মহালয়া কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি আধ্যাত্মিক সাধনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
সেই থেকেই কৃষ্ণপক্ষের এই পনেরো দিন পিতৃপক্ষ নামে পরিচিত, এবং মহালয়া হল সেই পক্ষের সমাপ্তি।
ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী (রাষ্ট্রপতি পুরস্কার ও শিক্ষারত্ন পুরস্কারপ্রাপ্ত): বাংলার আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ‘মহালয়া’ এক বিশেষ তাৎপর্যময় দিন। আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা তিথি অর্থাৎ মহালয়া কেবল পিতৃতর্পণের দিন নয়, এটি দেবীপক্ষের সূচনাও। পুরাণ, স্মৃতি, ধর্মশাস্ত্র, লোকবিশ্বাস ও আধুনিক সংস্কৃতির নানা স্তরে মহালয়ার গুরুত্ব বহুমাত্রিক। হিন্দু ধর্মে মহালয়া একই সঙ্গে পিতৃঋণ পরিশোধ, পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি এবং মা দুর্গার আগমনের সূচনার প্রতীক। আবার ঐতিহাসিকভাবে, বিংশ শতাব্দীতে মহালয়া বাংলার বেতার সংস্কৃতির মাধ্যমে এক নতুন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রূপ লাভ করেছে।
১. পিতৃপক্ষ ও মহালয়া
পুরাণ মতে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন— আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষকে ‘পিতৃপক্ষ’ বলা হয়। গরুড় পুরাণ, মহাভারত ও মনুস্মৃতিতে বলা আছে যে, পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ, তর্পণ, দান ও পিণ্ড প্রদান করলে তাঁরা তুষ্ট হয়ে আশীর্বাদ প্রদান করেন। কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা, অর্থাৎ মহালয়া, সেই পক্ষের সর্বশেষ দিন। এই দিনে যাঁরা শ্রাদ্ধ ও তর্পণ করেন, তাঁদের পিতৃপুরুষ স্বর্গলোকে গমন করেন বলে বিশ্বাস।
২. কর্ণ ও মহালয়া কিংবদন্তি
মহালয়ার সঙ্গে একটি প্রসিদ্ধ পুরাণকথা জড়িয়ে আছে। মহাভারতের বীর কর্ণ মৃত্যুর পর স্বর্গলোকে গমন করেন। সেখানে তিনি সোনার থালায় সোনা ও রত্নভরা খাদ্য পান। দেবতাদের কাছে তিনি অভিযোগ করেন— আমি দানশীল ছিলাম, জীবদ্দশায় অসংখ্য দান করেছি, তবে আমাকে অন্ন দেওয়া হল না কেন? দেবতারা উত্তর দেন— তুমি জীবনে সোনা, রূপো, ধনরত্ন দান করেছো, কিন্তু কখনও তোমার পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে অন্নজল দান করোনি। তখন কর্ণ অনুতপ্ত হন। ভগবানের করুণায় তাঁকে পনেরো দিনের জন্য পৃথিবীতে ফিরে এসে পিতৃপুরুষদের জন্য শ্রাদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হয়। সেই থেকেই কৃষ্ণপক্ষের এই পনেরো দিন পিতৃপক্ষ নামে পরিচিত, এবং মহালয়া হল সেই পক্ষের সমাপ্তি।
৩. দেবীপক্ষের সূচনা
মহালয়া কেবল পিতৃপুরুষ তৃপ্তির দিন নয়, এটি দেবীপক্ষেরও সূচনাবিন্দু। দেবী মহাত্ম্যম্ (চণ্ডীপাঠ)-এ বলা আছে, এই দিনেই দেবতারা মহামায়াকে আহ্বান করেন মহিষাসুর বধের জন্য। দেবতাদের শক্তি মিলে দেবী দুর্গার সৃষ্টি হয়। তাই মহালয়ার দিনে ভোরবেলা চণ্ডীপাঠ, দেবী বন্দনা ও ‘জাগো দুর্গা’ আহ্বান করা হয়।
৪. মহালয়া ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
হিন্দু দর্শনে তিন ঋণকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে— দেবঋণ, ঋষিঋণ ও পিতৃঋণ। মহালয়া হলো এই পিতৃঋণ পরিশোধের এক মহৎ সুযোগ। পূর্বপুরুষের শান্তির জন্য সন্তান-সন্ততির তর্পণ কেবল আধ্যাত্মিক নয়, নৈতিক দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচিত। এই দিন মানুষ অতীতের সঙ্গে নিজের যোগসূত্র স্মরণ করে, যা আত্মপরিচয়ের এক গভীর আধ্যাত্মিক রূপক।
ঐতিহাসিক তাৎপর্য
১. বাংলায় মহালয়ার প্রাচীন প্রচলন
