবে সাহিত্যিক যশ এখনও আমার কাছে অতি প্রিয়, আর সর্ব্বাপেক্ষা মন্টু-মায়ার মায়াই ত্যাগ করা শক্ত। সে টান বিষম টান।
তাহার জন্যই আজও দাস্য কচ্ছি।’ ফলে তাঁর ‘অতি প্রিয়’ ‘সাহিত্যিক যশ’ নাটকাদির মধ্যে প্রতিভাত হলেও তাঁর সাহিত্যিকখ্যাতির প্রতি উপেক্ষাজনিত উদাসীনতা বড় বেশি নির্মম মনে হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দ্বিজেন্দ্রলালের সাহিত্যিক প্রতিভার ইতিবাচক মূল্যায়ন প্রয়াসও সেক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। দ্বিজেন্দ্রলালের শতবর্ষে তাঁকে নিয়ে চর্চার অবকাশ লক্ষ করা যায়নি। তবে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকবছর পরে তাঁর উপর স্মারক বক্তৃতার আয়োজন হয়েছিল। এরকম বিজেন্দ্রলাল স্মারক বক্তৃতায় ১৯৬৬-তে সাহিত্যিক বনফুল ও ১৯৬৭-তে সাহিত্য-সমালোচক সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত অংশ নিয়ে তাঁর ইতিবাচক মূল্যায়নে ব্রতী হয়েছিলেন। বনফুলের ‘দ্বিজেন্দ্র-দর্পণ’ (১৯৬৭) এবং সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্তের ‘নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল’ তারই ফসলে সমৃদ্ধ। দুজনেই দ্বিজেন্দ্রলালের স্বকীয় প্রতিভার ফসলের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাঁর ‘উপেক্ষিত’ প্রকৃতিকে প্রকট করে তুলেছেন। কিন্তু ভাতে রবীন্দ্রময় বাঙালির মননশীলতায় কতটা প্রভাব পড়ছে, সে-বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ বর্তমান। অন্যদিকে দ্বিজেন্দ্রলালের মতো দেশপ্রেমিক সাহিত্যিককে অবহেলায় অনাদরে কীভাব বিস্মরণের পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। যে-সাহিত্যিকের মধ্যে আবাল্য দেশপ্রেমের সহজাত গুণ নিবিড় হয়েছিল আজীবন, তাঁর প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা ও শ্রদ্ধা দেখে কখনই মনে হয় না আমরা তাঁর ‘সকল দেশের সেরা’ দেশের নাগরিক। এম এ পরীক্ষা দেওয়ার বছরে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বায়ু পরিবর্তনের জন্য দ্বিজেন্দ্রলালকে দেওঘরে যেতে হয়েছিল। ঘুরতে গিয়ে তিনি পাহাড়ের উপরে গান ধরেছিলেন, ‘জানি না জননী, কেন এত ভালবাসি তোরে!’ উদাসীন বাঙালি মনেও কি সেই প্রশ্ন জেগে ওঠে না, তিনি কেন এই দেশ-জননীকে এত ভালোবসেছিলেন? নাকি তাঁর স্বপ্নের ‘ভারতবর্ষ’ এখনও বাস্তবায়িত হয়নি? মেলে না উত্তর।






