রাজ্যের খবর

২ মিনিটের সাক্ষাৎ, তাতেই কেল্লাফতে! শুভেন্দু-ঋতব্রতর চালে যেভাবে তাসের ঘর হল তৃণমূল

বুদ্ধদেবের ‘প্রিয় পাত্র’ আজ শুভেন্দুর তুরুপের তাস! ঋতব্রতর এই মারাত্মক চালে গোপনে হাসছেন বামপন্থীরা?

Truth of Bengal: দিল্লির বঙ্গভবনে মাত্র দুই মিনিটের একটি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ। মুখোমুখি হওয়া দু’জন হেভিওয়েট নেতার সেই ছবি দেখে প্রথমটায় অনেকেই একে নিছক ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু দিল্লির সেই ঘরের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের কয়েকটা মুহূর্ত যে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে গোটা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির চেনা ভূগোল ও অঙ্ক এভাবে ওলটপালট করে দেবে, তা বোধহয় ঘুণাক্ষরেও টের পাননি বড় বড় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। গত ২২ মে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অতিথিশালায় রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) সঙ্গে দেখা করেছিলেন তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Ritabrata Banerjee)। সেখানে শুভেন্দুকে অত্যন্ত হাসিমুখে ঋতব্রতের কাঁধে হাত রেখে কথা বলতে দেখা যায়। আজ পরিষ্কার, সেই ২ মিনিটের চাণক্য চালই আসলে ছিল নব্য তৃণমূল গঠনের আঁতুড়ঘর।

সামনের সারিতে ঋতব্রত, আসল কারিগর কি শুভেন্দু?

যদিও সেদিন দলবদলের জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে ঋতব্রত দাবি করেছিলেন, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দেখা হওয়াটা সম্পূর্ণ আকস্মিক ও কাকতালীয়। কিন্তু রাজনীতিতে যে কোনও কিছুই ‘আকস্মিক’ নয়, তা চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই প্রমাণিত হয়ে গেল। আজ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ই রাজ্য রাজনীতির প্রধান ভরকেন্দ্র। বিধানসভায় তৃণমূলের অন্দরে এক অভূতপূর্ব বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) একাধিপত্যকে।

তাঁর হাবেভাবে এবং ৬০ জন বিধায়কের সমর্থন পকেটে পুরে ঋতব্রত স্পষ্ট করে দিয়েছেন, সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ছাড়াই এবার দাপটের সঙ্গে চলবে ‘নতুন তৃণমূল’। তবে এই নাটকীয় পটপরিবর্তনের নেপথ্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সুগভীর রাজনৈতিক ব্লু-প্রিন্ট ও ক্ষুরধার রণকৌশল কাজ করছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একটি বড়ো অংশ। ঋতব্রতকে সামনে রেখে শুভেন্দুই আসলে পেছন থেকে রিমোট কন্ট্রোল চালাচ্ছেন।

ইতিহাসের চরম পরিহাস, হাসছেন বাম সমর্থকরা!

এই গোটা ঘটনার সবচেয়ে বড় ও আকর্ষণীয় পরিহাস লুকিয়ে রয়েছে ঋতব্রতের নিজের রাজনৈতিক অতীতে। যে ব্যক্তি আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাধের দলের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার মূল মুখ, তাঁর রাজনৈতিক উত্থান কিন্তু চরম মমতা-বিরোধী বামপন্থী শিবির থেকে। রাজ্যের প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের একসময়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা ঋতব্রত ছিলেন এসএফআইয়ের (SFI) সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। এমনকি ২০১৩ সালে দিল্লিতে তৎকালীন তৃণমূলের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রকে ঘিরে বিক্ষোভ ও হেনস্থার ঘটনায় মূল অভিযুক্তের তালিকায় নাম ছিল এই ঋতব্রতেরই।

তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। সিপিএম থেকে বহিষ্কার, তৃণমূলে যোগ, রাজ্যসভার সাংসদ হওয়া এবং শেষমেশ বিধায়ক পদ পাওয়া, ঋতব্রতের রাজনৈতিক গ্রাফে বিস্তর বাঁক রয়েছে। তবে ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, চিন্তায় ও মননে ঋতব্রত আজও খাঁটি বামপন্থী। ফলে বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে এটা এক বিরলতম অধ্যায়, যেখানে একদা বামেদের পোস্টার বয় আজ মমতাপন্থীদের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর ঠিক এই কারণেই, প্রকাশ্যে কিছু না বললেও বহু পুরনো আলিমুদ্দিনপন্থী বাম সমর্থকদের মুখে এখন এক চাপা তৃপ্তির হাসি দেখা যাচ্ছে!

Related Articles