সবুজ বনানীতে ভরা পাহাড়ে ঘেরা ছোট্ট সুন্দর স্বপ্নের শহর সিটং
ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। জঙ্গলে নিস্তব্ধতার যে এমন ভয়ংকর সুন্দর রূপ হয় তা জানা ছিল না।
কাকলি হালদার: ভ্রমণ কথাটির মধ্যে কেমন যেন রোমহর্ষক ব্যাপার আছে যা মন কে ভীষণ ভাবে আন্দোলিত করে। আমার দেশ ভারতবর্ষ, আমার রাজ্য বাংলার বহু স্থানে ভ্রমণ করে বুঝেছি, স্বর্গ বলে যদি কোথাও কিছু থাকে তা এই মর্ত্যতেই। তাই মাঝে মাঝে বেড়িয়ে পড়ি ভ্রমণের নেশায়। তাছাড়া লেখালেখি করতে খুব ভালবাসি তাই বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করলে যেমন মনের খাতায় গেঁথে থাকে ঠিক তেমনি কাগজের খাতায় অভিজ্ঞতা গুলিকে লিখে রাখার চেষ্টা করি। তাই সময় সুযোগ পেলে দুচোখ যেদিকে যায় বেড়িয়ে পড়তে মন চায়।
[আরও পড়ুন: Bihar Elections: “NDA জোটেই বাজিমাত”, বিহার ভোটের আগে ভবিষ্যদ্বাণী শেখাওয়াতের]
কোথায় যাওয়া যায়? সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম এবার গন্তব্য হোক সুন্দরী সিটং। পৌঁছে গেলাম উত্তরবঙ্গের কোচবিহার। সেখান থেকেই যাত্রা শুরু করার কথা। বিকেল চারটেয় আমাদের গাড়ি বলা ছিল। যথা সময় গাড়ি এসে উপস্থিত হল। আমরা ছয় জন চেপে বসলাম গাড়িতে। চললাম লাটাগুড়ির উদ্দেশ্যে। কোচবিহার থেকে সিটং যাওয়ার পথে লাটাগুড়ি অভয়ারণ্য দেখে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল- সেই মতোই পরিকল্পনা হয়েছিল। পৌঁছে গেলাম লাটাগুড়ি হোটেলে। রাত্রিটা ওই স্থানে ভালোভাবে কাটিয়ে পরের দিন ভোর বেলা পাঁচটা কুড়ি মিনিটে খোলা জিপে করে চললাম গরুমারা অভয়ারণ্য দেখতে।
জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছিল আমাদের জিপ- চারিদিকে যেন নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। জঙ্গলে নিস্তব্ধতার যে এমন ভয়ংকর সুন্দর রূপ হয় তা জানা ছিল না। যেন বড় বড় গাছগুলি আমাদের সাথে নানান কথা বলে তাদের মনের কথা জানাচ্ছে। এরই মধ্যে অভ্যর্থনা করলো আমাদের পেখম মেলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সুন্দর ময়ূর। তারপরই দেখতে পেলাম কাজল নয়না হরিণীকে, সে যেন কি বলছে আমাদেরকে। ভোরের এক বুক প্রাণ ভরা অক্সিজেন নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম। দুপুরের আহার সেরে একটার সময় গাড়িতে চেপে বসলাম সিটংয়ের দিকে রওনা হওয়ার উদ্দেশ্যে। আমাদের নেপালি ড্রাইভার ভাঙা বাংলা ভাষায় বেশ কথা বলতে বলতে নিয়ে চলল সিটংয়ের দিকে। পথে পড়ল সিটংয়ের বর্ডার যোগীঘাট। তখন বিকেল পাঁচটা।
যোগীঘাট হল লোয়ার সিটংয়ে অবস্থিত একটি পাহাড়ি গ্রাম। এখানে ৭৪ মিটার লম্বা ও ৩৫ মিটার চওড়া একটি লোহার সেতু আছে। এর নিচে দিয়ে বয়ে চলেছে রিয়াং একটি ছোট্ট পাহাড়ি নদী। এই নদীর উপরে কাঠের সেতু আগে ছিল কিন্তু আজ তা অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এই লোহার সেতুটি সিটং আর মংপুর মধ্যে মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। আমরা এখানে নদীর জলে নেমে পা ডুবিয়ে পড়ন্ত বিকেলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলাম। সূর্য তখন পশ্চিম দিগন্তে ঢলে পড়েছে। কিছু মুহূর্তকে মুঠোফোনে বন্দি করেও রাখলাম। তারপর চা খেয়ে আবার গাড়িতে চেপে বসলাম। চারপাশে পাহাড়ের গন্ধ মাখতে মাখতে গিয়ে পৌঁছালাম মংপুতে।
১৯৩৮ সালে সর্বপ্রথম মৈত্রী দেবীর আমন্ত্রণে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই স্থানে এসেছিলেন। মৈত্রী দেবীর স্বামী ছিলেন একজন কুইনাইন বিশেষজ্ঞ। তারা যে কোয়ার্টারে থাকতেন সেই কোয়ার্টারটি আজ রবীন্দ্র মিউজিয়ামে পরিণত হয়েছে। মিউজিয়ামের অভ্যন্তরে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শোবার ঘর, স্নানের ঘর, রবি ঠাকুরের ব্যবহৃত আসবাব পত্র, ডেস্ক, ওষুধের শিশি, মৈত্রী দেবীকে লেখা বহু চিঠি। রবীন্দ্র ভবনের সামনেই আছে রবীন্দ্রনাথের একটি আবক্ষ মূর্তি। এছাড়া তার পাশেই আছে কুইনাইন ফ্যাক্টরি। এখানে একটা গাছবাড়িও আছে। একটা উঁচু গাছের উপরে বাড়ি করা আছে। এখান থেকে পাহাড়ি দৃশ্য দেখতে অপূর্ব লাগে। সব মিলিয়ে মংপু রবীন্দ্রভবনে এসে একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লাম। এখানে প্রবেশ করতে গেলে ২৫ টাকা করে মাথাপিছু টিকিট কাটতে লাগে।
