এলপিজি সমস্যা কি দূর হবে সহজে?
ভারত তার প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৫০ শতাংশ এলএনজি হিসাবে আমদানি করে।
রাজাগোপাল ধর চক্রবর্ত্তী: পশ্চিম এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং শক্তি আমদানির উপর নির্ভরতার কারণে ভারত এক বহুমুখী শক্তি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ভারতের আমদানিকৃত এলপিজির প্রায় ৯০ শতাংশ ও এলএনজির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে যায়। ইজরায়েল, ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনায় ব্যবসা বাণিজ্য লাঠে উঠেছে। জাহাজ চলতে পারছে না। বসছে বাড়তি যুদ্ধ বিমা প্রিমিয়াম। ডেমারেজ ফি বাড়ছে। নেই পর্যাপ্ত ট্যাঙ্কার। বার্ষিক এলপিজি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বিদেশ থেকে। সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহিই যোগান দেয়। ওদের সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপদে আসলে আমরা নিরুপায়। রান্নাঘরের নীরবতায় তোলপাড় অর্থনীতি-রাজনীতি। ভোক্তাদের মন যুগিয়ে চলতে দিতে হচ্ছে ভর্তুকি, বন্ধ হচ্ছে অন্য সব খাতে এলপিজি ব্যবহার।
ভারতে এলপিজি ব্যবহারকারীর এক তৃতীয়াংশ প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনার নিম্ন আয়ের পরিবার। এদের সংখ্যা বর্তমানে ১০.৫৬ কোটি। তারা বছরে সর্বোচ্চ ৯টি ১৪.২ কেজি সিলিন্ডার পেতে পারে ৩০০ টাকা ভর্তুকিতে। এরা আধুনিক জ্বালানিতে এখন এতটাই অভ্যস্ত যে পুরানো কাঠ-কয়লা-ঘুঁটেতে ফেরার উপায় নেই। গার্হস্থ্য রান্নাঘরে জন্য উচ্চ দাম এবং সরবরাহের অগ্রাধিকারে অন্ধ্রপ্রদেশ এবং কেরলের আতিথেয়তার ক্ষেত্রে ব্যপক নিয়ন্ত্রণ এসেছে। মেনু আইটেম বা অপারেটিং সময় হ্রাস করতে বাধ্য হচ্ছে শহরের রেস্তোরাঁগুলি। অপরিশোধিত তেলের তুলনায় ভারতে এলপিজির পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুদের অবকাঠামো নেই।
রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি:
ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে সেভাবে তেলের দাম বাড়েনি, তার বড়ো কারণ ‘ভারতের ত্রাতা’ হিসাবে রাশিয়ার এগিয়ে আসা। শুধুমাত্র ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ভারত ৫.৮ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের রাশিয়ান জীবাশ্ম জ্বালানী আমদানি করেছে। বিশাখাপত্তনম এবং ম্যাঙ্গালোরের রাষ্ট্রায়ত্ত রিফাইনারিগুলি যারা রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল শোধনে অভ্যস্ত তারা এখন পুনরায় রাশিয়া তেলের পরিশোধন শুরু করেছে। কোনও কোনও প্লান্টে রাশিয়ান অপরিশোধিত তেলের যোগান বেড়েছে মাসিক ১৪৮ শতাংশ। এতে অভ্যন্তরীণ দাম স্থিতিশীল রয়েছে।
