সম্পাদকীয়

বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবা ও সন্তানের দূরত্ব: দায় কার, সমাধান কোথায়?

মা-বাবারও কিছু অজান্তে করা ভুল থেকে যায়?

প্রভাত কুমার মিত্র (লেখক— বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক): সম্পর্কের বন্ধন জোর করে ধরে রাখা যায় না, তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয় ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে। অথচ জীবনের এক বিশেষ পর্যায়ে এসে অনেক মা-বাবা অনুভব করেন, তাঁদের সন্তান যেন ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। যে সন্তানকে তাঁরা বুকের মধ্যে আগলে রেখে বড় করেছেন, যার সুখের জন্য নিজেদের অসংখ্য ইচ্ছা বিসর্জন দিয়েছেন, সেই সন্তানই যেন আজ তাঁদের সঙ্গে আগের মতো সময় কাটাতে চায় না, মনের কথা ভাগ করে নিতে চায় না। এই দূরত্বের যন্ত্রণা গভীর, অনেক সময় অসহনীয়ও। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন এমন হয়? এর দায় কি শুধুই সন্তানের, নাকি সম্পর্কের এই শীতলতার পিছনে মা-বাবারও কিছু অজান্তে করা ভুল থেকে যায়?

বাস্তবতা হল, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্পর্কের দূরত্ব একদিনে তৈরি হয় না। ছোট ছোট অভিমান, অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ, কথার আঘাত, অবিশ্বাস এবং পারস্পরিক প্রত্যাশার সংঘাত ধীরে ধীরে ভালোবাসার জায়গাটিকে সংকুচিত করে দেয়। অথচ একটু সচেতনতা, কিছুটা উদারতা এবং অন্যের স্বাধীনতাকে সম্মান করার মানসিকতা থাকলে এই দূরত্ব অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। মা-বাবার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দায়িত্ব হল সন্তানকে সুশিক্ষিত, মূল্যবোধসম্পন্ন ও আত্মনির্ভরশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। তাঁরা সন্তানকে ভালো-মন্দের পার্থক্য শেখাবেন, নৈতিকতার শিক্ষা দেবেন, জীবনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়ার সাহস জোগাবেন। কিন্তু সন্তানকে বড় করার অর্থ তার জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিজেদের হাতে রেখে দেওয়া নয়।

সন্তানের বিয়ে একটি পরিবারের জীবনে স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এতদিন যে সন্তান মা-বাবাকে কেন্দ্র করে নিজের জীবন সাজিয়েছে, বিয়ের পর তার জীবনে আর একজন মানুষ যুক্ত হন। গড়ে ওঠে একটি নতুন সংসার, নতুন দায়িত্ব, নতুন অগ্রাধিকার। এই পরিবর্তনকে অনেক মা-বাবা সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেন না। বিশেষত ছেলের বিয়ের পর কিছু মায়ের মনে হতে পারে, তাঁর আদরের সন্তানটি যেন ক্রমশ তাঁর হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। যে ছেলে একসময় মায়ের প্রতিটি কথাকে গুরুত্ব দিত, এখন সে স্ত্রীর মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছে, স্ত্রীর সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, দুজনে মিলে নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে মা কখনও কখনও নিজের গুরুত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা অনুভব করেন।

ছেলের জীবনে স্ত্রী আসার অর্থ মায়ের স্থান দখল হয়ে যাওয়া নয়। মা ও স্ত্রীর সম্পর্কের জায়গা আলাদা, তাঁদের প্রতি দায়িত্বও আলাদা। একজনের প্রতি ভালোবাসা অন্যজনের প্রতি ভালোবাসাকে বাতিল করে দেয় না। সন্তান যখন নিজের সংসারকে গুরুত্ব দেয়, তখন তাকে মায়ের প্রতি ভালোবাসার অভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। একইভাবে, নতুন বৌমারও বোঝা প্রয়োজন যে স্বামীর জীবনে তার বাবা-মায়ের একটি দীর্ঘদিনের, আবেগপূর্ণ ও স্বাভাবিক স্থান রয়েছে। সেই সম্পর্ককে অস্বীকার করা কিংবা স্বামীকে তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা সুস্থ দাম্পত্যের লক্ষণ নয়। একটি নতুন সংসারের ভিত শক্ত হয় তখনই, যখন সেখানে পুরোনো সম্পর্কের প্রতি সম্মান থাকে এবং নতুন সম্পর্কের জন্যও পর্যাপ্ত জায়গা থাকে।

