সম্পাদকীয়

চিরন্তনের নব রূপায়ণ: কলকাতার দুর্গাপুজোর সমাজতাত্ত্বিক বিবর্তন

গঙ্গার পলিমাটিতে গড়ে ওঠা এই শহরের মতোই শারদোৎসবের চরিত্রও বহুস্তরীয়

রাজাগোপাল ধর চক্রবর্ত্তী: কলকাতার দুর্গাপুজো কেবল একটি বাৎসরিক শাস্ত্রীয় আচার কিংবা ধর্মীয় উপাসনা নয়; অষ্টাদশ শতক থেকে একবিংশ শতক পর্যন্ত এটি কলকাতার সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও নাগরিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের এক জীবন্ত মহাফেজখানা। গঙ্গার পলিমাটিতে গড়ে ওঠা এই শহরের মতোই শারদোৎসবের চরিত্রও বহুস্তরীয়। নদীর জোয়ার-ভাটার মতো সময়ের ধাপে ধাপে বদলেছে পুজোর সুর, ছন্দ, বহিরঙ্গ এবং অন্তরঙ্গ সংবেদন। অতীতে যা ছিল সামন্ত প্রভুদের বৈভব প্রদর্শনের দর্পিত আঙিনা, কালের বিবর্তনে তা রূপ নিয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বদেশি প্রেরণা ও গণতন্ত্রায়ণে; আর বিশ শতকের পাড়াকেন্দ্রিক ঘরোয়া আড্ডা পেরিয়ে আজ তা আত্মপ্রকাশ করেছে বিশ্বস্বীকৃত এক সুবিশাল উন্মুক্ত শিল্পোৎসবে।

কলকাতায় দুর্গাপুজোর সূচনা হয়েছিল অভিজাত পরিবারের আভিজাত্যকে কেন্দ্র করে। বড়িশার মাটিতে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পুজোকে প্রাচীনতম সূত্র ধরা হলেও, পলাশির যুদ্ধের পর শোভাবাজার রাজবাড়িতে মহারাজা নবকৃষ্ণ দেবের হাত ধরে এর চরিত্রে বড় রদবদল ঘটে। ব্রিটিশ শাসকদের প্রসন্ন করা এবং ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারের সামাজিক মঞ্চ হয়ে উঠেছিল সেকালের রাজবাড়ি। নাটমন্দিরে কোম্পানির উচ্চপদস্থ সাহেবদের পদধূলি, নাচঘরে বাইজিদের নূপুরধ্বনি, আর উঠোনে সানাইয়ের পাশাপাশি কবিয়ালদের তপ্ত লড়াই— এই দ্বৈত রূপের মধ্যেই ফুটে উঠত সেকালের বাবু সমাজের সংস্কৃতি।

রাজবাড়ির দালানকোঠার সংকীর্ণ সীমা ভেঙে পুজো যখন সাধারণের আঙিনায় নেমে এল, তখনই ঘটল বারোয়ারির জাগরণ। বিশ শতকের সূচনায় বাগবাজারের নেবুবাগান কিংবা ভবানীপুরের রাজপথে সাধারণ মানুষ সামান্য চাঁদা তুলে পুজোর সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করল। স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাল পর্বে দুর্গাপুজো হয়ে উঠল স্বদেশি চেতনার প্রধান কেন্দ্র। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু স্বয়ং বাগবাজারের সঙ্গে যুক্ত হলেন; মা দুর্গা পৌরাণিক গণ্ডি পেরিয়ে শৃঙ্খলিতা দেশমাতৃকার রূপ নিলেন। বিদেশি কাপড় বর্জন আর দেশি মেলার আবহে ধর্ম পরিণত হল রাজনৈতিক মুক্তির মহাযজ্ঞে।