৭ই মে ১৯৪০ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার শেষ জন্মদিন এই স্থানে উদযাপন করেন। তখন তার বয়স আশি। মংপুতে বসে সানাই, জন্মদিন, নবজাতক কবিতাগুলি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন। তারপর পাহাড়ি সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আমরা গিয়ে পৌঁছালাম অবশেষে আপার সিটংয়ে আমাদের হোমস্টেতে। সবুজ বনানীতে ভরা পাহাড়ে ঘেরা এক ছোট্ট সুন্দর শহর হল সিটং। কমলালেবুর দেশও বলা হয় সিটংকে। রাতের খাবার খেয়ে আমরা যে যার রুমে শুয়ে পড়লাম। পরের দিন সকালে আমাদের গাড়ি আসার কথা। সিটংয়ের যে স্পট আমরা দেখিনি সেগুলি দেখার জন্য আবার বেড়িয়ে পড়লাম। প্রথমে গেলাম মিডিল সিটং লেপচা মনিস্টিতে। ২৫০ থেকে ৩০০ বছরে প্রাচীন এই লেপচা মনেস্টি। এখানে প্রাচীনত্বের অনেক নিদর্শন দেখতে পেলাম। এখান থেকে একটু উঁচুতে উঠে দেখতে পেলাম লেখা আছে I Love Sitong। আকাশ ছিল নির্মল পরিষ্কার। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে খুব ভালোভাবে দেখা যাচ্ছিল।
এরপর পৌঁছালাম নামথিং পোখারি, প্রায় ৪০০ ফুট উঁচু। বর্ষাকালে এখানে জল থাকে কিন্তু অন্য সময় জল থাকে না। এখানে উঁচু দন্ডায়মান হনুমানজির মূর্তি দেখতে পেলাম। আর পাশে রয়েছে ঘন পাইন গাছের অরণ্য। এই অরণ্য এতই সুন্দর যে আমরা মন খুলে গান গাইতে শুরু করলাম এবং মন ভরে মুঠোফোনে সমস্ত মুহূর্ত গুলিকে বন্দী করলাম। আরেকটু ওপরের দিকে রয়েছে নামথিং শিব মন্দির আর তার চারপাশে রয়েছে সিঙ্কোনা গাছের বাগান। আর এই অরণ্যের পথগুলি এক আলো- আঁধারিময় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এরপর আমরা গিয়ে পৌঁছালাম অহলদারা। উঁচু থেকে দেখা যাচ্ছে বয়ে যাচ্ছে নিচে তিস্তা নদী। মেঘমুক্ত পরিষ্কার আকাশ ছিল। প্রায় কুড়িটা পাহাড়ের মাথা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
এই স্থানে কিছু চায়ের বাগান ছিল। আমরা পাহাড়ি পোশাক পড়ে সেই চায়ের বাগানে কিছু ছবি তুলে রাখলাম। এরপর আমরা চললাম কমলালেবুর বাগানে। সেই বাগানে কমলালেবুকে হাত দিয়ে ছোঁয়া যাবে কিন্তু একটাও তোলা যাবে না। কমলালেবু তুললেই ফাইন দিতে হবে। তবুও আমরা চোখ দিয়ে দর্শন করলাম সেই কমলালেবুগুলিকে। দারুন লাগছিল বাগানটিকে। অবশেষে আমরা আমাদের হোমস্টেতে ফিরে গেলাম। পরের দিনই আমাদের বাড়ি ফেরার পালা।
পরের দিন সকালে আমরা রেডি হয়ে রওনা দিলাম কার্শিয়াং-এর পথে। পথে আসতে আসতে চিমনি স্পট, পাইন গাছের শাড়ি, ব্রিটিশ স্থাপত্যে নিদর্শনে ভরপুর ডাউহিল স্কুল দর্শন করলাম। তারপর মন খারাপ নিয়ে নিউ জলপাইগুড়ি এসে পৌঁছালাম। অনেক সুন্দর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে আমরা বাড়ি ফিরলাম।
[আরও পড়ুন: Gill Support: “ওকে সময় দিন, এটা ওর প্রথম সিরিজ” গিলের উপর আস্থা রাখছেন কপিল]
রাজ্যের পর্যটন ক্ষেত্রের সার্বিক বিকাশ ঘটেছে। যাতায়াত হয়ে উঠেছে আরও সহজ। পর্যটকদের জন্য হাজার সুবিধা এখন হাতের মুঠোয়। অফবিট পর্যটন কেন্দ্র গুলিতেও থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে। গড়ে উঠেছে হোম-স্টে। এক অন্যরকম আবহ এসেছে পর্যটনে। তাই মন চাইলেই আপনিও ছুটে যেতে পারেন বাংলার সেই সব মোহময়ী পর্যটন কেন্দ্র গুলিতে। উত্তরবঙ্গ বা দক্ষিণবঙ্গ, বাংলার পর্যটন কেন্দ্রগুলি এখন আরও সুন্দর, আরও আকর্ষণীয়। পর্যটনের কথা ভাবলে মাথায় আর বিদেশের কথা ভাবার প্রয়োজন নেই, বাংলার পর্যটন কেন্দ্র গুলি আপনার সব সাধ পূরণ করবে।






