কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী প্রশ্ন করেন, ‘কে জেগে আছো?
বাঙালির কাছে মা লক্ষ্মী তাই কেবল ধনসম্পদের দেবী নন, তিনি ঘরের মেয়ে, সংসারের মঙ্গলদাত্রী, অভাবের দিনে আশার আলো
মানিক রায়: কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো শুধু দেবীর আরাধনা নয়, বাঙালির ঘর-সংসারের সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির এক চিরন্তন উৎসব। শাস্ত্র, পুরাণ ও লোকবিশ্বাসের মেলবন্ধনে এই পুজো আজও ধরে রেখেছে বাংলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
দুর্গাপুজোর ঢাকের শব্দ সবেমাত্র ধীরে ধীরে মিলিয়ে এসেছে। বিসর্জনের বিষাদ কাটিয়ে বাঙালি আবার ফিরে এসেছে নিজের ঘর-সংসারে। কিন্তু উৎসবের রেশ কি এত সহজে ফুরোয়! শরতের নীল আকাশে এখনও ভাসছে সাদা মেঘের ভেলা, উঠোনের কোণে শিউলির গন্ধ, আর রাতের আকাশে অপেক্ষা করছে এক থালা ঝলমলে পূর্ণিমার চাঁদ। এই আবহেই আসছে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। দুর্গাপুজোয় আমরা দেবীকে বরণ করি অসুরদলনী, শক্তিরূপিণী জননী হিসেবে। আর কোজাগরীর রাতে তাঁকে ঘরে ডাকি সংসারের মঙ্গল, অন্নের প্রাচুর্য, আর্থিক স্বচ্ছলতা আর পারিবারিক শান্তির আশায়। বাঙালির কাছে মা লক্ষ্মী তাই কেবল ধনসম্পদের দেবী নন, তিনি ঘরের মেয়ে, সংসারের মঙ্গলদাত্রী, অভাবের দিনে আশার আলো। ‘কোজাগরী’ নামের মধ্যেই রয়েছে এক বিশেষ তাৎপর্য। আশ্বিনের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত হয় কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। এই পূর্ণিমা ‘শারদ পূর্ণিমা’ নামেও পরিচিত। ‘কোজাগরী’ শব্দটার উৎস সংস্কৃত ‘কো জাগর্তি’, অর্থাৎ, ‘কে জেগে আছো?’ প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, এই পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করেন এবং প্রশ্ন করেন, ‘কে জেগে আছো?’ যাঁরা জেগে থেকে ভক্তিভরে দেবীর আরাধনা করেন, তাঁদের তিনি আশীর্বাদ দেন। এই বিশ্বাস থেকেই কোজাগরী পূর্ণিমায় রাত জেগে পুজো ও আরাধনার প্রথা চলে আসছে।
![]()
এই জেগে থাকার অর্থ শুধু সারা রাত না ঘুমিয়ে কাটানো নয়। এর মধ্যে রয়েছে এক প্রতীকী বার্তাও। নিজের সংসার, দায়িত্ব, কাজকর্ম ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন থাকা। এও তো এক ধরনের জাগরণ। যে মানুষ নিজের কর্তব্যে অবহেলা করেন না, পরিশ্রম করেন, আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখেন এবং অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ান, তাঁর জীবনেই সমৃদ্ধির ভিত মজবুত হয়।
পুরাণে লক্ষ্মী শুধু ধন নয়, শ্রী ও সৌভাগ্যের প্রতীকও। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে দেবী লক্ষ্মী হলেন শ্রী, সৌভাগ্য, ঐশ্বর্য ও সমৃদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী। পুরাণের সমুদ্র মন্থনের কাহিনিতে লক্ষ্মীর আবির্ভাবের কথা বর্ণিত আছে। দেবতা ও অসুরদের সমুদ্র মন্থনের সময় বহু মূল্যবান রত্নের সঙ্গে আবির্ভূতা হন দেবী লক্ষ্মী। পরে তিনি ভগবান বিষ্ণুকে স্বামীরূপে বরণ করেন। এই কাহিনির তাৎপর্য গভীর। সমুদ্র মন্থন যেমন পরিশ্রম, ধৈর্য ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তেমনই লক্ষ্মীর আবির্ভাব সেই প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়ে প্রাপ্ত কল্যাণ ও সমৃদ্ধির প্রতীক। জীবনে প্রকৃত ঐশ্বর্য পেতে হলে শ্রম, সংযম ও সদিচ্ছারও প্রয়োজন।

