সম্পাদকীয়

রঙ-রেখার আশ্চর্য জাদুকর শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

১৮৯০ সালে আর্ট স্কুলের সহকারী অধ্যক্ষ ইতালিয়ান শিল্পী গিলার্ডি'র কাছে অবনীন্দ্রনাথ শুরু করেন রেখা চিত্র, প্যাস্টেল, জল-রঙ ও তেল রঙের ছবি আঁকা।

Truth of Bengal: রাজু পারাল: দর্শকের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘ছবির রাজা’ হিসেবে। সমকালে তিনি যে অতুলনীয় সব চিত্রকলার সৃষ্টি করেছিলেন তা আজও শিল্পরসিক ব্যক্তিদের মুগ্ধ করে। শিল্পের প্রতি অনুরাগই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছিল দক্ষতার শীর্ষে। পিতা গুণেন্দ্রনাথ ছিলেন ছবি আঁকায় দক্ষ। বড় দাদা গগনেন্দ্রনাথ ও কনিষ্ঠ বোন সুনয়নী ছিলেন সেই সময়কালের শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী। মেজদা সমরেন্দ্রনাথেরও খ্যাতি ছিল শিল্পরসিক হিসেবে। পরিবারের সকলকেই ছবি আঁকতে দেখে একসময় অবনীন্দ্রনাথের মনেও জেগে উঠেছিল সেই সুপ্ত ইচ্ছা। তখন থেকেই তাঁর সহজাত আকর্ষণ গড়ে ওঠে শিল্পের প্রতি। কোন্নগরের বাগান বাড়িতে গিয়েই প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয়। সূক্ষ্ম রেখার টানে, কোমল রঙের ব্যবহারে, ভাবের অসাধারণ অভিব্যক্তিতে ফুঁটিয়ে তোলেন– মুদির দোকান, বাঁশঝাড়, রথতলা, ধানখেত, পুকুরে স্নানে ব্যস্ত মেয়েরা, পাঠশালায় চলেছে ছেলেরা, রাখাল ছেলে গরু নিয়ে ঘরে ফিরছে ইত্যাদি।

১৮৯০ সালে আর্ট স্কুলের সহকারী অধ্যক্ষ ইতালিয়ান শিল্পী গিলার্ডি’র কাছে অবনীন্দ্রনাথ শুরু করেন রেখা চিত্র, প্যাস্টেল, জল-রঙ ও তেল রঙের ছবি আঁকা। পরে ইংরেজ শিল্পী পামার সাহেবের কাছে শেখেন জল-রঙ, প্রতিকৃতি, কালি-কলম ও তেল রঙের পদ্ধতি। সারাজীবনে অসংখ্য ছবি এঁকেছেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিভিন্ন সময়ে তাঁর আঁকা বিখ্যাত ছবিগুলির মধ্যে বুদ্ধ ও সুজাতা, শাহাজাহানের মৃত্যু, বিরহী যক্ষ, গণেশ জননী, সমুদ্র কন্যা, দীপাবলীর চিত্র, ঋতু সংহার, যমুনা পুলিনে শ্রীরাধা, ওমর খৈয়াম, আলমগীর, রবীন্দ্রনাথ, জগদীশচন্দ্র বসু, অলোকেন্দ্রনাথ, কবি কঙ্কন চন্ডী ইত্যাদি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ছবিগুলি সে যুগের শিল্পরসিকদের মুগ্ধ করেছিল। তবে অবনীন্দ্রনাথের গভীর দেশপ্রেম ও অভিনব কল্পনার পরিচয় পাওয়া যায় ‘ভারত মাতা’ ছবিটিতে। ভগিনী নিবেদিতা বিখ্যাত এই ছবিটিকে দেখে তৎকালীন ‘প্রবাসী’ (ভাদ্র, ১৪৩৩) পত্রিকায় প্রভূত প্রশংসা করেন।

১৯০৫ সালে যখন অবনীন্দ্রনাথ সরকারি আর্ট কলেজের ‘সহকারী অধ্যাপক’ ছিলেন, তখন তিনি ছাত্র হিসেবে কাছে পান নন্দলাল বসু, সুরেন কর, বীরেশ্বর সেন, দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী, মনীন্দ্রনাথ গুপ্ত, শৈলেন্দ্রনাথ দে, প্রমোদ কুমার চ্যাটার্জী, ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার, অসিত কুমার হালদার প্রমুখকে। পরবর্তীকালে এই সব ছাত্ররাই শিল্পক্ষেত্রে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। ছাত্রদের সংস্পর্শে থাকাকালীনই অবনীন্দ্রনাথ ‘শিল্পগুরু’ হিসেবে পরিচিত হন দেশের মানুষের কাছে। খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।

ভারতীয় শিল্প নবজন্ম লাভ করে তাঁরই আন্তরিক প্রয়াসে। ভারতীয় শিল্পের প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে অবনীন্দ্রনাথ ১৯০৭ সালে গগনেন্দ্রনাথ, লর্ড কিচেনার, উডরফ, স্যার আশুতোষ চৌধুরি, নর্মান ব্লান্ট, মিঃ থর্নটন প্রমুখকে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্টস’। এই শিল্প সংস্থার সঙ্গে ভগিনী নিবেদিতা-সহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি যুক্ত ছিলেন। অবনীন্দ্রনাথের কথায়, ‘আমরা করেছিলুম এমন একটি সোসাইটি, যেখানে দেশি-বিদেশি নির্বিশেষে সবাই একত্র হয়ে আর্টের উন্নতির জন্য ভাববে। শুধু ভারতীয় শিল্পই নয়, প্রাচ্যশিল্পের সব কিছু জিনিস দেখানো হবে লোকেদের।’ সে সময়ে সোসাইটি হয়ে উঠেছিল অবনীন্দ্রনাথের ধ্যান জ্ঞান।

