সম্পাদকীয়

BJP: বাঙালি অস্মিতা, ট্রাম্প আর কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ—ত্রিমুখী বিতর্কে বিজেপি

সেই ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধু যে পাকিস্তানের সেনানায়ক আসিফ মুনিরকে হোয়াইট হাউজে ডেকে দাওয়াত খাওয়াবেন, তা তো নরেন্দ্র মোদি আন্দাজই করেননি।

Truth of Bengal: সুমন ভট্টাচার্যঃ “ট্রাম্প, ট্রাম্প নেহি রাহা”। রাজ কাপুরের ‘সংগম’ সিনেমার সেই বিখ্যাত গানটি একটু বদলে নিয়ে বিজেপি (BJP) নেতারা বা স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি গাইতেই পারেন। গাইতেই পারেন শুভেন্দু অধিকারী কিংবা রাজ্য বিজেপির কেষ্ট-বিষ্টু মুখপাত্ররা, কারণ, যেদিন ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে ফিরবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছিল, সেদিন শুভেন্দু অধিকারী থেকে নরেন্দ্র মোদি সবাই হিন্দুদের ‘মহান ত্রাতা’ হিসেবে অতি দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ‘আইকন’ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চিহ্নিত করেছিলেন। শুধু চিহ্নিত করেননি, তাঁকে পুজো করেছিলেন, তাঁর ভবিষ্যতের কার্যকলাপ নিয়ে নানা ধরনের ভবিষ্যদ্বাণীও শুনিয়েছিলেন।

সেই ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধু যে পাকিস্তানের সেনানায়ক আসিফ মুনিরকে হোয়াইট হাউজে ডেকে দাওয়াত খাওয়াবেন, তা তো নরেন্দ্র মোদি আন্দাজই করেননি। তারপরে একেবারে ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দেবেন, সেটাও একেবারে অভাবনীয় ছিল। তাই এখন হয়তো নরেন্দ্র মোদি গাইতেই পারেন, ‘দুশমন না করে দোস্ত নে ও কাম কিয়া হে’। রাজেশ খান্না-স্মিতা পাটিলের ওই জনপ্রিয় গানটি এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং নরেন্দ্র মোদির সম্পর্কের জন্য প্রয়োজনীয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, যদি ‘বন্ধু’ এই কাজ করে, তা হলে আর শত্রুর কী দরকার? নরেন্দ্র মোদি যাঁকে ‘বন্ধু’ হিসেবে দেখিয়েছিলেন, সেই ‘বন্ধু’ যে এইভাবে নরেন্দ্র মোদির পিঠে ‘খঞ্জর’ ঢুকিয়ে দেবেন, তা কে-ই বা ভেবেছিল? ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কের ধাক্কায় ভারতবর্ষের রফতানি বাণিজ্যের কী হবে? ভারতবর্ষের জিডিপি-র কতটা ক্ষতি হবে, তা এখনও আমরা জানি না। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক বক্তব্য এবং মার্কিন আদালতে আদানির বিরুদ্ধে ঝুলে থাকা মামলা নিশ্চয়ই বিজেপি নেতৃত্বকে উদ্বেগে রেখেছে। (BJP)

[আরও পড়ুনঃ Bengali Horoscope: ১০ আগস্ট: কেমন যাবে আজকের দিন? ১২ রাশির জন্য বিশেষ বার্তা]

যেহেতু নরেন্দ্র মোদি-জয়শঙ্কররাই ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সখ্য বাড়িয়েছিলেন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘মাসিহা’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, তাই এখন পুরো দায়টাই তাঁদের ঘাড়ে চাপছে। বিরোধীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যেমন পশ্চিমবঙ্গের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও, যে যাঁরা ট্রাম্পের সমর্থনে নির্বাচনী স্লোগান দিয়েছিলেন, এখন পরিস্থিতির মোকাবিলা তাঁদেরই করতে হবে। কথাটা এতটাই সত্যি, যে শুভেন্দু অধিকারী হিন্দুদের ‘পরিত্রাতা’ হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম মুখেও আনছেন না। শুভেন্দু অধিকারী বা জয়শঙ্কর ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম এড়িয়ে যেতে পারেন, কিন্তু কংগ্রেস নেতারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, যে ইন্দিরা গান্ধি কীভাবে রিচার্ড নিক্সনের চোখে চোখ রেখে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে কেন ভারতবর্ষের বিদেশনীতি এতটা আমেরিকার দিকে ঝুঁকে পড়ল এবং আমেরিকাই কেন বা এতটা ‘প্রতিদান’ দিল, তা অবশ্যই আলোচয় বিষয় এবং সেই আলোচ্য বিষয় নরেন্দ্র মোদির জন্য খুব সুখকর নয়।(BJP)

