Bengal Folk Culture: ‘শিকড়’–এর সন্ধানে বাঙালি! বাউল, ভাটিয়ালি, কবিগানের প্রাণ ফেরাতে রাজ্যজুড়ে কী চলছে?
ডিজিটাল মোবাইল স্ক্রিন, কর্পোরেট ব্যানার, আধুনিকতার নীলাভ আভায় যেন হারিয়ে গেছে সেই শিকড়ের স্বাদ।
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম: বাংলার লোকসংস্কৃতি আজ যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে বসেছে মাটির গন্ধমাখা প্রাণ থেকে শহুরে ঝলমলে ফাঁদে ফেলে রাখল এবং তার ক্ষতটুকু ঠান্ডা না হওয়ার আগেই একবার আরও তীক্ষ্ণভাবে দেখার প্রয়োজন। বাউল–ভাটিয়ালির স্বপ্নভরা বিষাদ, টুসু–ভাদুর উৎসবের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ, চৌচকা–যাত্রাপালার সামাজিক সচেতনতা, কবিগানের রূপক তর্ক— এসব আজ সর্বত্র স্মৃতির পাতায় সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। ডিজিটাল মোবাইল স্ক্রিন, কর্পোরেট ব্যানার, আধুনিকতার নীলাভ আভায় যেন হারিয়ে গেছে সেই শিকড়ের স্বাদ। তবে এই ‘হার’–এর মধ্যে এতটুকুতেই আমরা থেমে থাকবো কী? সম্প্রতি রাজ্য ও দেশ পর্যায়ে যে সচেতনতা ও উদ্যোগ দেখা দিয়েছে, তা প্রদর্শন করে এই সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার অজস্র সম্ভবনার পথ (Bengal Folk Culture)।
উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ন্যূনতম সংস্কৃতির দৃশ্যমানতা নিশ্চিত করতে এসেছে— রাজ্যজুড়ে সিনেমা হলে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত একটি করে বাংলা ছবি প্রদর্শন। বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা জারি করেছে সরকার। এর মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রচার পাবে নতুন উদ্যমে, যা শুধুমাত্র বিনোদন নয়— অন্যের চোখে আমাদের নিজস্ব ভাষা ও চিন্তার মঞ্চ তৈরি করবে। দুর্গাপুজোর মণ্ডপে এবার এক অন্যরকম আন্দোলন চোখে পড়ছে— জনজাগরণ আর পরিচয়ের দাবি নিয়ে ডিজাইন করা হচ্ছে প্যান্ডেল। ভাষা ও সাংস্কৃতিক হস্তক্ষেপ, ‘ভাষা-সন্ত্রাস’–এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বাঙালি উৎপীড়নের প্রতিরূপ দর্শন— এ সব প্যান্ডেলের থিম হয়ে উঠছে, রূপালি বাউলের বাদ্যরূপে ধর্মীয় আয়োজনে আবার নিজের সত্তাকে বলতে চাইছে। সংসদে বাংলাভাষী মানুষের প্রতি অন্য রাজ্যে বাড়ানো বৈষম্য ও হেনস্থার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে— শ্রেণিবদ্ধ বৈষম্য, ‘বাংলাদেশি’–এর নামে ভুলভাবে লেবেলিং— এই সংবেদনশীল বিষয়গুলো আজ রাজ্য বিধানসভায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অতএব শুধু লোকসংস্কৃতি নয়, ভাষা ও পরিচয়ের রক্ষাই আজ সামাজিক সচেতনতা ও রাজনৈতিক দাবি হিসেবে উঠে এসেছে।
