সত্তরের দশকের পুজোর সঙ্গে আজকের উৎসবে কতটা বদল?
একচালার সাবেক ডাকের সাজ বনাম কোটি টাকার থিম! চার দশকে কতটা বদলাল বাঙালির প্রাণের উৎসব?
সত্যগোপাল দে (লেখক— সাংবাদিক, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও সাইকোলজিকাল কাউন্সেলর): দুর্গাপুজো মানেই বাঙালির আবেগ, নস্টালজিয়া, আড্ডা, নতুন জামাকাপড় আর চার দিনের বাঁধনছাড়া আনন্দ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই উৎসবের চেহারা। আজকের কলকাতার দুর্গাপুজো যেখানে আলোর ঝলকানি, থিমের চমক, বিপুল বাজেট এবং ডিজিটাল প্রচারের হাত ধরে আন্তর্জাতিক উৎসবের রূপ নিয়েছে, সেখানে ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ সালের দুর্গাপুজোর ছবি ছিল অনেকটাই আলাদা। পুজোর জৌলুস তখনও ছিল, ছিল মানুষের উন্মাদনা। তবে সেই আনন্দের কেন্দ্রে ছিল পাড়ার মানুষ, পরিচিত মুখ, বনেদিয়ানা, সাবেকিয়ানা আর একসঙ্গে উৎসব কাটানোর সহজাত টান।
সত্তরের দশকের কলকাতা ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা, নকশাল আন্দোলনের অভিঘাত, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং সামাজিক পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সাক্ষী। সেই সময়েও দুর্গাপুজো বাঙালির জীবনে নিয়ে আসত আশ্রয়, আনন্দ এবং মিলনমেলার অনুভূতি। আজকের মতো প্রযুক্তিনির্ভর প্রচার না থাকলেও পুজোর জন্য অপেক্ষা শুরু হয়ে যেত বহু আগে থেকে। মহালয়ার ভোর, রেডিয়োতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ, নতুন জামার গন্ধ আর পাড়ার প্যান্ডেলে বাঁশ বাঁধার শব্দ— সব মিলিয়ে তৈরি হতো অন্য রকম এক উৎসবের আবহ।
১৯৭০ থেকে ১৯৮০ সালের কলকাতার দুর্গাপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল পাড়াকেন্দ্রিকতা। উত্তর কলকাতার পুরনো অলিগলি থেকে দক্ষিণ কলকাতার নতুন বসতি— বিভিন্ন অঞ্চলে পুজোকে ঘিরে তৈরি হতো সামাজিক বন্ধন। ক্লাবের সদস্য, স্থানীয় ব্যবসায়ী, বাড়ির প্রবীণ মানুষ এবং তরুণেরা মিলে পুজোর আয়োজন করতেন। চাঁদা তোলা থেকে শুরু করে প্যান্ডেল তৈরি, প্রতিমা আনা, আলোর ব্যবস্থা— সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে থাকত পাড়ার মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ।

আজকের মতো প্রতিটি পুজোকে কেন্দ্র করে বিপুল কর্পোরেট স্পনসরশিপ বা প্রচারের প্রতিযোগিতা সর্বত্র দেখা যেত না। পুজোর সাফল্য বিচার করা হতো মানুষের উপস্থিতি, প্রতিমার সৌন্দর্য, আয়োজনের আন্তরিকতা এবং পাড়ার সুনামের নিরিখে।
তবে সেই সময়ের সব পুজো এক রকম ছিল না। উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোয় ঐতিহ্য ও পারিবারিক রীতির গুরুত্ব ছিল বিশেষ। অন্যদিকে, বিভিন্ন বারোয়ারি পুজোয় স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণই ছিল প্রধান আকর্ষণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বারোয়ারি পুজোর পরিসরও বেড়েছে।
সত্তরের দশকের কলকাতার দুর্গাপুজোর কথা উঠলে প্রতিমার প্রসঙ্গ আসবেই। কুমোরটুলির শিল্পীদের হাতে তৈরি একচালার প্রতিমা, পরিচিত দেবীমূর্তি, ডাকের সাজ কিংবা সাবেক অলঙ্করণ— এসবের মধ্যে ছিল ঐতিহ্যের গভীর ছাপ। প্রতিমার সৌন্দর্য ফুটে উঠত মুখের অভিব্যক্তি, চোখের টান, মাটির গড়ন এবং সাজসজ্জার সূক্ষ্মতায়।

আজকের মতো বিষয়ভিত্তিক বা থিমনির্ভর প্রতিমার ব্যাপক জনপ্রিয়তা তখনও কলকাতার পুজোর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েনি। তবে এর অর্থ এই নয় যে সত্তরের দশকে শিল্পভাবনা বা নতুনত্বের অভাব ছিল। বরং শিল্পীরা প্রচলিত কাঠামোর মধ্যেই নিজেদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দিতেন।