ভারত এবার এলপিজি এবং এলএনজি কিনতে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে। নিষেধাজ্ঞার সাময়িক নিষ্কৃতি মেলার পর এই প্রথম রাশিয়ার এলএনজি সক্রিয়ভাবে ভারতে যাচ্ছে। রাশিয়ার বছরে ১৫ লক্ষ টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন পোর্টোভায়া প্ল্যান্ট থেকে ভারতে আসছে। লিখিত চুক্তির ঝামেলায় মৌখিক চুক্তির ভিত্তিতেই রাশিয়া ভারতকে সরাসরি এলএনজি দিচ্ছে। এই গ্যাসের বৃহত্তর, আরও নিয়মিত সরবরাহের জন্য ভারত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ছাড় চাইছে। ভারতে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ এলপিজি ঘাটতি পূরণে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে, রাষ্ট্র পরিচালিত এইচপিসিএল বাল্টিক সাগরে রাশিয়ার উস্ট-লুগা বন্দর থেকে সরাসরি ১২,০০০ টন বিউটেন এবং ৮,০০০টন প্রোপেন কিনছে। এলপিজি প্রোপেন এবং বিউটেন হাইড্রোকার্বন গ্যাসের একটি জ্বলনযোগ্য মিশ্রণ।
রাশিয়া ভারতকে আরও জীবাশ্ম জ্বালানী দিতে আগ্রহী, কিন্তু দুটো বড় বাধা রয়েছে। জাহাজের ঘাটতি সবচেয়ে বড় সমস্যা। কূটনৈতিক সংঘর্ষ এড়াতে নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকা আর ইরানের সাথে সম্পর্কিত নয় এইরকম ট্যাঙ্কার খুঁজতে হচ্ছে। ভরসা করতে হচ্ছে ‘ছায়া বহর’কে। এরা মূলধারার শিপিং শিল্পের বাইরে কাজ করা বার্ধক্যে পৌঁছনো ট্যাঙ্কার। এদেরও একটি বিশাল, বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্ক আছে। বহু বছর ধরে বিদ্যমান থাকলেও রাশিয়ান তেল ও গ্যাস পরিবহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা ইরান এবং ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলিকে নিষেধাজ্ঞা আসতেই এদের প্রয়োজন বেড়েছে। মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, লাইবেরিয়া বা পানামার মতন শিথিল তদারকির দেশে গজিয়ে ওঠা শেল কোম্পানি, অর্থাৎ অফিস কর্মচারী বিহীন কেবল কাগজে বিদ্যমান ব্যবসায়িক সত্ত্বা, এদের মালিক। এই ট্যাঙ্কারগুলির বেশিরভাগই সুরক্ষা উদ্বেগ এবং উচ্চ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের কারণে স্ক্র্যাপের জন্য বিক্রি হয়ে গিয়েছে। অবস্থান আড়াল করতে, বিশেষ করে অনুমোদিত বন্দরগুলিতে কার্গো লোডিংয়ের সময় এরা তাদের স্বয়ংক্রিয় সনাক্তকরণ সিস্টেম (এআইএস) ট্রান্সপন্ডারগুলি বন্ধ করে দেয়। এদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সুরক্ষা এবং ক্ষতিপূরণ বিমা থাকে না। এরা নির্দিষ্ট রাষ্ট্র-সমর্থিত বা অনিয়ন্ত্রিত বিমা ব্যবহার করে, ফলে বড় দুর্ঘটনা পড়লে নিষ্কৃতির সুযোগ নেই।
পারস্য উপসাগরের রাস তানুরা বা উম সাইদ বন্দর থেকে জামনগর, মুন্দ্রা বা মুম্বইয়ের মতো বন্দরগুলির দূরত্ব প্রায় ১,১০০ থেকে ১,৩০০ নটিক্যাল মাইল। জাহাজের সময় লাগে ৩ থেকে ৫ দিন। রাশিয়ার বাল্টিকসাগরে উস্ট-লুগা বা প্রিমোর্স্ক বন্দর থেকে ভারতের পশ্চিম উপকূলের বন্দরগুলির দূরত্ব প্রায় ৮,৬০০ থেকে ৯,০০০ নটিক্যাল মাইল, সময় লাগে ৩৫-৪৫ দিন। রাশিয়ার বাল্টিক বা আর্কটিক বন্দর থেকে তেল এবং এলএনজি ট্যাঙ্কার বাল্টিক সাগর, উত্তর সাগর, ইংলিশ চ্যানেল, জিব্রাল্টার প্রণালী, সুয়েজ খাল, লোহিত সাগর, এডেন আরব সাগর দিয়ে মুন্দ্রা/জেএনপিটির মতো ভারতীয় বন্দরে যায়। হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে লোহিত সাগর এবং সুয়েজ অঞ্চলে বাধা থাকলে আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপ দিয়ে আসলে দশ পনেরো দিন বাড়তি লাগে। আবহাওয়া খারাপ থাকলে পুরানো ‘ছায়া বহর’ ট্যাঙ্কারগুলির গতি রুদ্ধ হয়। বাল্টিক রুটট উপসাগরীয় রুটের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি সময় নিলেও ‘হরমুজ-মুক্ত’ এই শিপিং রুট ভারতের শক্তি ব্যবস্থার অগ্রাধিকারে। মধ্যপ্রাচ্যে সম্পূর্ণ শিপিং শাটডাউন হলেও ভারতীয় শোধনাগার এবং এলপিজি বটলিং প্ল্যান্টগুলি অবিচ্ছিন্ন ভাবে তার রসদ পাবে।