স্বাধীনতা-উত্তর কলকাতায় পুজো খুঁজে পেল তার সবচেয়ে নস্টালজিক রূপ— পাড়ার সংস্কৃতি। বাঁশের খুঁটিতে বাঁধা চোঙা মাইকে হেমন্ত, মান্না, লতা, কিশোর কুমার কিংবা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান, পাড়ার রোয়াকে দিনরাতের অবিরাম আড্ডা, আর ঘরে ঘরে দেব-সাহিত্য কুটির কিংবা নামী পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যার সুবাসে শহর মাতোয়ারা হতো। মণ্ডপে শালপাতায় খিচুড়ি-লাবড়ার ভোগ বিতরণ আর পাড়ার বাসিন্দাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই ছিল পুজোর প্রাণ।

একবিংশ শতকে এসে সেই পুজো পাড়ার খোলস ছেড়ে প্রবেশ করেছে বিষয়ভিত্তিক ভাবনা বা থিমের যুগে। চারুকলার শিল্পীদের ভাবনায় মণ্ডপ, প্রতিমা ও আলো মিলেমিশে আজ এক সুবিশাল উন্মুক্ত শিল্পকলা। মাটির ভাঁড়, পাট, কাঠ কিংবা বাতিল লোহালক্কড় দিয়ে গড়ে উঠছে বিশ্বমানের রূপকধর্মী শিল্প। সেই নান্দনিকতার স্বীকৃতি হিসেবেই রাষ্ট্রসঙ্ঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা একে মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সম্মান দিয়েছে। গৃহস্থের দুয়ারে রসিদ কেটে চাঁদা তোলার বদলে আজ এসেছে বহুজাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা ও সরকারি সহায়তা। এমনকি বিসর্জনের শান্ত বিষাদও আজ রূপ নিয়েছে রেড রোডের বর্ণাঢ্য বিসর্জন শোভাযাত্রায়।

সময়ের এই উল্কার গতির রূপান্তরে হারিয়ে গিয়েছে বহু চেনা অনুভূতি ও অনুষঙ্গ।

সবার আগে হারিয়ে গিয়েছে পাড়ার সেই অকৃত্রিম সান্নিধ্য ও যৌথ পরিবারের মিলনমেলা। সেকালে পুজোর প্রস্তুতি শুরু হতো অনেক আগে থেকে। মহালয়ার পর পাড়ার দর্জির দোকানে মাপ দিয়ে নতুন জামা করানোর সেই বুক-দুরুদুরু অপেক্ষা, ‘কার কটি নতুন জামা হল’ তার হিসাব রাখা এবং ষষ্ঠী থেকে দশমী কোন দিন কোনটা পরা হবে তা ট্রাঙ্কে লুকিয়ে রাখার সেই শিশুসুলভ সারল্য আজ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিপণি আর মুঠোফোনের কেনাকাটায় হারিয়ে গিয়েছে।

বিলুপ্ত হয়েছে পাড়ার ঘরোয়া রান্নার যৌথ আনন্দ। বাড়ির মহিলারা গোল হয়ে বসে নাড়ু গড়া, তক্তি তৈরি, কিংবা ষষ্ঠীর সকালে ফুলকো লুচি ও সাদা আলুর তরকারির সেই ঘরোয়া সুবাস আজ ম্লান হয়ে গেছে রেস্তোরাঁর কৃত্রিম ভিড় আর প্রযুক্তিনির্ভর খাদ্য সরবরাহের আড়ালে। দশমীর সন্ধ্যায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে গুরুজনদের প্রণাম করে নিজের হাতে গড়া নারকেল নাড়ু, গজা আর নিমকি খাওয়ার সেই আত্মিক সম্পর্ক আজ আর নেই বললেই চলে। হারিয়ে গেছে ক্ষীরের ছাঁচ আর কড়াপাকের সন্দেশে কামড় দিয়ে গৃহকর্তার কুশলসংবাদের রেশ ধরে পারিবারিক গল্পগাথা শোনার দীর্ঘ অবসর।