১৯১৩ সালে সরকারের কাছ থেকে সিআইআই উপাধি লাভ করেন অবনীন্দ্রনাথ। এর দু’বছর পরেই আর্ট স্কুলের নতুন অধ্যক্ষ পার্সি ব্রাউনের সঙ্গে মতবিরোধ ঘটায়, আর্ট স্কুলের অধ্যক্ষ পদ ছেড়ে সোসাইটির কাজে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিযুক্ত করেন অবনীন্দ্রনাথ। একটা সময় জোড়াসাঁকোর দক্ষিণের বারান্দায় বসে সারাদিন মনের আনন্দে কেবল ছবি আঁকতেন অবনীন্দ্রনাথ। দেশ-বিদেশের বহু শিল্পরসিক এখানে আসতেন তাঁর আঁকা ছবি ও শিল্প সংগ্রহ দেখতে। বিভিন্ন প্রকার শিল্প সামগ্রী বহুদিন ধরে কিনে ঠাকুরবাড়িতেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন বৃহদাকার শিল্প সংগ্রহশালা। বলাবাহুল্য, জোড়াসাঁকোর বাড়িটি পরবর্তীকালে ভারতীয় শিল্পের এক অন্যতম পীঠস্থান রূপে গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

কাকা রবীন্দ্রনাথের উৎসাহে একটা সময় লেখা লেখি শুরু করেন অবনীন্দ্রনাথ। তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় ঢাকা পড়ে গিয়েছিল চিত্রশিল্পী পরিচয়ের আড়ালে। তাঁর প্রয়াণের পরে যত দিন গেছে, ততই ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর সাহিত্য রচনার খ্যাতি। চব্বিশ বছর বয়সে ‘শকুন্তলা’ (১৮৯৫) লেখি দিয়েই তাঁর সাহিত্য জীবনের শুরু। পরের বছরেই তিনি লিখেছিলেন ‘ক্ষীরের পুতুল’ নামে একটি রূপকথার গল্প। এরপর থেকেই বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর বিভিন্ন ধরনের রচনা। তাঁর লেখা বিভিন্ন রচনার মধ্যে রাজ কাহিনি, ভূত পত্রীর দেশ, নালক, বাংলার ব্রত, খাজাঞ্জির খাতা, বুড়ো অ্যাংলা, জোড়াসাঁকোর ধারে, আপন কথা, বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী, লম্ব কর্নপালা, মাসি, একে তিন তিনি এক, মারুতির পুঁথি, মহাবীরের পুঁথি, চাঁই বুড়োর পুঁথি, হাওয়া বদল ও অন্যান্য রচনা ইত্যাদি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। সারাজীবনে শিশুদের জন্য অজস্র

কবিতা, গল্প ও ছড়াও লিখেছেন অবনীন্দ্রনাথ। বড়দের জন্যও তাঁর লেখার সংখ্যা কম ছিল না। লেখার প্রসঙ্গে অবনীন্দ্রনাথের বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলীর কথা অনিবার্যভাবে এসে পড়ে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ অনুরোধে অবনীন্দ্রনাথ ১৯২১ সালে ‘রানী বাগেশ্বরী অধ্যাপক’ হিসাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯২১ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত তিনি ওই পদে থেকে মোট ২৯টি বক্তৃতা দেন, যেগুলি পরে ‘বাগেশ্বরী প্রবন্ধাবলী’ নামে প্রকাশ হয়। অবনীন্দ্রনাথের দেওয়া বক্তৃতাগুলি তৎকালীন

‘বঙ্গবাণী’ ও ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

পান্ডিত্য ও মৌলিকতার পরিচয় পেয়ে ১৯২১ সালেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি’লিট উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেন। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে অবনীন্দ্রনাথ শিল্প চর্চা, লেখালেখি থেকে সরে গিয়েছিলেন। তখন তিনি অন্য জগতের মানুষ। বলতেন, ‘আর মন ভরে না’। পরিবর্তে কাঠের টুকরো, গাছের শিকড়, ভাঙ্গা ডালপালা, নারকেলের মালা, আমড়ার আঁটির মতো তুচ্ছ উপকরণ দিয়ে তৈরি করতেন নানা সামগ্রী।

১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট সবকিছু কেমন যেন বদলে গিয়েছিল অবনীন্দ্রনাথের। সেদিন তাঁর ৭১ তম জন্মদিন। অথচ বদলে গিয়েছিল জন্মদিনের তাৎপর্যটাই। এমন বিয়োগান্ত জন্মদিন আগে কখনও আসেনি তাঁর। কিছুক্ষণ আগেই রবিকাকা পাড়ি দিয়েছেন চিরঘুমের দেশে। অবনীন্দ্রনাথ সে সময়ে দক্ষিণের বারান্দায় বসে আপন মনে এঁকে চলেছেন রবিকাকার অন্তিম যাত্রার ছবি। যে ছবি পরে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ছাপা হয়।

১৯৪১ সালেই অবনীন্দ্রনাথ ও তাঁর পরিবার ঠাকুরবাড়ি ছেড়ে চলে আসেন বরাহনগরের ‘গুপ্ত নিবাসে’। জীবনের শেষ কটা দিন কাটে সেখানেই।

যে জন্মতারার রশ্মি পৃথিবীর বুকে অন্ধকারের ছায়াপথ বেয়ে নেমে এসে চলা শুরু করেছিল, সেই চলা থেমে যায় ১৯৫১ সালের ৫ ডিসেম্বর। শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ চিরবিদায় নিলেন ওই দিনে।

Related Articles