ইরান সংঘাতের পর থেকে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত আর্গাস ক্রুড ট্যাঙ্কার ইনডেক্স ৫৪ শতাংশ বেড়েছে। ‘স্বাভাবিক’ জাহাজের খরচ এখন অতীতের জিনিস। উপসাগরীয় বন্দরগুলি থেকে পশ্চিম উপকূল রুটের দূরত্ব কম হলেও হরমুজ প্রণালী অবরোধের কারণে খরচ আকাশচুম্বী হয়েছে। শান্তির সময়ে প্রতি ব্যারেল ১.৫০ থেকে ২.০০ ডলারের তুলনায় এখন খরচ ব্যারেলে ১১ থেকে ১৫ ডলার। জাহাজের মালিকরা কেবল উপসাগরের মধ্য দিয়ে একক ট্রানজিটের জন্য জাহাজের মোট মূল্যের অতিরিক্ত ০.৫৫ শতাংশ থেকে ০.৮৫ শতাংশ চার্জ করছেন অতিরিক্ত যুদ্ধের ঝুঁকি প্রিমিয়াম হিসাবে।
এছাড়া রয়েছে ব্যাকলগ এবং সুরক্ষা চেকের কারণে ডেমারেজ বা ‘অপেক্ষার ফি’। বাল্টিক থেকে ভারত রুটে দীর্ঘ দূরত্বের কারণে প্রতি ব্যারেল খরচ পরে ২০ থেকে ২৫ ডলার। ইউরালস অপরিশোধিত তেল বর্তমানে রাশিয়ান বন্দরগুলিতে ৭৩ থেকে ৭৭ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। সুয়েজ খাল ফি, শিপিং, বিমা এবং মধ্যস্থতাকারী ফি ২৫ থেকে ৪৮ ডলার নিয়ে ভারতীয় বন্দরগুলিতে পৌছনোর পর খরচ দাঁড়াচ্ছে ব্যারেল প্রতি ১০০ থেকে ১২৫ ডলারে। বাল্টিক রুটটি লজিস্টিকের দিক থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যয়বহুল হলেও শক্তি সুরক্ষার দিক থেকে ‘সস্তা’।
তবে রাশিয়ার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়া সঠিক পথ নয়। ভারত বার্ষিক ৩৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন (এমটি) এলপিজি ব্যবহার করে। এর প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করা হয়। বেশিরভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্যের কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে। রাশিয়া বর্তমানে ভারতের প্রয়োজনের এক থেকে দুই শতাংশ সরবরাহ করে। ভারত তার প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৫০ শতাংশ এলএনজি হিসাবে আমদানি করে। এই আমদানির প্রায় অর্ধেক আসে কাতার থেকে। রাশিয়ার বিশাল এলএনজি মজুদ থাকলেও ইয়ামাল এবং আর্কটিক এলএনজি ২ প্রকল্পগুলি থেকে যোগানের জন্য প্রাথমিকভাবে তারা চিন এবং ইউরোপের সাথে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
গ্যাস স্থানান্তরের সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হল পাইপলাইন। ইউরোপ বা চীনের মতো ভারতের রাশিয়া থেকে সরাসরি গ্যাস পাইপলাইন নেই। যে কোনও প্রস্তাবিত পাইপলাইন মধ্য এশিয়ার মধ্য দিয়ে আফগানিস্তান/পাকিস্তান (টিএপিআই রুট) বা হিমালয় (চিন রুট) অতিক্রম করতে হবে। উভয় রুটই রাজনৈতিক এবং ভৌগোলিকভাবে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। রাশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন গ্যাস প্রকল্প আর্কটিকে রয়েছে। আর্কটিক থেকে গ্যাস পরিবহনের জন্য বিশেষায়িত ‘আইস-ক্লাস’ এলএনজি ট্যাঙ্কার প্রয়োজন। এই জাহাজগুলির বিশ্বব্যাপী ঘাটতি রয়েছে এবং রাশিয়া থেকে পরিবহণের পশ্চিমী নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা