Harmony: শপথ হোক সাম্প্রদায়িকতা নয় সম্প্রীতি
শপথ নিতে হবে, আমরা কেউ ধর্মের নামে ঘৃণা করব না, কাউকে আঘাত করব না, বিভেদ ছড়াব না।
মহম্মদ মফিজুল ইসলামঃ ভারতবর্ষের ইতিহাস বারবার সাক্ষী থেকেছে— এ দেশের প্রাণশক্তির বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। এখানে হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিস্তান, বৌদ্ধ, জৈন সব ধর্ম, সব ভাষা, সব সংস্কৃতি যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি থেকেছে। একে অপরকে আপন করে নিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, স্বাধীনতা-উত্তর ভারতেও সেই ঐক্য বারবার বিপন্ন হয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ঘৃণা ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের জেরে।(Harmony)
স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা— মহাত্মা গান্ধি, জওহরলাল নেহরু, আবুল কালাম আজাদের পাশাপাশি সংবিধান প্রণেতা ভীমরাও আম্বেদকর প্রমুখ এক ধর্মনিরপেক্ষ, সাম্যের ভিত্তিতে গঠিত রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু বর্তমান ভারতে সেই স্বপ্ন যেন ক্রমে ফিকে হয়ে আসছে। রাজনীতির কারবারিরা আজ ধর্মকে ব্যবহার করছে ক্ষমতা অর্জনের সিঁড়ি হিসেবে। ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি ধর্মকে করেছে বিপজ্জনক অস্ত্র, যার ফলশ্রুতিতে বাড়ছে সামাজিক বিভেদ, দুর্বল হচ্ছে গণতন্ত্রের ভিত্তি।(Harmony)
ধর্মের অপপ্রয়োগ একটি ভয়ানক রাজনৈতিক কৌশল– ধর্মের অপপ্রয়োগ একটি ভয়ানক রাজনৈতিক কৌশল আজ ধর্ম আর ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গায় নেই। ধর্ম হয়ে উঠেছে জনমন বিভক্ত করার হাতিয়ার। ধর্মের নামে চলেছে হত্যা, মন্দির-মসজিদ বিতর্ক, স্কুল-কলেজে পোশাক নিয়ে নিষেধাজ্ঞা, ইতিহাস বিকৃতি, পাঠ্যবইয়ে পক্ষপাতদুষ্ট উপস্থাপনা। হিন্দু-মুসলমান বিভেদকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক ভাষ্য।
বিজেপির ‘মেজরিটারিয়ান’ রাজনীতির বিরুদ্ধে যেমন একাংশ সোচ্চার, তেমনই দেখা যাচ্ছে কিছু তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলও ভোটের স্বার্থে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের তোষণ করতে গিয়ে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। ফলত, সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যুবসমাজ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। তারা জানতেও পারছে না কোনটা সত্য, কোনটা প্রচারণা।(Harmony)
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নির্মম বাস্তবতা– মুজফফরনগর, গুজরাট, দিল্লি, ভাগলপুর, কানপুর— সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ইতিহাস ভারতের গায়ে একের পর এক রক্তাক্ত দাগ রেখে গেছে। প্রতিবারই নিরীহ মানুষ, বিশেষত দরিদ্র ও শ্রমজীবী শ্রেণি এই সংঘর্ষের বলি হয়েছে। ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা, বা ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গা— এইসব ঘটনার নেপথ্যে ছিল পরিকল্পিত উস্কানি, রাষ্ট্রীয় নিষ্ক্রিয়তা বা পক্ষপাত।
[আরও পড়ুনঃ Bengali Horoscope: চিকিৎসার জন্য বাড়বে খরচ ! কী আছে আজ আপনার ভাগ্যে?]
