রাজ্যের খবর

জঙ্গলাকীর্ণ বল্লভপুরে শ্মশান মায়ের মন্দির কার আরাধনার ফল? জানুন ২০০ বছর আগের কাহিনী

সেই নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণই প্রথম এখানে মৃন্ময়ী মূর্তি তৈরি করে শ্মশান মায়ের আরাধনা শুরু করেন।

তরুণ মুখোপাধ্যায়, হুগলি: দীর্ঘ ১৭৬ বছর ধরে হুগলির শ্রীরামপুরের বল্লভপুর অঞ্চলে পূজিত হয়ে আসছেন অত্যন্ত জাগ্রত মা শ্মশান কালী। কথিত আছে আজ থেকে ১৭৬ বছর আগে গঙ্গা নদীর তীরবর্তী বল্লভপুর গ্রামটি ছিল অত্যন্ত জঙ্গলাকীর্ণ, নানা ধরনের হিংস্র জন্তু-জানোয়ার ঘুরে বেড়াতো, অন্ধকারাচ্ছন্ন ঝোপ ঝাড়ে বাস করতো চিল শকুনের দল, ঘুরে বেড়াতো বিষাক্ত সরীসৃপরা। সন্ধ্যার পর এই অঞ্চলটি তাদের দখলে চলে যেত, শিয়ালের ডাকের সম্পূর্ণ এলাকাটি এক ভয়াল পরিবেশের সৃষ্টি হতো। সন্ধ্যার পর কোন মানুষ এই অঞ্চলে দিয়ে চলাফেরা করতেন না। একেবারে গা ছমছমে পরিবেশ। জনশ্রুতিতে জানা যায় সেই সময় বল্লভপুর অঞ্চলে রাজেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বলে এক ব্রাহ্মণ বাস করতেন, সেই নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণই প্রথম এখানে মৃন্ময়ী মূর্তি তৈরি করে শ্মশান মায়ের আরাধনা শুরু করেন। তারপর ভাগীরথীর উপর দিয়ে বহু জল প্রবাহিত হয়েছে, কিন্তু শ্মশান মায়ের আরাধনা আজও নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে হয়ে আসছে।

প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ ভক্তপ্রাণ মানুষের ভক্তি এবং শ্রদ্ধা এবং নিষ্ঠার মধ্য দিয়েও পালিত হয়ে আসছে মায়ের অর্চনা। রাজেন্দ্রবাবুর মৃত্যুর পর বল্লভপুর গ্রামের বাসিন্দারা সংঘবদ্ধ ভাবে জাগ্রত শ্মশান মায়ের পুজো জারি রেখেছেন। উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে জানা যায় সেই সময় প্রবীণ ব্রাহ্মণ রাজেন্দ্রবাবুকে যিনি সর্বত্র ভাবে সাহায্য করেছিলেন তার নাম ছিল বাবুলাল। পেশায় ডোম বাবুলাল ছিলেন শ্মশান মায়ের একনিষ্ঠ ভক্ত। যেহেতু বল্লভপুর শ্মশানের পাশেই মায়ের মন্দির, তাই তিনি এখানে শ্মশান মা হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। এরপর কেটে গেছে দশকের পর দশক, শ্রীরামপুর বল্লভপুরের শ্মশান মায়ের মাহাত্ম্য ততদিনে হুগলির গণ্ডি ছাড়িয়ে সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছে, প্রতিবছর কালীপুজোর দিন লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাবেশ হয শ্রীরামপুরে।

সারারাত অত্যন্ত ভক্তি ভরে মায়ের আরাধনার হয়, দর্শনার্থীরা মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে ফিরে যান আপন আপন ঘরে। কথিত আছে এখানকার বল্লভপুরের শ্মশান মা এতটাই জাগ্রত যে যদি কোন ভক্ত সারাদিন উপবাস করে কায়মন বাক্যে শ্মশানমার কাছে কোন কিছু প্রার্থনা করেন মা তাদের নিরাশ করেন না। ভক্তের প্রার্থনা শোনেন এবং তার মনস্কামনা পূর্ণ হয় । এবছর এই পুজো ১৭৬ বছরে পা দিয়েছে, তাই শ্রীরামপুর নগরবাসী দীপাবলীর দিন মায়ের আগমনের জন্যে অধীর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। প্রতিবছরের মত এবছরও শ্মশান মায়ের পুজো উপলক্ষে মন্দির প্রাঙ্গণে বসবে ভক্তিমূলক সংগীতের আসর। পুজোর দিন সকাল থেকে প্রচুর ভক্ত গঙ্গা স্নান করে এখানে দন্ডি খাটেন। অতীতে এখানে অনুষ্ঠিত হতো পাঞ্জা খেলার আসর, বহু উৎসাহি দর্শক এই খেলা উপভোগ করতেন, বিজয়ীদের দেওয়া হতো নানা ধরনের আকর্ষণীয় পুরস্কার।

এছাড়াও এখানকার শ্মশান কালী পুজো উপলক্ষে স্থানীয় জলকল মাঠে হতো তিন দিনব্যাপী সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেই সময়কার ভারতবর্ষের কিংবদন্তি শিল্পীরা পুজো উপলক্ষে এখানে এসে সংগীত পরিবেশন করে গেছেন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্রও মতন গুণী শিল্পীরা বিভিন্ন সময়ে মায়ের পুজো উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এখানে এসে হাজার হাজার দর্শকদের সংগীতের মূর্ছনায় মাতোয়ারা করে গেছেন। তবে অতীতের মত অতটা জমকালো অনুষ্ঠান না হলেও মায়ের পুজো কিন্তু আজও হয়ে আসছে সমস্ত আচার বিধি নিষ্ঠা মেনে। প্রতিবছর সকাল থেকে দূর দূরান্তের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মায়ের আশীর্বাদ নিতে ভক্তদের ঢল নামে মন্দির প্রাঙ্গণে।

Related Articles