বৃদ্ধি এবং সুইফট মেসেজিং সিস্টেম থেকে রাশিয়ার অপসারণের পর, ভারত রাশিয়া বাণিজ্যের আর্থিক লেনদেন মার্কিন ডলার বা ইউরোতে করা যাচ্ছে না। ভিটিবি, স্বারব্যাঙ্ক এবং ভিইবি এর মতন প্রধান রাশিয়ান ব্যাঙ্কের সুইফ্ট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। কোনও ভারতীয় ব্যাঙ্ক নিষিদ্ধ রাশিয়ান সংস্থার সঙ্গে বাণিজ্য করতে সুইফট ব্যবহার করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘গৌণ নিষেধাজ্ঞার’ মুখোমুখি হতে পারে। রাশিয়ান ব্যাঙ্কগুলি ইউকো ব্যাঙ্ক এবং ইন্ডাসইন্ডের মতো ভারতীয় ব্যাঙ্কগুলিতে বিশেষ ভস্ট্রো অ্যাকাউন্ট খুলেছে। ভারত যখন রাশিয়ার তেল কেনে তখন এই অ্যাকাউন্টগুলিতে ভারতীয় মুদ্রায় পেমেন্ট করা হয়। এরপর রাশিয়া সেই টাকা ব্যবহার করে ভারতীয় পণ্য (যেমন ওষুধ, চা বা যন্ত্রপাতি) কিনতে। ভারতীয় সরকারি বন্ডেও তারা বিনিয়োগও করে। সুইফট এবং মার্কিন ডলারকে সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ৯০ শতাংশ চলে এই প্রক্রিয়ায়। রাশিয়া সুইফটের বিকল্প সিস্টেম ফর ট্রান্সফার অব ফিনান্সিয়াল মেসেজ বা এসপিএফএস তৈরি করেছে। ভারত আর রাশিয়ার ব্যাঙ্কগুলি ইউরোপ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সার্ভার ব্যবহার না করে সরাসরি একে অপরকে পেমেন্ট করতে পারে। ব্রিকস-বিস্তৃত পেমেন্ট সিস্টেমে বাণিজ্য নিষ্পত্তির জন্য ভারত জাতীয় ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করার বড় সমর্থক। এর ফলে জামনগরের শোধনাগার সাইবেরিয়ার গ্যাস সরবরাহকারীকে তাৎক্ষণিকভাবে ডিজিটাল পেমেন্ট করতে পারবে।
রাশিয়া ভারতের কাছে তেল ও গ্যাস বিক্রি করে বিপুল ভারতীয় মুদ্রা জমিয়েছে যার সহজে খরচের রাস্তা নেই। চিনা ইউয়ান বা সংযুক্ত আরব আমিরশাহির দিরহামে পেমেন্ট দিলে রাশিয়ার সুবিধা। এতেও কূটনৈতিক অসুবিধা রয়েছে। অনেক বড় বেসরকারী ভারতীয় সংস্থা (যেমন টাটা বা ইনফোসিস) এখনও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য এড়িয়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে তাদের বিশাল ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে। তারা নন-সুইফট লেনদেন দ্বারা ‘কলঙ্কিত’ হতে চায় না।
সমাপ্তি মন্তব্য
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালী প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারতের বর্তমান জ্বালানি সঙ্কট একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে। জরুরি ব্যবস্থাপনা থেকে শক্তি ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত সংস্কার শুরু হয়েছে। বাজারের ‘কঠোরতা’ আর বেশ কিছু দিন থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট ভারতের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের অনুঘটক হিসাবে কাজ করবে।