গোটা ভারতবর্ষই চায় যে ভারত আমেরিকার কাছে যেন আত্মসমর্পণ না করে। যেন নিজেরা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে নিজেদের অর্থনীতি এবং বিদেশনীতি চালাতে পারে। সেটাই যে-কোনও সরকারের কর্তব্য। কিন্তু এক সময় আমেরিকা এবং ইজরায়েলের দিকে ভারত এতটাই ঝুঁকেছিল, বা বলা চলে নরেন্দ্র মোদির ভারতবর্ষ এতটাই ঝুঁকেছিল যে, এখন তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে শুধুমাত্র বিদেশনীতি না ভারতবর্ষের অর্থনীতির উপর যে ধাক্কা এসেছে, তাকে কাটানোরও বন্দোবস্ত করতে হচ্ছে। নরেন্দ্র মোদি আদানির বিরুদ্ধে চলতে থাকা তদন্তের কী করবেন, আদালতের মামলার কী করবেন, তার কিছুই কেউ জানে না। নরেন্দ্র মোদির কাছে শুভেন্দু অধিকারীর স্বার্থের চাইতে গৌতম আদানির স্বার্থ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই বলাই বাহুল্য যে, আগে নরেন্দ্র মোদি আদানিকে আমেরিকায় বাঁচাবেন, তারপরে অন্য কোনও রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে ভাববেন।(BJP)

[লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/truthofbengal]

এরই মাঝে রাহুল গান্ধি যেভাবে একের পর এক সাংবাদিক সম্মেলন করে, ভিডিও করে নির্বাচন কমিশনকে বে-আব্রু করে দিচ্ছেন, সেটাও বিজেপির জন্য চিন্তার। যদি রাহুল গান্ধি এটা চালিয়ে যান, তা হলে ভারতবর্ষের বড় অংশের মনে এই ধারণা তৈরি হবে, যে ভোটে ‘কারচুপি’ করেই বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। ভারতবর্ষের গণতন্ত্র সম্পর্কে ভারতবাসীর মনে একটা ধারণা আছে। হয়তো অহংবোধও আছে। সেই অহংবোধে যদি ধাক্কা লাগে, সেটাও নরেন্দ্র মোদির জন্য খুব সুখকর নয়। কারণ, আমাদের পুবের দেশ বাংলাদেশে নির্বাচনে ‘কারচুপি’ করা হয়েছিল এই অভিযোগেই যে জনবিক্ষোভ হয়েছিল, তার জেরেই শেখ হাসিনাকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে এসে ভারতবর্ষে থাকতে হয়েছে। আর পশ্চিমের দেশ, যেখানে গণতন্ত্রের হাল আরও খারাপ, সেখানে নির্বাচনে সর্বাধিক প্রার্থীকে জিতিয়ে এনেও ইমরানকে সেনাবাহিনী জেলে পাঠিয়েছে আর সেনাবাহিনীর অঙ্গুলিহেলনেই সরকার চলছে। সেই সেনাবাহিনীর প্রধানই এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে প্রিয়। তো পুবের এবং পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশগুলির উদাহরণ থেকে যদি ভারতবর্ষের মানুষ মনে করে ভারতবর্ষের শক্তিশালী গণতন্ত্র এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকেও বিজেপি আসলে ‘কারচুপি’ করে দখল করেছে, তা হলে সেটা নরেন্দ্র মোদির ভাবমূর্তির জন্য খুব একটা ভাল নয়।(BJP)

যে রাহুল গান্ধিকে ‘পাপ্পু’ বা অন্য বিভিন্ন তকমা বিজেপি এত দিন ব্রাত্য করে রেখেছিল, সেই রাহুল গান্ধির একের পর এক সাংবাদিক সম্মেলন করে কর্ণাটক থেকে বিহার নির্বাচনের এবং ভোটার তালিকার বিভিন্ন অসংগতি নিয়ে যেভাবে প্রশ্ন তুলছেন, তাতে সকলেই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি কংগ্রেসি নন কিংবা রাহুল গান্ধির ভক্ত নন, এরকম অনেকেই স্বীকার করছেন, যে এবার কিন্তু রাহুল গান্ধিকে আর অবহেলা করা যাবে না। বরং তিনি যেভাবে ভারতবর্ষের গণতন্ত্রের স্বপক্ষে, একটি সঠিক নির্বাচনী ব্যবস্থা সম্পর্কে কথা বলছেন, তাতে সকলেই মুগ্ধ হচ্ছেন। রাহুল যেভাবে আগ্রাসী ভূমিকায় রয়েছেন, তাতে ভারতবর্ষে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে যদি কোনও জনবিক্ষোভ তৈরি হয়, সেটা নরেন্দ্র মোদির জন্য অবশ্যই অনুকূল পরিস্থিতি নয়। সিএএ-এনআরসি-র সময় আমরা দেখেছিলাম রাস্তায় প্রবল আন্দোলন, জন-আন্দোলনের চাপে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহদের পিছু হটতে হয়েছিল। রাস্তায় আন্দোলনের মোকাবিলায় কোনও দিনই নরেন্দ্র মোদি বা বিজেপি খুব একটা স্বচ্ছন্দ নয়। রাহুল গান্ধি-তেজস্বী যাদবরা এবং পশ্চিমবঙ্গে অবশ্যই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়রা যদি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে একেবারে রাস্তায় নামিয়ে দিতে পারেন, তা হলে কিন্তু সেটা গেরুয়া শিবিরের জন্য অশনি সংকেত।