মণ্ডপসজ্জা ও সাংস্কৃতিক জীবনের অন্তরঙ্গ রূপটিও আজ হারিয়ে গিয়েছে। পাড়ার ক্লাবঘরে বা ছাদে এক মাস ধরে মহড়া দিয়ে ছোটদের আবৃত্তি আর বড়দের নাটক মঞ্চস্থ করার সেই ঘরোয়া আনন্দ আজ পেশাদার বিনোদন ও উন্মাদনার ভিড়ে বিলীন। স্থানীয় শিল্পীদের ক্লারিনেটের সুর আর তবলার লহড়ায় যে শান্ত মুগ্ধতা ছিল, তার জায়গা নিয়েছে যান্ত্রিক গর্জন। বাড়ি বাড়ি ঘুরে রসিদ বই হাতে হাসি-মস্করা করে চাঁদা আদায়ের সেই অধিকারবোধ হারিয়ে গিয়েছে কেবল বাণিজ্যিক চুক্তির ভিড়ে।

হারিয়ে গিয়েছে পরিবেশের এক চিরচেনা সঙ্গী— দেওয়ালি বা শ্যামাপোকার ঝাঁক। আগে নবমীর রাত মানেই মণ্ডপের হলুদ আলোর নিচে হাজার হাজার সবুজ পোকার ওড়াউড়ি এবং বাতাসে হালকা শীতের শিরশিরে ভাব ছিল ঋতু পরিবর্তনের অমোঘ সঙ্কেত। আজ তীব্র আধুনিক আলোর কারণে এবং কৃষিজমিতে কীটনাশকের অতিরিক্ত প্রয়োগ ও জলাভূমি ভরাটের ফলে সেই পতঙ্গদল শহর থেকে নিঃশব্দে বিদায় নিয়েছে। হারিয়ে গেছে মানুষের কাঁধে বাঁশের কাঠামোয় প্রতিমা বয়ে নিয়ে সানাইয়ের করুণ সুরে মাঝগঙ্গায় নৌকা থেকে নিঃশব্দে ভাসান দেওয়ার সেই শান্ত, নিবিড় অশ্রুজল।

কলকাতার দুর্গাপুজোর মণ্ডপের পাশে বইয়ের স্টল বসার সংস্কৃতি কেবল ধর্মীয় উৎসবের ভিড়ে একটি ব্যতিক্রমী দৃশ্য নয়, এটি বাঙালির বৌদ্ধিক মননের এক দীর্ঘকালীন প্রতীক। সময়ের আবর্তে এই বইয়ের স্টল সংস্কৃতির চরিত্র ও বিন্যাসে এসেছে তাৎপর্যপূর্ণ বদল।

ষাট ও সত্তরের উত্তাল রাজনৈতিক পটভূমিতে মূলত বামপন্থী মতাদর্শের হাত ধরে এই ধারার বিস্তার ঘটেছিল। তখন স্টলগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত স্বল্প মূল্যে মার্কসবাদী দর্শন, মস্কোর রুশ অনুবাদ ও গণআন্দোলনের পুস্তিকা মানুষের দ্বারে পৌঁছে দেওয়া। পাড়ার তরুণ সাহিত্যিকরা ত্রিপল খাটিয়ে বসতেন লিটল ম্যাগাজিনের ডালি নিয়ে; চলত রাতভর তাত্ত্বিক তর্ক ও সাহিত্য-আড্ডা।

আজ সেই রাজনৈতিক একমুখীনতা ভেঙে তৈরি হয়েছে এক বহুত্ববাদী বৌদ্ধিক পরিসর। এখন শুধু দলীয় মুখপত্র নয়, দে’জ বা আনন্দের মতো মূলধারার বাণিজ্যিক প্রকাশনী, সমকালীন উপন্যাস, কবিতা ও মনস্তত্ত্বের বই সমান গুরুত্বে বিক্রি হয়। রামকৃষ্ণ মিশন বা ভারত সেবাশ্রম সংঘের মতো আধ্যাত্মিক স্টলের পাশে স্থান পাচ্ছে পরিবেশ সচেতনতা, নারীবাদ, প্রান্তিক সমাজ ও রূপান্তরকামী অধিকার বিষয়ক প্রগতিশীল সাহিত্য। হ্যারিকেনের আলোয় কাঠের তক্তায় বসার দিন পেরিয়ে আজ সুসজ্জিত ফাইবার বুথে ডিজিটাল মাধ্যমে নিঃশব্দে বই কেনা চলে। হাজারও চোখ ধাঁধানো আলোর ভিড়ে মণ্ডপের পাশে বইয়ের গন্ধ শুঁকে পাতা ওলটানোর এই দৃশ্য প্রমাণ করে, আমোদপ্রমোদের তীব্র স্রোতেও বাঙালির মগজের ক্ষুধা ফুরিয়ে যায়নি।