সন্তানের প্রতি মা-বাবার ভালোবাসা কোনও ঋণ নয়, যার সুদসহ প্রতিদান দিতে হবে। আবার মা-বাবার বার্ধক্যজনিত প্রয়োজন উপেক্ষা করাও সন্তানের স্বাধীনতার সঠিক ব্যবহার নয়। সন্তানকে দায়িত্বশীল হতে হবে, মা-বাবার যত্ন নিতে হবে, তাঁদের প্রয়োজন ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু সেই দায়িত্ববোধ গড়ে উঠুক ভালবাসা, নৈতিকতা ও মানবিকতার ভিত্তিতে— অপরাধবোধ কিংবা আবেগের চাপের মাধ্যমে নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শারীরিক সক্ষমতা কমতে পারে, কর্মজীবনের ব্যস্ততা শেষ হতে পারে, সামাজিক পরিসর ছোট হয়ে আসতে পারে। যাঁরা একসময় পরিবারের প্রতিটি সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁরা হঠাৎ অনুভব করতে পারেন যে তাঁদের প্রয়োজনীয়তা কমে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন থেকে জন্ম নিতে পারে একাকিত্ব, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা নিজের গুরুত্ব হারানোর ভয়। কখনও সেই ভয় প্রকাশ পায় অতিরিক্ত উপদেশ দেওয়ার মাধ্যমে, কখনও অভিযোগে, কখনও সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতায়।

তাই মা-বাবার আচরণ বুঝতে গেলে তাঁদের অন্তর্নিহিত ভয় ও অসহায়তাকেও বোঝা প্রয়োজন। তবে বোঝার অর্থ অন্যায় আচরণকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। বরং তাঁদের আবেগকে সম্মান জানিয়ে শান্তভাবে বোঝানো প্রয়োজন যে সন্তান দূরে চলে যাচ্ছে না, তার জীবনে শুধু নতুন দায়িত্ব ও সম্পর্ক যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে মা-বাবারও নিজেদের জীবনে নতুন অর্থ খুঁজে নেওয়া প্রয়োজন। সন্তানদের সংসারকে নিজেদের জীবনের একমাত্র কেন্দ্র না করে বন্ধুবান্ধব, সামাজিক কাজ, বইপড়া, বাগান করা, আধ্যাত্মিক চর্চা কিংবা পছন্দের অন্য কোনও কাজে যুক্ত থাকা তাঁদের মানসিক সুস্থতার জন্য সহায়ক হতে পারে। সন্তানের জীবনে জায়গা থাকা প্রয়োজন, কিন্তু সন্তানের জীবনকে নিজের সমগ্র অস্তিত্বের একমাত্র অবলম্বন করে তোলা উচিত নয়।