উপরন্তু, সাংস্কৃতিক সংরক্ষণে কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগ যেমন— জোনাল কালচারাল সেন্টারের অধীনে চালু ‘গুরু-শিষ্য পরম্পরা’— যেখানে লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষয়প্রাপ্ত ধারাকে ডিজিটালি সংরক্ষণ ও যুব-শিল্পীদের কাছে ট্রান্সমিট করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ৯টি মৌখিক ঐতিহ্য ইতিমধ্যে ডকুমেন্টেশন করা হয়েছে। একই সিরিজে, ছৌ নাচের মতো শিল্পকলাকে প্রশিক্ষণ ও সমর্থন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে। ইউনেস্কোর রুরাল ক্রাফট অ্যান্ড কালচারাল হাবস প্রকল্প আজও বাংলার অন্তত ২৫টি অদৃশ্য সাংস্কৃতিক উপাদানকে জীবন্ত রেখে কমিউনিটি মিউজিয়াম, ক্ষুদ্র শিল্প, জিও-আইডেন্টিটি সূচনার মাধ্যমে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে পরিণত করছে। আর এ সবের মধ্যে, সরকারি ‘লোক প্রচার প্রকল্প’-র কাজ অনুসারে প্রায় দুই লক্ষ লোকশিল্পী মাসিক রিটেইনার, পারফর্ম্যান্স ফি ও পেনশন পেয়ে জীবিকার নিশ্চয়তা পান। একইসঙ্গে কলকাতা-তে ঠাঁই পেয়েছে ‘বিশ্ব বাংলা লোকসাংস্কৃতি উৎসব’— যা লোকচেতনার মঞ্চে তাকে শুধু সংরক্ষণ নয়, পুনরুজ্জীবিত করে তুলছে। এই রেখাঙ্কনে, সাম্প্রতিক এক নজির হয়ে দাঁড়াচ্ছে পদ্মশ্রী পেয়েছেন প্রথম ‘ঢাকিদার’ হিসেবে গোকুল চন্দ্র দাস— যিনি শুধু ঢাকির তাল তুলে ধরলেন, বরং ১৫০ জন মহিলাকে ঢাকির হস্তক্ষেপ দিয়ে শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে ক্ষমতায়নও করলেন। এটি শুধু শিল্প সংস্কৃতির জয় নয়, আধুনিকতার মহাসচেতনায় সামাজিক রূপান্তরকেও নির্দেশ করে (Bengal Folk Culture)।
Truth of Bengal fb page: https://www.facebook.com/share/1GbdnH1jqc/
এই ভাবনার মধ্যে দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে পাই— লোকসংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার পুনরুজ্জীবনের জন্য দেশের সরকারি ও বেসরকারি স্তরে এক প্রকৃত সম্মিলন চলছে। এই সঙ্গীতা আবার মনে করিয়ে দেয়, একটি জাতি তার প্রতিভা, ঐতিহ্য ও ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হলে, তার আত্মপরিচয় অধূরে থেকে যায়। আমাদের প্রতিটি লোকসংস্কৃতির খনি— বাউলের একতারা, ভাটিয়ালির দীর্ঘশ্বাস, কবিগানের তর্ক, টুসু–ভাদুর ঋতুভঙ্গি গান— এসব সত্যিই শুধু লোকবিনোদন নয়, তা ছিল আমাদের সংগ্রামের ভাষা, বাস্তুতন্ত্র, আত্মপরিচিতির শিকড়। আজ বুকের ভেতর শুন্যতা না এলেও, সেই দাগ যেন মুছে যেতে বসেছে। তবু আশার আলো যে ম্লান নয়— আগামী প্রজন্মে শেকড় ফিরিয়ে আনার দায় আমাদের প্রত্যেকের। আমাদের সন্তানরা শুধু গ্লোবাল সিটিজেন হবেন, কিন্তু যদি শিকড় না জানে, তা হলে বাঙালি হবেন কীভাবে? তাই জাগ্রত হতে হবে আমাদের।
আমরা শিকড়গুলো প্রতিদিন মনে করব— গাইব বাউলের গান, শোনাব সর্বময়তা, জীবন্ত রাখব কবিগানের তর্ক, ফিরিয়ে আনব ভাটিয়ালি, জারি-সারি, চৌচকা, আলকাপ আর ধানকাটার সুর। সরকার, প্রতিষ্ঠান, নাগরিক— প্রত্যেকে যদি আমাদের ক্ষীণ হয়ে আসা লোকসংস্কৃতি ফেরায় অংশগ্রহণ করে, তা হলে ইতিহাসের পাতায় ‘একদিন বাংলার লোকসংস্কৃতি ছিল’– এই বেদনায় পরিণত হবে না, বরং হয়ে উঠবে—‘ আজও বাঁচে বাঙালি— তার সজীব ঐতিহ্যের চেতনায় (Bengal Folk Culture)।’