সরকার অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনের অধীনে জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে। গার্হস্থ্য রান্নার গ্যাসকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় মজুদ প্রতিরোধের জন্য শহরাঞ্চলে ২৫ দিনের ন্যূনতম বুকিং ব্যবধান এবং গ্রামাঞ্চলে ৪৫ দিনের সর্বনিম্ন বুকিং ব্যবধান করার নির্দেশ রয়েছে। গার্হস্থ্য শোধনাগারগুলির এলপিজি উত্পাদন ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গৃহস্থালী গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখতে, সরকার শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে এলপিজি সরবরাহ ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। কৃষি খাতকে রক্ষা করতে সার কারখানায়
গ্যাসের অগ্রাধিকার পাচ্ছে। অন্য শিল্প ব্যবহারকারীদের অস্থায়ীভাবে কয়লা বা জ্বালানী তেলে ফিরে যেতে বলা হচ্ছে। ভারত সক্রিয়ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, নরওয়ে এবং কানাডার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করেছে। ‘নিশ্চিত কার্গো’র প্রতিশ্রুতিও পেয়েছে। ভারতে প্রায় ৬০-৭৪ দিনের অপরিশোধিত তেলের মজুদ থাকলেও এলপিজি ইনভেন্টরি আছে মাত্র ১৮ দিনের। ‘সিলিন্ডার সমস্যার’ দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হল সিলিন্ডারের সম্পূর্ণরূপে অপসারণ করা। প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন এখন ২৫,০০০ কিলোমিটার ছাড়িয়ে গিয়েছে। কলকাতা ও দিল্লির মতো শহরে পাইপযুক্ত প্রাকৃতিক গ্যাসের (পিএনজি) অবকাঠামোর সম্প্রসারণ হচ্ছে। যেখানে স্থিতিশীল পাইপযুক্ত নেটওয়ার্ক রয়েছে, সেখানে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ বন্ধ করার জন্য নিয়ম প্রবর্তন হচ্ছে। ভারতে ৫০ শতংশ অ-জীবাশ্ম জ্বালানী বিদ্যুতের ক্ষমতা পৌঁছনোর সাথে সাথে, সৌর-চালিত ইন্ডাকশন রান্না এলপিজির সস্তা, আরও ‘সার্বভৌম’ বিকল্প। এই মাসেই ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ হাইড্রোজেন চালিত চুলা উন্মোচন করা হয়েছে। বর্তমানে দেড় লক্ষ টাকা দাম, চাহিদা বাড়লে বৃহদায়তন উত্পাদন ব্যবস্থায় এর দাম কমবে।
ইরান শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতি এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতির সাথে সঙ্গত রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালী ‘সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত’ ঘোষণা করেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সঙ্গে সঙ্গে ৮৮ ডলারে নেমে এসেছে। এক সময় এর দাম প্রায় ১২০ ডলারে উঠেছিল। প্রণালীর বাইরে আটকে পরা প্রায় পনেরোটি ভারতীয় পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ যাত্রা শুরু করেছে। এলএনজি ট্যাঙ্কারগুলি আবার রাস লাফানের (কাতার) দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আগামী এক সপ্তাহ থেকে দশ দিনে ভারতের মজুদ স্টক পুরানো জায়গায় ফিরবে, আগামী দশ-পনেরো দিন হরমুজ খোলা থাকবে আশা করা যায়। ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে ট্রানজিটিং জাহাজগুলিকে লারাক দ্বীপের মধ্য দিয়ে ‘টোল’ দিতে হতে পারে। ফলে গ্যাসের অবতরণ ব্যয় বাড়বে। ‘হরমুজ সংকট’ ভারতের শক্তি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ধরিয়ে দিয়েছে। রান্নাঘরের উনুন না জ্বললে জাতীয় অর্থনীতি বিপন্ন হবে। উত্তাল হবে জাতীয় রাজনীতি। দ্রুততার সাথে পিএনজি ড্রাইভ ২.০ কার্যকরী করা এবং রাশিয়ার এলপিজি যোগান ব্যবস্থা আরও দৃঢ় করাই এখন প্রধান দায়িত্ব।