গোটা বিশ্ব যখন সাম্যের ভিত্তিতে সমাজ গঠনের দিকে এগোচ্ছে, তখন ভারতবর্ষে ধর্মের নামে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া, টেলিভিশন ও রাজনৈতিক মঞ্চে। সমাজের একাংশ যখন একে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছে, তখন আর এক অংশ প্রাণপণে চেষ্টা করছে মানবিকতা ও সহাবস্থানের বার্তা ছড়িয়ে দিতে।
ধর্ম– যে ছিল শান্তির প্রতীক, আজ হয়ে উঠেছে বিভেদের মুখোশ। গৌতম বুদ্ধ ‘মধ্যম পথ’-এর কথা বলেছিলেন, যিশু বলেছিলেন ‘ভালবাসো তোমার প্রতিবেশীকে’, শ্রীচৈতন্য প্রচার করেছিলেন ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরপ্রাপ্তি, আর হজরত মুহাম্মদ (সঃ) প্রচার করেছিলেন সহানুভূতি, দয়া ও ন্যায়বিচার। কিন্তু আজ তাঁদের দেখানো ধর্মের পথ কলুষিত হচ্ছে বিদ্বেষ-নিন্দা-ঘৃণায়।
[লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/truthofbengal]
ধর্মের মূল কথা ছিল— ভালবাসা, সহানুভূতি ও আত্মিক উন্নতি। অথচ ক্ষমতালিপ্সু কিছু মানুষ ও ভণ্ড ধর্মগুরুর মাধ্যমে সেই ধর্মই আজ হয়ে উঠেছে বিভাজনের অজুহাত। দুঃখজনকভাবে, অনেক তরুণই এই ঘৃণার রাজনীতিতে অন্ধভাবে শামিল হচ্ছে। না জেনেই নিজের হাতে নিজ দেশের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে।(Harmony)
সচেতনতা ও শিক্ষা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রধান হাতিয়ার— শিক্ষা, যুক্তিবাদ ও ঐতিহাসিক সত্যের আলোই পারে এই অন্ধকারকে সরাতে। পাঠ্যপুস্তকে ধর্মনিরপেক্ষতার সঠিক ইতিহাস ও ভাবনার অবিচল প্রচার জরুরি। গণমাধ্যমকে হতে হবে আরও দায়িত্বশীল, যাতে তারা আর উস্কানিমূলক বিভাজনকারী প্রচার না করে। সর্বোপরি, অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজ-নেতাদের দায়িত্ব— নতুন প্রজন্মকে সহনশীলতা ও মানবিকতা শেখানো। আমরা যেন শিশুকে শিখাই, ‘তুই আগে মানুষ হ’, ধর্ম বা জাত নয়, মানবিকতাই আসল পরিচয়।
একটি নতুন প্রজন্ম, একটি নতুন প্রতিশ্রুতি— আজ প্রয়োজন এক নতুন শপথের। শপথ নিতে হবে, আমরা কেউ ধর্মের নামে ঘৃণা করব না, কাউকে আঘাত করব না, বিভেদ ছড়াব না। প্রতিটি ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, নিজের পরিচয় বজায় রেখেও আমরা সকলে যেন বলতে পারি— ‘আমি আগে ভারতীয়, আমি আগে মানুষ’।
প্রতিটি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিককে সজাগ থাকতে হবে যেন তারা বাইরের প্ররোচনায় বা ভেতরের উস্কানিতে বিভ্রান্ত না হয়। যেন কখনওই যুক্তিহীন, অন্ধ আবেগে ভেসে গিয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাই অস্ত্র না তোলে।
শান্তি, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের দীপ্ত প্রতিজ্ঞা– যেদিন হিন্দু-মুসলমান, সনাতন-শিখ-খ্রিস্টান, উচ্চ-নীচ, ছোট-বড় সবাই মিলে একই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসবে প্রীতি ও ঐক্যের মঞ্চে, সেদিনই সত্যিকার ভারত গড়ে উঠবে। সেদিন রাজনীতির কুৎসিত ছায়া সরে গিয়ে উঠবে মানবিকতার নতুন সূর্য।
আসুন, আমরা সকলে একসঙ্গে উচ্চারণ করি-
আজকের শপথ হোক- সাম্প্রদায়িকতা নয়, সম্প্রীতি।
ধর্ম নয়, মানবতা।
ঘৃণা নয়, ভালবাসা।