বর্তমানে প্রতিমা কখনও সমসাময়িক শিল্প, কখনও সামাজিক বার্তা, কখনও পরিবেশের ভাবনা, আবার কখনও সম্পূর্ণ নতুন নান্দনিক ধারণার প্রকাশ হয়ে উঠছে। দেবীমূর্তির উপস্থাপনায় এই বৈচিত্র্যই আধুনিক দুর্গাপুজোর অন্যতম পরিচয়।
পুজো দেখতে বেরোনো মানেই ছিল চেনা কলকাতাকে নতুন করে দেখা। আজকের মতো অ্যাপের সাহায্যে পুজোর রুট তৈরি করা, অনলাইনে ভিড়ের খবর দেখা কিংবা সামাজিক মাধ্যমে ছবি দেখে মণ্ডপ বেছে নেওয়ার সুযোগ সত্তরের দশকে ছিল না। মানুষ খবর পেতেন পরিচিতদের কাছ থেকে, সংবাদপত্রে বা স্থানীয় আলোচনায়। কোন পুজোয় ভালো প্রতিমা হয়েছে, কোথায় সুন্দর আলো, কোথায় নতুন ধরনের প্যান্ডেল তৈরি হয়েছে— এসব জানার জন্য মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া খবরের গুরুত্ব ছিল যথেষ্ট।

সত্তরের দশকের দুর্গাপুজোর স্মৃতিতে রেডিয়োর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনা বহু বাঙালি পরিবারের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। পুজোর আগে নতুন পোশাক কেনা, আত্মীয়দের বাড়িতে যাওয়া এবং পরিবারের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া ছিল উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সেই সময়ে আজকের মতো স্মার্টফোন, ডিজিটাল ক্যামেরা বা সামাজিক মাধ্যমে মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। ছবি তোলা হতো ক্যামেরায়, আর অনেক মুহূর্তই থেকে যেত স্মৃতির পাতায়। পুজোর আনন্দকে প্রকাশ করার জন্য লাইক, কমেন্ট বা ভাইরাল হওয়ার কোনও প্রশ্ন ছিল না।
আজকের প্রজন্মের কাছে পুজো মানে নতুন পোশাকের পাশাপাশি ইনস্টাগ্রামের ছবি, রিলস, লাইভ ভিডিয়ো এবং অনলাইনে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ। প্রযুক্তি উৎসবকে আরও বিস্তৃত করেছে। প্রবাসে থাকা মানুষও এখন সরাসরি কলকাতার পুজোর ছবি ও ভিডিয়ো দেখতে পান। বদলেছে আনন্দ প্রকাশের ভাষা, কিন্তু উৎসবের আবেগ এখনও অটুট।
১৯৭০ থেকে ১৯৮০ সালের পুজোর সঙ্গে বর্তমানের অন্যতম বড় পার্থক্য হল অর্থের ব্যবহার এবং আয়োজনের পরিসর। তখনও বড় পুজোয় উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হতো। ব্যবসায়ী, স্থানীয় দাতা এবং পাড়ার মানুষের চাঁদা ছিল অনেক আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু আজকের বড় পুজোগুলির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্পোরেট স্পনসরশিপ, বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ডের প্রচার এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা।
এখন অনেক পুজোয় শিল্পী, ডিজাইনার, আলোকশিল্পী, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা এবং বিপণন বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে কাজ করেন। পুজোকে কেন্দ্র করে পর্যটন, হোটেল, পরিবহণ, খাবার এবং খুচরো ব্যবসারও বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হয়।
তবে সব পুজোর বাজেট এক নয়। এখনও কলকাতার বহু ছোট পুজো সীমিত অর্থে এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় আয়োজিত হয়। ফলে আধুনিক পুজোর অর্থনৈতিক চেহারা বদলালেও পাড়ার উদ্যোগের ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
