সম্পাদকীয়

তথ্যের বিস্ফোরণ, সত্যের সঙ্কট, সামাজিক মাধ্যমে সত্য-মিথ্যা

সাধারণ মানুষও এখন তথ্যের প্রাপক নন, তথ্যের প্রচারক

মহম্মদ মফিজুল ইসলাম (লেখক— বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক): আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন তথ্য পাওয়া আর কঠিন নয়। বরং সমস্যা হল কোন তথ্য সত্য, কোনটি মিথ্যা এবং কোনটি অর্ধসত্য, তা বোঝা। হাতে থাকা একটি মুঠোফোন কয়েক সেকেন্ডে পৃথিবীর নানা প্রান্তের খবর এনে দিচ্ছে। সামাজিক মাধ্যম মানুষের যোগাযোগের পরিসর অভাবনীয় ভাবে বাড়িয়েছে। সাধারণ মানুষও এখন তথ্যের প্রাপক নন, তথ্যের প্রচারক। একটি ছবি, একটি ভিডিয়ো বা একটি ছোট বার্তা মুহূর্তে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এই অভূতপূর্ব ক্ষমতার সঙ্গে এসেছে একটি বড় বিপদ। ভুল তথ্যও এখন আগের চেয়ে অনেক দ্রুত ছড়ায়। সত্য যাচাই করার আগেই মিথ্যা মানুষের বিশ্বাসে জায়গা করে নিতে পারে। তথ্যের এই বিস্ফোরণের যুগে তাই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠেছে বিশ্বাসযোগ্যতা।

ভুল তথ্য নতুন কিছু নয়। গুজব বহু যুগ ধরেই সমাজকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যম তার গতি ও পরিসর বদলে দিয়েছে। আগে একটি গুজব একটি পাড়া বা শহরে সীমাবদ্ধ থাকতে পারত। এখন তা কয়েক মিনিটে বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এখন ছবি তৈরি করা যায়। কণ্ঠস্বর নকল করা যায়। ভিডিয়ো পরিবর্তন করা যায়। কোনও ব্যক্তি এমন কথা বলেছেন বলে দেখানো সম্ভব, যা তিনি আদৌ বলেননি। ফলে চোখে দেখা বা কানে শোনা তথ্যকেও আগের মতো সহজে সত্যের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যাচ্ছে না। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সাম্প্রতিক ঝুঁকি মূল্যায়নেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিস্তারকে তথ্যের প্রতি মানুষের আস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই সমস্যার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল মানুষের মনস্তত্ত্ব। মানুষ সবসময় নিরপেক্ষ ভাবে তথ্য গ্রহণ করে না। যে খবর তার নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে, সেটিকে সে সহজে সত্য বলে মেনে নিতে চায়। যে খবর তার মতের বিরোধী, সেটিকে সন্দেহ করতে পারে। সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদমও অনেক সময় ব্যবহারকারীর আগ্রহ অনুযায়ী একই ধরনের কনটেন্ট বারবার সামনে আনে। ফলে মানুষ ক্রমশ এমন একটি তথ্যজগতে আটকে পড়তে পারেন, যেখানে তাঁর নিজের মতের প্রতিধ্বনিই বেশি শোনা যায়। তৈরি হয় এক ধরনের মতের বৃত্ত। সেখানে ভিন্ন মতকে বোঝার সুযোগ কমে। যুক্তির বদলে পরিচয় ও আবেগ বড় হয়ে ওঠে। গণতন্ত্রের জন্য এই প্রবণতা নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক।

ভুয়ো খবরের শক্তি অনেক সময় তার সত্যতার মধ্যে থাকে না। থাকে তার আবেগ সৃষ্টির ক্ষমতায়। রাগ, ভয়, ঘৃণা, বিস্ময় বা উত্তেজনা তৈরি করে এমন খবর দ্রুত ছড়াতে পারে। একটি উত্তেজক শিরোনাম অনেক সময় পুরো খবর পড়ার আগেই মানুষের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে দেয়। ছবি বা ভিডিয়ো থাকলে সেই বিশ্বাস আরও শক্ত হতে পারে। অথচ ছবি সত্যি হলেও তার সঙ্গে দেওয়া ব্যাখ্যা মিথ্যা হতে পারে। পুরনো ভিডিয়োকে নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যায়। একটি ঘটনার ছবি অন্য ঘটনার নামে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। ফলে তথ্যের সত্যতা যাচাই এখন শুধু বিষয়বস্তু দেখার প্রশ্ন নয়। তার উৎস, সময়, প্রেক্ষাপট এবং উদ্দেশ্যও বুঝতে হয়।

গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে এই সঙ্কট আরও গভীর। গণতন্ত্রের ভিত্তি শুধু ভোট নয়। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে নাগরিকের মত গঠনও তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন নাগরিক যদি ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেন, তবে তাঁর স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নির্বাচনের সময় এই ঝুঁকি আরও বাড়ে। কোনও প্রার্থী সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া যায়। পুরনো বক্তব্যকে নতুন বলে প্রচার করা যায়। কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি বা ভিডিয়ো দিয়ে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা হতে পারে। ভারতের নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী প্রচারে কৃত্রিম ভাবে তৈরি বা পরিবর্তিত কনটেন্ট স্পষ্ট ভাবে চিহ্নিত করার পরামর্শ দিয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও কমিশন সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো একাধিক বিভ্রান্তিকর দাবি খণ্ডন করে নাগরিকদের সঠিক তথ্য জানিয়েছিল।

তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের প্রশ্ন আছে। ভুয়ো তথ্য রোধ করতে গিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কোনও বক্তব্য ভুল বা অস্বস্তিকর মনে হলেই সেটিকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া গণতান্ত্রিক সমাধান নয়। আবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা, প্রতারণামূলক কনটেন্ট বা সহিংসতা উসকে দেওয়ার প্রচারকেও অবাধ ছাড় দেওয়া যায় না। তাই প্রয়োজন স্পষ্ট নিয়ম। প্রয়োজন স্বচ্ছ প্রক্রিয়া। প্রয়োজন স্বাধীন যাচাই। কোথায় মতামত শেষ হচ্ছে এবং কোথায় ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তি শুরু হচ্ছে, সেই সীমারেখা নির্ধারণ সহজ নয়। কিন্তু কঠিন বলেই সেই কাজ এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

এই ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যম সংস্থাগুলির দায়িত্বও কম নয়। যে প্ল্যাটফর্ম কোটি কোটি মানুষের তথ্য গ্রহণ ও প্রচারের মাধ্যম হয়ে উঠেছে, তার দায় শুধু প্রযুক্তি সরবরাহে শেষ হতে পারে না। বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট শনাক্ত করার ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। কৃত্রিম ভাবে তৈরি কনটেন্টের পরিচয় স্পষ্ট করার প্রযুক্তি বাড়াতে হবে। ব্যবহারকারীকে অভিযোগ জানানোর কার্যকর সুযোগ দিতে হবে। ভুল সিদ্ধান্ত হলে সংশোধনের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। একই সঙ্গে প্ল্যাটফর্মের নীতিগুলি কতটা কার্যকর ভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা দরকার। কারণ অ্যালগরিদমের সিদ্ধান্ত যখন জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে, তখন তার সামাজিক দায়ও তৈরি হয়।

কিন্তু সব দায় প্রযুক্তি সংস্থার উপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। নাগরিকেরও দায় আছে। কোনও চমকপ্রদ খবর দেখেই তা অন্যের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে যে খবর মানুষের ধর্ম, জাতি, ভাষা, রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত, তা ছড়ানোর আগে আরও বেশি সতর্ক হওয়া দরকার। একটি বার্তা ফরোয়ার্ড করা খুব সহজ। কিন্তু তার ভুল প্রমাণিত হলে ক্ষতি ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন। তাই তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নাগরিক শৃঙ্খলা দরকার। ডিজিটাল সাক্ষরতার অর্থ শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার শেখা নয়। তথ্যকে প্রশ্ন করতে শেখাও তার অংশ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শিশু ও তরুণদের শুধু তথ্য খুঁজে পাওয়া শেখালে হবে না। কোন উৎস বিশ্বাসযোগ্য, কী ভাবে একটি ছবির প্রেক্ষাপট যাচাই করতে হয়, একটি দাবির পক্ষে প্রমাণ আছে কি না, মতামত ও তথ্যের মধ্যে পার্থক্য কোথায়, সেই শিক্ষাও দিতে হবে। সংবাদ পড়ার অভ্যাস তৈরি করা দরকার। একাধিক উৎসের তথ্য মিলিয়ে দেখার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। প্রশ্ন করার ক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের নাগরিককে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারকারী বানালে চলবে না। তাকে বিচক্ষণ তথ্যগ্রাহকও হতে হবে।

সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বও এই সময়ে আরও বেড়েছে। সামাজিক মাধ্যমের গতি ধরে রাখতে গিয়ে সংবাদমাধ্যম যদি যাচাইয়ের মান কমিয়ে দেয়, তবে তার বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দ্রুত খবর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দ্রুততার চেয়ে নির্ভুলতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ ও মতামতের সীমারেখা স্পষ্ট থাকা দরকার। ভুল হলে প্রকাশ্যে সংশোধন করার সংস্কৃতিও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার পাঠকের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস একবার নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন।

সামাজিক সম্প্রীতির ক্ষেত্রেও তথ্যের সঙ্কটের প্রভাব মারাত্মক হতে পারে। একটি মিথ্যা ছবি একটি সম্প্রদায় সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি করতে পারে। একটি পুরনো ভিডিয়ো নতুন ঘটনার নামে ছড়িয়ে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। একটি বানানো বক্তব্য মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়াতে পারে। সামাজিক বিভাজন যত বাড়ে, ততই মানুষ নিজের পক্ষের তথ্য বিশ্বাস করতে আগ্রহী হয়। ফলে একটি বিপজ্জনক চক্র তৈরি হয়। ভুল তথ্য মেরুকরণ বাড়ায়। মেরুকরণ আবার ভুল তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০২৬ সালের ঝুঁকি মূল্যায়নেও বিভ্রান্তিকর তথ্য ও সামাজিক মেরুকরণকে পরস্পরকে শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তবে এই সঙ্কটের মধ্যে একটি ইতিবাচক দিকও আছে। মানুষ এখন তথ্যের সত্যতা নিয়ে আগের চেয়ে বেশি সচেতন হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তথ্য যাচাই করছে। নির্বাচন কমিশন নিজস্ব তথ্য যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রযুক্তিও একই সঙ্গে সমস্যা ও সমাধানের হাতিয়ার হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেমন মিথ্যা কনটেন্ট তৈরি করতে পারে, তেমনই তা সন্দেহজনক কনটেন্ট শনাক্ত করতেও ব্যবহার করা যায়। তাই প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়া নয়। তাকে দায়িত্বশীল ভাবে ব্যবহার করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

শেষ পর্যন্ত সত্যের সঙ্কট শুধু প্রযুক্তির সঙ্কট নয়। এটি মানুষের বিচারবুদ্ধিরও পরীক্ষা। আমরা কী বিশ্বাস করছি, কেন বিশ্বাস করছি এবং যাচাই না করে কেন তা অন্যের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি, সেই প্রশ্নগুলি নিজেদেরই করতে হবে। গণতন্ত্রে সত্যের কোনও একক মালিক নেই। সরকার, সংবাদমাধ্যম, প্রযুক্তি সংস্থা কিংবা কোনও রাজনৈতিক দল একা সত্যের পাহারাদার হতে পারে না। প্রত্যেকেরই দায় আছে। রাষ্ট্রকে স্বচ্ছ নিয়ম তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তি সংস্থাকে জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে। সংবাদমাধ্যমকে তার পেশাগত মান রক্ষা করতে হবে। নাগরিককে নিজের তথ্য ব্যবহারের দায় নিতে হবে।

তথ্যের যুগে সবচেয়ে বড় সমস্যা তথ্যের অভাব নয়। সমস্যা হল তথ্যের ভিড়ে সত্যকে চিনে নেওয়া। আগামী দিনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আরও শক্তিশালী হবে। ছবি, ভিডিয়ো ও কণ্ঠস্বর আরও বাস্তব বলে মনে হবে। তখন সত্য যাচাই আরও কঠিন হতে পারে। তাই এখন থেকেই আমাদের একটি নতুন সামাজিক অভ্যাস তৈরি করতে হবে। শুনলেই বিশ্বাস নয়। দেখলেই সত্য নয়। ছড়ালেই জনপ্রিয় নয়। তথ্যকে প্রশ্ন করতে হবে। প্রমাণ খুঁজতে হবে। ভিন্ন মত শুনতে হবে। কারণ গণতন্ত্র শুধু কথা বলার স্বাধীনতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। সত্য তথ্যের ভিত্তিতে বিবেচনা করার ক্ষমতার ওপরও তার ভিত নির্মিত। সেই ক্ষমতা হারিয়ে গেলে তথ্যের বিস্ফোরণের মাঝেও সমাজ সত্যের গভীর সঙ্কটে পড়বে।

Related Articles