প্রাচীন বাংলায় মহালয়া মূলত শ্রাদ্ধকর্মের দিন হিসেবেই পালিত হতো। নদীর ঘাটে, বিশেষত গঙ্গার তীরে, হাজারো মানুষ একত্র হয়ে পিতৃপক্ষের শ্রাদ্ধ ও তর্পণ করতেন। এই সামাজিক রূপটি ছিল সম্মিলিত পূর্বপুরুষ স্মরণের এক বিশাল আয়োজন।
২. ব্রিটিশ আমলে মহালয়া
ব্রিটিশ আমলে কলকাতার জমিদার ও ধনী পরিবারগুলোর দুর্গোৎসব মহালয়ার মাধ্যমে সূচিত হতো। তাঁরা গঙ্গার ঘাটে গিয়ে পিতৃতর্পণ করতেন এবং দেবীপক্ষ শুরু করতেন। এই সময় থেকেই মহালয়ার গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় নয়, সামাজিক উৎসবের সূচনাতেও প্রতিফলিত হতে থাকে।
৩. রেডিও-যুগে মহালয়া : ‘মহিষাসুরমর্দিনী’
১৯৩১ সালে আকাশবাণী কলকাতার উদ্যোগে মহালয়ার ভোরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নামক বেতার অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু হয়। কবি বাণী কুমার রচনার ভিত্তিতে, পঙ্কজ মল্লিকের সুরে এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে পঠিত চণ্ডীপাঠ, স্তোত্র, গীতি ও বাণী এক নতুন মাত্রা যোগ করে।
‘মহিষাসুরমর্দিনী’র ভোরবেলা সম্প্রচার বাংলার মানুষের কাছে মহালয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষ রেডিওর সামনে বসে দেবীর আহ্বান শোনেন। এই প্রথা আজও অব্যাহত।
৪. আধুনিক সময়ে মহালয়া
আজকের দিনে মহালয়া শুধুমাত্র পিতৃতর্পণ বা চণ্ডীপাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। টেলিভিশনে মহালয়ার বিশেষ অনুষ্ঠান, নাট্যমঞ্চায়ন, গানের অনুষ্ঠান ইত্যাদিও জনপ্রিয়। ফলে মহালয়া এখন আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি এক সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
১. পূর্বপুরুষের স্মরণ – মহালয়ার দিন মানুষ নিজের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত হয়। পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঐতিহ্য রক্ষিত হয়।
২. সামাজিক ঐক্য – গঙ্গার ঘাটে সম্মিলিত তর্পণ বা পিতৃকর্ম সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। শ্রেণি, বর্ণ, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলে একত্রে অংশ নেন।
৩. সংস্কৃতির বিকাশ – বেতার ও সঙ্গীতের মাধ্যমে মহালয়া কেবল ধর্মীয় দিন নয়, সাংস্কৃতিক উৎসবেও পরিণত হয়েছে। বাংলা গানের ভাণ্ডারে মহালয়া উপলক্ষে সৃষ্ট সংগীতের নিজস্ব মর্যাদা আছে।
৪. অর্থনৈতিক প্রভাব – মহালয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় দুর্গোৎসবের কেনাকাটা, প্যান্ডেল নির্মাণ ও শিল্পকর্মের চাহিদা। ফলে এটি অর্থনীতিতেও বিশেষ ভূমিকা রাখে।
মহালয়ার দার্শনিক তাৎপর্য
মহালয়া মানুষের জীবনে অনিত্যতার বোধ জাগায়। পিতৃপক্ষ ও তর্পণের মধ্য দিয়ে মানুষ উপলব্ধি করে যে জীবন ক্ষণস্থায়ী, তবে কর্ম ও উত্তরাধিকার চিরস্থায়ী। পূর্বপুরুষকে স্মরণ মানে নিজের অস্তিত্বের শেকড়কে স্বীকার করা। আবার দেবীর আহ্বান মানুষকে জানায়, অসুর শক্তির বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের বিজয় অনিবার্য।
মহালয়া তাই কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি আধ্যাত্মিক সাধনা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সংহতির প্রতীক। পুরাণের আখ্যান, পিতৃতর্পণের শাস্ত্রীয় গুরুত্ব, দেবীর আবাহনের মিথ, আবার আধুনিক বাংলার বেতার ও সাংস্কৃতিক চর্চা— সব মিলিয়ে মহালয়া আজ এক বহুমাত্রিক উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে।
মহালয়ার মাহাত্ম্য এই বোধে— আমরা অতীতকে স্মরণ করি, পূর্বপুরুষকে শ্রদ্ধা জানাই, আর ভবিষ্যতের জন্য নতুন করে শক্তি আহ্বান করি। এই ঐতিহ্যই আমাদের সংস্কৃতিকে চিরজীবন্ত করে রেখেছে।