সত্তরের দশকের কলকাতায় রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলেছিল। সেই বাস্তবতার মধ্যে দুর্গাপুজো অনেকের কাছে ছিল স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার একটি সুযোগ। তবে পুজোকে কেবল রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে মুক্তির উৎসব হিসেবে দেখলে সময়ের জটিলতা উপেক্ষা করা হবে। বিভিন্ন পরিবার ও এলাকার অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন।
বর্তমানে দুর্গাপুজো আরও ব্যাপক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর পেয়েছে। নারী পরিচালিত পুজো, বিশেষভাবে সক্ষম মানুষের জন্য উদ্যোগ, পরিবেশবান্ধব প্রতিমা, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং সামাজিক সচেতনতার বার্তা বহু আয়োজনে গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি ভিড় নিয়ন্ত্রণ, অগ্নিনিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্যও বড় পুজোর গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
এই পরিবর্তন দেখায়, দুর্গাপুজো শুধু অতীতের ঐতিহ্য বহন করে না; সময়ের সঙ্গে নতুন সামাজিক চাহিদার সঙ্গেও নিজেকে মানিয়ে নেয়।
তা হলে, সত্তরের দশকের পুজো আর আজকের পুজোর তফাত কোথায়?
সবচেয়ে বড় পার্থক্য আয়োজনের ধরন, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং উৎসবকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে। সত্তরের দশকে পাড়ার পরিচিত মানুষ ও পারিবারিক মেলবন্ধন ছিল পুজোর অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে। আজ সেই পরিসর অনেক বড় হয়েছে। প্যান্ডেল ও প্রতিমা শিল্পের নতুন ভাষা পেয়েছে, প্রচার হয়েছে ডিজিটাল, আর দুর্গাপুজো আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু এই বদলের মধ্যেও কিছু বিষয় অপরিবর্তিত। মহালয়ার আবেগ, ষষ্ঠীর অপেক্ষা, অষ্টমীর অঞ্জলি, নবমীর আড্ডা, দশমীর সিঁদুরখেলা এবং বিসর্জনের বিষণ্ণতা— সব যুগেই বাঙালির দুর্গাপুজোর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সত্তরের দশকের দুর্গাপুজো ছিল তুলনামূলকভাবে পাড়াকেন্দ্রিক এক সামাজিক উৎসব, আর আজকের দুর্গাপুজো ঐতিহ্যের পাশাপাশি শিল্প, প্রযুক্তি, পর্যটন ও বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্মিলিত রূপ। সময় বদলেছে, কলকাতা বদলেছে, বদলেছে পুজোর আয়োজনও। তবু দেবী দুর্গার আগমনে শহরের বুকে যে আনন্দের ঢেউ ওঠে, তার মূল সুর আজও একই— বছরভর অপেক্ষার পর একসঙ্গে বাঁচার, আনন্দ করার এবং নিজের শিকড়কে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার উৎসব।

মহালয়ার পুণ্যলগ্নে ইডেন গার্ডেন্সে বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন বাংলার ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতিকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তিন হাজার ড্রোনের আলোয় আকাশে ফুটে ওঠে মা দুর্গার আগমনের মনোমুগ্ধকর ছবি। রাজ্যের ২৩টি জেলার ২৩ ধরনের নৃত্য, ছৌ, বাউল ও ভাওয়াইয়ার মতো লোকশিল্প, তিন হাজার ঢাকির বাদ্যি এবং এক হাজার মহিলার উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। এই অসাধারণ আয়োজনের স্বীকৃতিস্বরূপ গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের শংসাপত্র প্রদান করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভান্দু অধিকারীর নেতৃত্বে এবং উদ্যোক্তা ও সকল অংশগ্রহণকারীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই অনুষ্ঠান বাংলার সংস্কৃতি, ঐক্য ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে ওঠে। এমন ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠান এর আগে আমাদের রাজ্যে হয়নি। পুজোর প্রাক্কালে এই অনুষ্ঠান এবারের দুর্গাপুজোয় অন্য মাত্রা দিল।