এর উপরে রয়েছে বাংলা ‘বাঙালি অস্মিতা’ নিয়ে ঝাঁজ। তৃণমূল তো বটেই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একেবারে ভাষা আন্দোলনের ডাক দিয়ে দিয়েছেন। অন্য দলগুলিও যেভাবে বিজেপিকে নিশানা করছে, তাতে গেরুয়া শিবির খুব স্বস্তিতে নেই। দিল্লি পুলিশের একটি নোটিশ এবং তাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অমিত মালব্যের ‘বাংলা কোনও ভাষাই নয়’ এই মন্তব্য একেবারে ‘বাঙালির অস্মিতা’য় আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। বাঙালির এহেন অপমান বোধহয় গত ১০০ বছরে কোনও সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দলের কাছ থেকেই পায়নি। যে বিজেপি (BJP) নাকি বাংলা দখল করতে আকুল, তাদের এহেন হারাকিরি ঠিক বুঝে ওঠা যাচ্ছে না। তার উপরে অমিত মালব্যকে ‘রক্ষা’ করতে গিয়ে বিজেপির ছোট, বড়, মেজো মুখপাত্ররা তিওয়ারি থেকে ঘোষেরা এমন সব মন্তব্য করেছেন, যা বাঙালির হৃদয়ে আরও ধাক্কা দিয়েছে। ঘোর বাম থেকে ঘোর ডান সকলেই নেমে পড়েছে বাঙালির অস্মিতা রক্ষায়।

এই ‘বাঙালি অস্মিতা’ যে কত ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা বোধহয় গেরুয়া শিবির প্রথমে বুঝে উঠতে পারেনি। এমনকী উত্তরবঙ্গ, যেখানে তাদের শক্ত ঘাঁটি, সেই উত্তরবঙ্গেও ‘বাঙালি অস্মিতা’র আঁচ ছড়িয়ে পড়ছে। বিজেপির (BJP) জন্য তাই এখন ‘ত্র্যহস্পর্শ’। ট্রাম্প ছিলেন, তারপর নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে ক্রমাগত রাহুল গান্ধির চাপ, এর উপরে যোগ হয়েছে ‘বাঙালি অস্মিতা’র প্রশ্নে বাঙালির ‘রণংদেহি’ মূর্তি। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রক্তের স্বাদ পেয়ে যাওয়ায় ‘বাঙালি অস্মিতা’কে একেবারে চরম পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন। তৃণমূল সাংসদরা লোকসভা-রাজ্যসভায় বাংলায় চিঠি লিখছেন, বাংলায় কথা বলছেন এবং বাংলাতেই বিজেপিকে বিঁধে চলেছেন।

আসলে যে ভাষায় রবীন্দ্রনাথ-বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন, সেই ভাষাকে শ্রাবণের এই ভরা বর্ষায় আক্রমণ করাটা যে অমিত মালব্যের জন্য নেহাতই ফুলটস বলে ব্যাট চালানো হয়ে গিয়েছে, সেটা বোধহয় বিজেপির সর্বভারতীয় নেতৃত্বই ভালই বুঝতে পারছেন। কিন্তু এখন কী বা করার আছে? সব কিছুই বিজেপির হাতের বাইরে। বিজেপি যত আগ্রাসী হবে, তত মানুষের ক্ষোভ বাড়বে। আর মানুষের ক্ষোভ বাড়লে কী হতে পারে, সেটা বোধহয় গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশ থেকে শেখ হাসিনার পালানো এবং হেলিকপ্টারে চড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি থেকে পরিষ্কার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশ দেখিয়ে দিয়েছে, যদি মানুষের সঙ্গে সংযোগ ছিন্ন হয়ে যায় এবং একটা বড় অংশের জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, তা হলে কোনও ‘মেকানিজম’ বা কোনও দমন-পীড়ন দিয়েই শাসনব্যবস্থা ধরে রাখা যায় না। বিজেপির জন্য তাই ইতিমধ্যেই অশনি সংকেত। সেই অশনি সংকেত দিয়ে নরেন্দ্র মোদি তাঁর ‘ক্যারিশমা’ দিয়ে কতটা কাটাতে পারবেন, নাকি ক্রমশ বিরোধীদের চাপ বাড়বে, সেটাই এখন সবাইকে ভাবাচ্ছে।

Related Articles