তবে বাহ্যিক আড়ম্বর, কোটি টাকার বাজেট আর আধুনিক প্রযুক্তির দাপট যতই বাড়ুক না কেন, দুর্গাপুজোর মূল আত্মিক সুরটি আজও বাঙালি হৃদয়ে অবিকল রয়ে গিয়েছে।

শরতের নীল আকাশ আর শিউলির গন্ধের সঙ্গে দূর মাঠের কাশবনের মৃদু দোলা আজও জানান দেয় মায়ের আগমন বার্তা। মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠের সেই উদাত্ত সুর আজও প্রতিটি বাঙালির ঘরে ঘরে সমান শিহরণ জাগায়; আকাশবাণীর সেই সুর আজও কোনও আধুনিক প্রযুক্তি মুছে দিতে পারেনি। ভোরে শাঁখের ধ্বনি আর দূর থেকে ভেসে আসা সেই চিরন্তন স্তোত্রপাঠ যেন নিমেষেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সমস্ত বাঙালিকে এক গভীর নাড়ির টানে বেঁধে ফেলে।

পশ্চিমা পোশাকের রমরমা সত্ত্বেও অষ্টমীর সকালে শাড়ি ও ধুতি-পাঞ্জাবি গায়ে অঞ্জলি দেওয়ার চিরন্তন ব্যাকুলতা এতটুকু ম্লান হয়নি। অঞ্জলির সময় পুরোহিতের উচ্চারিত সংস্কৃত শ্লোকের সুরে করজোড়ে নত হওয়া সেই মুখগুলোতে আজও একই ভক্তি ও নিষ্ঠা দীপ্যমান। দীর্ঘ এক বছরের প্রতীক্ষা শেষে ষষ্ঠীর সকালে পাড়ার মণ্ডপ থেকে ভেসে আসা ঢাকের সেই প্রথম কাঠি পড়ার শব্দে আজও বাঙালির রক্তে দোলা লাগে। নতুন নকশা আর আধুনিক খাবারের হাজারও ঢেউ পেরিয়ে রাজপথের মোড়ে শালপাতার বাটি হাতে কড়া তেঁতুলজল আর কাঁচালঙ্কার ঝাঁজালো আলু দিয়ে ফুচকা খাওয়ার সেই আদিম তৃপ্তি আজও অক্ষুণ্ণ।

আর সর্বোপরি, বিশ্বায়নের এই যুগেও পরিবার, পরিজন আর বন্ধুদের নিয়ে একসঙ্গে বাঁচার আনন্দ এবং দশমীর শেষে ‘আসছে বছর আবার হবে’ বলে দেবীকে বিদায় জানানোর মধ্য দিয়ে একতার যে বার্তা বাঙালি আজও ধারণ করে— তা কোনও দিন হারানোর নয়। সিঁদুরখেলার লাল আবির মেখে একে অপরকে বুকে জড়িয়ে ধরার সেই মানবিক আলিঙ্গনে এখনো কোনও ভেদাভেদ প্রবেশ করতে পারেনি।

সেকালের ঠাকুরদালানের স্নিগ্ধতা আর একালের আলোর সমুদ্রের মাঝে সেতু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাঙালির সেই অবিনশ্বর শিকড়। রূপ বদলেছে, আয়োজন বদলেছে, কিন্তু দুর্গোৎসবকে ঘিরে বাঙালির ভালবাসা ও আত্মপরিচয়ের আনন্দ আজও ঠিক একই রকম অমলিন।

Related Articles