অন্যদিকে, সন্তানদেরও বুঝতে হবে, মা-বাবার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের শারীরিক প্রয়োজনের পাশাপাশি মানসিক চাহিদাও গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য। তাঁদের সঙ্গে মতের অমিল হতে পারে, তাঁদের কিছু অভ্যাস বিরক্তিকরও মনে হতে পারে, কিন্তু তাই বলে তাঁদের একাকিত্বের দিকে ঠেলে দেওয়া মানবিকতার পরিচয় নয়। এখানে প্রয়োজন দুই পক্ষেরই একটু সংযম, একটু সহনশীলতা, একটু ক্ষমাশীলতা। অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা এড়িয়ে চলা, ছোটখাটো ভুল ক্ষমা করে দেওয়া, অন্যের অবস্থান থেকে পরিস্থিতিকে বোঝার চেষ্টা করা এবং জেদের বদলে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া— এই ছোট ছোট অভ্যাসই একটি পরিবারকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। তবে সহনশীলতার অর্থ অপমান, মানসিক নির্যাতন কিংবা অন্যায় আচরণ নীরবে মেনে নেওয়া নয়। সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে কখনও কখনও স্পষ্ট সীমারেখাও প্রয়োজন। সেই সীমারেখা যেন প্রতিশোধের জন্য নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার জন্য তৈরি হয়।

মা-বাবা ও সন্তানের সম্পর্ক পৃথিবীর অন্যতম গভীর সম্পর্ক। এই সম্পর্কের মধ্যে ত্যাগ আছে, অধিকারবোধ আছে, অভিমান আছে, আবার অপরিসীম ভালোবাসাও আছে। কিন্তু শুধু রক্তের সম্পর্ক কিংবা অতীতের ত্যাগ দিয়ে বর্তমানের সম্পর্ককে চিরকাল সুন্দর রাখা যায় না। প্রতিদিনের আচরণ, কথাবার্তার সৌন্দর্য, পারস্পরিক সম্মান এবং একে অন্যকে বুঝতে চাওয়ার আন্তরিকতার মধ্য দিয়েই সম্পর্ক বেঁচে থাকে।

মা-বাবাকে মনে রাখতে হবে, সন্তানকে জন্ম দেওয়া ও বড় করা তাঁদের দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ; কিন্তু তার নিজস্ব জীবন গড়ে তোলার স্বাধীনতাকেও সম্মান করতে হবে। সন্তানের জীবনসঙ্গীকে আপন করে নেওয়া, অকারণ প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে আসা এবং ত্যাগের হিসাব না কষে ভালোবাসার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। সন্তানদেরও মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা মানে দায়িত্বহীনতা নয়। নিজের সংসারকে ভালোবাসার পাশাপাশি যে মানুষগুলি তাকে পৃথিবীতে এনেছেন, বড় করেছেন এবং জীবনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি যত্ন ও সম্মান বজায় রাখাও তার নৈতিক দায়িত্ব।

একটি পরিবারের প্রকৃত সাফল্য এই নয় যে, সবাই একই ছাদের নিচে বাস করছে। প্রকৃত সাফল্য হল, দূরে থেকেও সবাই একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, বিপদের সময়ে পরস্পরের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত এবং মনে মনে একে অন্যের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হয়ে রয়েছে। সন্তানকে নিজের কাছে রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় তাকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, এমন একটি সম্পর্ক তৈরি করা যেখানে সে স্বেচ্ছায় ফিরে আসতে চায়। কারণ, ভয় মানুষকে বাধ্য করে কাছে থাকতে, অপরাধবোধ মানুষকে দায়িত্ব পালনে বাধ্য করে; কিন্তু ভালোবাসা, সম্মান ও মানসিক শান্তিই মানুষকে সত্যিকার অর্থে আপনজনের কাছে ফিরিয়ে আনে।

জীবনের শেষবেলায় এসে মা-বাবার যেন এই উপলব্ধি হয়— সন্তান তাঁদের সম্পত্তি নয়, তাঁদের জীবনের এক অমূল্য উপহার। আর সন্তানদেরও যেন মনে থাকে, মা-বাবার জীবনের সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে, তখন তাঁদের প্রয়োজন শুধু আশ্রয় নয়, এমন একটুকরো ভালবাসার আলো, যেখানে তাঁরা নিজেদের অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করবেন না। সম্পর্কের জয় হোক, জেদের নয়। ভালবাসার জয় হোক, প্রতিযোগিতার নয়। আর জীবনের শেষ অধ্যায়টি কাটুক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার উষ্ণতায়।