বাঙালি হিন্দু ঘরে লক্ষ্মীকে সাধারণত পদ্মাসনা, দুই বা চার হাতে পদ্ম ও বরাভয়ের প্রতীকসহ কল্পনা করা হয়। তিনি ধানের শিষ হাতে, পেঁচাকে পাশে নিয়ে বিরাজ করেন। ধান, চাল, শস্য ও গৃহস্থালির সঙ্গে দেবীর এই নিবিড় সম্পর্ক বাংলার কৃষিনির্ভর সমাজজীবনের ঐতিহাসিক স্মৃতিও বহন করে। একসময় গ্রামের বাড়িতে ধানের গোলা ভরে ওঠাই ছিল সমৃদ্ধির বড় পরিচয়। গোলায় ধান আছে, হাঁড়িতে চাল আছে, গোয়ালে গরু আছে, পরিবারের মানুষ দু’বেলা খেতে পাচ্ছে, এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে! সেই জীবনবোধ থেকেই বাঙালির লক্ষ্মী আরাধনায় অন্ন ও শস্যের গুরুত্ব এত বেশি।
কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর কথা উঠলে পেঁচার প্রসঙ্গ আসবেই। দেবীর পাশে বসে থাকা পেঁচা বাংলার লক্ষ্মীমূর্তির এক পরিচিত বৈশিষ্ট্য। কিন্তু রাতচরা এই পাখিটাই কেন লক্ষ্মীর বাহন? লোকবিশ্বাস ও প্রতীকী ব্যাখ্যায় এর অর্থ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, পেঁচা রাতের অন্ধকারেও দেখতে ও শিকার করতে পারে। তাই তাকে সতর্কতা, প্রহরা ও সজাগ দৃষ্টির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কোজাগরী পূর্ণিমার ‘কে জেগে আছো?’ প্রশ্নটার সঙ্গে পেঁচার এই নিশাচর স্বভাবের একটা সুন্দর প্রতীকী মিল আছে। দ্বিতীয়ত, বাংলার কৃষিজীবনের সঙ্গে পেঁচার বাস্তব সম্পর্কও আছে। পেঁচা ইঁদুর খায়। ইঁদুর গোলাঘরের ধান-চাল নষ্ট করে। ফলে পেঁচা শস্যরক্ষায় প্রাকৃতিকভাবে সহায়ক। তাই অন্ন ও শস্যের দেবী লক্ষ্মীর সঙ্গে এই পাখির সম্পর্ককে সেই দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাখ্যা করা হয়।

আবার একটা প্রচলিত নৈতিক ব্যাখ্যায় বলা হয়, ধনসম্পদ মানুষকে কখনও কখনও অহঙ্কারী ও আত্মভোলা করে তোলে। লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা যেন মনে করিয়ে দেয়, ঐশ্বর্যের মোহে অন্ধ হয়ে গেলে চলবে না। সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি তাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার বুদ্ধিও থাকা প্রয়োজন। তবে পেঁচাকে নিয়ে অযথা অমঙ্গলের ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। লোকবিশ্বাসে তার নানান ব্যাখ্যা থাকলেও, বাস্তবে পেঁচা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেবীর বাহন হিসেবে তার উপস্থিতি আমাদের প্রকৃতির প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সবচেয়ে মনকাড়া দৃশ্যটা বোধহয় দৃশ্যমান হয় পুজোর আগের সন্ধ্যায়। বাড়ির চারিধার, উঠোন, সদর দরজা ভাল করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে ঠাকুমা, মা কিংবা বাড়ির গৃহিণী চালের গুঁড়ি গুলে এঁকে দেন আলপনা। কোথাও পদ্মফুল, কোথাও ধানের ছড়া, কোথাও আবার ছোট ছোট পায়ের ছাপ। যেন মা লক্ষ্মী সেই পথ ধরেই ঘরে প্রবেশ করবেন। বেশিরভাগ বাড়িতেই বাইরের দরজা থেকে পুজোর আসন পর্যন্ত লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ আঁকা হয়। এর মধ্যে রয়েছে দেবীকে সাদরে ঘরে আমন্ত্রণ জানানোর প্রতীকী ভাবনা। তবে আলপনার নকশা, পায়ের চিহ্ন ও পুজোর নিয়ম অঞ্চল এবং পারিবারিক প্রথা অনুসারে ভিন্ন হতে পারে।
বাংলার লক্ষ্মীপুজোয় লক্ষ্মীর সরা, মাটির প্রতিমা, ঘট কিংবা পট, বিভিন্ন রূপে দেবীর আরাধনা করা হয়। কোথাও পুরোহিতের সাহায্যে পুজো হয়, কোথাও বাড়ির মহিলারাই নিজেদের পারিবারিক রীতি মেনে পুজোর আয়োজন করেন। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই বেঁচে রয়েছে বাংলার লোকসংস্কৃতির সৌন্দর্য। পুজোর উপকরণেও রয়েছে বাঙালির নিজস্বতার ছোঁয়া। ধান, দুর্বা, পান, সুপারি, ফল, মিষ্টি, নারকেল, আতপ চাল, সব মিলিয়ে তৈরি হয় পুজোর ডালি। কোথাও খিচুড়ির সঙ্গে নানান পদে ভোগ নিবেদন করা হয়, কোথাও আবার মুড়ি, মুড়কি, মোয়া, নাড়ু, চিঁড়ে কিংবা দুধের মিষ্টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। পারিবারিক রীতি অনুযায়ী আয়োজন বদলায়, কিন্তু ভক্তির জায়গাটা থাকে একইরকমের। পূর্ণিমার আলোয় রাতজাগা, চাঁদের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক কোজাগরী পূর্ণিমার আর একটা আকর্ষণ। বর্ষার মেঘ সরে গিয়ে আকাশ পরিষ্কার হলে শরতের পূর্ণচাঁদ যেন প্রকৃতির বুকে ঢেলে দেয় রুপোলি আলো। এই আলো তথা চাঁদের জ্যোৎস্নাকে ঘিরে নানান ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকাচার প্রচলিত আছে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে শারদ পূর্ণিমার রাতে ক্ষীর বা দুধের মিষ্টি চাঁদের আলোয় রাখার রীতি আছে। বিশ্বাস করা হয়, পূর্ণিমার চন্দ্ররশ্মির সঙ্গে অমৃতের সম্পর্কের কথা। বাংলার সব পরিবারে এই রীতি সমানভাবে প্রচলিত নয়, তবু পূর্ণিমার আলোয় বসে প্রার্থনা, গল্পগুজব কিংবা পরিবারের মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর মধ্যে আছে এক আলাদা আনন্দ।
লক্ষ্মী কি শুধু ধনীদের ঘরেই আসেন? এই প্রশ্নটা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। লক্ষ্মীকে আমরা সম্পদের দেবী বলে জানি। কিন্তু সম্পদ বলতে কি কেবল টাকা-পয়সা, সোনা-রুপো কিংবা বড় বাড়ি বোঝায়? যে সংসারে দুবেলা অন্ন জোটে, পরিবারের মানুষ পরস্পরের পাশে দাঁড়ায়, অসুস্থের সেবা করে, বৃদ্ধরা অবহেলিত হন না, শিশুরা ভালবাসা পায়, সেই সংসারেও তো লক্ষ্মীর অধিষ্ঠান রয়েছে। অন্যদিকে, অঢেল অর্থ থাকলেও যদি সংসারে অশান্তি, প্রতারণা, অহংকার ও অমানবিকতা থাকে, তবে সেই ঐশ্বর্য কি সত্যিই পূর্ণতা পায়?

হিন্দু সংস্কৃতিতে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ, এই চার পুরুষার্থের কথা বলা হয়েছে। এখানে অর্থের গুরুত্ব অস্বীকার করা হয়নি, বরং ধর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থ উপার্জন ও ব্যবহারের আদর্শ সামনে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, সৎ উপায়ে উপার্জন, দায়িত্বশীল ব্যয়, দান এবং অন্যের কল্যাণে সম্পদের ব্যবহার, এসবই সুস্থ জীবনবোধের অংশ। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো তাই আমাদের মনে করিয়ে দিতে পারে, সমৃদ্ধির সঙ্গে বিবেকের সম্পর্ক অচ্ছেদ্য। শুধু প্রার্থনা করলেই হবে না, নিজের কাজেও তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। মা লক্ষ্মীর সামনে দাঁড়িয়ে কেউ চান সন্তানের সুস্থতা, কেউ চান কর্মসংস্থান, কেউ চান ঋণমুক্তি, কেউ আবার চান সংসারে একটু শান্তি। এই প্রার্থনাগুলির মধ্যে কোনও আড়ম্বর নেই, আছে জীবনের সহজ, গভীর সত্যতা। কোজাগরীর রাতে তাই প্রদীপ জ্বালানো হোক শুধু দেবীর আসনের সামনে নয়, আমাদের নিজেদের বিবেকের কাছেও। আলপনায় আঁকা লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমৃদ্ধির পথ তৈরি হয় পরিশ্রম, সততা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ দিয়ে। শরতের পূর্ণিমার আলোয় যখন বাংলার ঘরে ঘরে ধূপের গন্ধ ছড়িয়ে পড়বে, শাঁখ বেজে উঠবে, আর পুজোর শেষে প্রসাদ ভাগ করে নেবেন পরিবারের সকল মানুষ, তখন প্রার্থনাটা হোক খুব সহজ ভাবনায়, ঘরে যেন অন্নের অভাব না থাকে, মনে যেন হিংসা না থাকে, সম্পর্কে যেন ভালবাসা থাকে, আর সমাজে যেন কেউ অভুক্ত আর অসহায় হয়ে না থাকে। এই প্রার্থনার মধ্যেই তো লুকিয়ে আছে প্রকৃত ‘শ্রী’। আর এই ‘শ্রী’ই বাঙালির কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোকে যুগের পর যুগ ধরে রেখেছে আন্তরিক ও চিরন্তন করে।






