১৮ বার আক্রান্ত হয়েও কীভাবে অলৌকিকভাবে অক্ষত রইলেন পুরীর জগন্নাথ?
টানা ১৪৬ বছরের অজ্ঞাতবাস! শত্রুর হাত থেকে মহাপ্রভুকে বাঁচাতে কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলেন সেবায়েতরা?
Truth of Bengal: রক্তবর্ণ চোখ আর হাতে উদ্যত তলোয়ার নিয়ে একের পর এক আক্রমণকারী আছড়ে পড়েছে ওড়িশার উপকূলে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, শ্রীক্ষেত্রের অঢেল রত্নসম্ভার লুট করা এবং কোটি মানুষের সনাতন ধর্মে চরম আঘাত হানা। বারবার রক্তাক্ত হয়েছে পুরীর পবিত্র জগন্নাথ মন্দির। কিন্তু প্রতিবারই কোনও এক অলৌকিক মহিমায় শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে তাণ্ডবকারীদের! ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেও পরম অলৌকিকতায় সম্পূর্ণ অক্ষত ও অপরাজেয় রয়ে গিয়েছেন স্বয়ং দারুব্রহ্ম।
১৮ বার আক্রমণ, তাও অক্ষত মহাপ্রভু
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নবম শতকে রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় গোবিন্দ থেকে শুরু করে ১৭৩৩ সালে তকি খাঁ, দীর্ঘ সময়সীমায় মোট ১৮ বার বর্বর আক্রমণের মুখে পড়েছে পুরীর এই মন্দির। প্রতিটি আক্রমণের মূল উদ্দেশ্যই ছিল মন্দিরের রত্নভাণ্ডার লুঠ করা এবং বিগ্রহ বিনাশ করা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, বারবার মন্দির চত্বর রক্তে ভেসে গেলেও মূল বিগ্রহের গায়ে একটি আঁচড়ও লাগাতে পারেনি চরম ধর্মান্ধ শত্রুসেনারা।
সেবায়েতদের বুদ্ধিমত্তা ও ১৪৬ বছরের অজ্ঞাতবাস
জগন্নাথদেবের এই অক্ষত থাকার রহস্য লুকিয়ে রয়েছে মন্দির সেবায়েতদের অদ্ভুত তৎপরতা ও সতর্কতায়। শত্রুপক্ষ পুরীতে পা রাখার আগেই গভীর রাতে মন্দির খালি করে ফেলা হত। কখনো চিল্কা হ্রদের নির্জন দ্বীপ, কখনও খুরদার গহিন জঙ্গল, আবার কখনও বা কোনও অন্ধকার গুহায় গোপনে সরিয়ে নেওয়া হত মূল বিগ্রহকে। মহাপ্রভুকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে সেবায়েতরা যুগ যুগ ধরে কাজ করেছেন। এমনকি ইতিহাসের এক দীর্ঘ সময়ে তাঁরা টানা ১৪৬ বছর বিগ্রহকে এভাবে অজ্ঞাতবাসে রেখে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
কালাপাহাড়ের তাণ্ডব ও ‘ব্রহ্ম পদার্থ’ রক্ষা
১৫৬৮ সালে সুলাইমান কররানীর সেনাপতি কালাপাহাড়ের আক্রমণ ছিল মন্দিরের ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক ও নৃশংস। সে গোটা মন্দির ভেঙে তছনছ করে এবং পবিত্র বিগ্রহকে গঙ্গার তীরে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কথিত আছে, জ্বলন্ত কাঠের চিতা থেকে নিজের জীবন বাজি রেখে পরম অলৌকিকতায় ‘ব্রহ্ম পদার্থ’ উদ্ধার করে এনেছিলেন এক নিষ্ঠাবান ভক্ত। যা পরবর্তীতে পুনর্গঠিত নতুন বিগ্রহে পুনরায় সংস্থাপিত করা হয়।
মুঘল সেনাকে বোকা বানানোর কৌশল
১৬৯২ সালে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে ওড়িশার নায়েব একরাম খাঁ যখন পুরী আক্রমণ করেন, তখন তৈরি হয়েছিল অন্য এক ইতিহাস। মন্দির পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং লুট হয় প্রচুর সম্পদ। কিন্তু একরাম খাঁ পৌঁছানোর আগেই বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে আসল বিগ্রহ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দিয়ে সেখানে কাঠ দিয়ে তৈরি হুবহু একটি নকল মূর্তি বসিয়ে রেখেছিলেন সেবায়েতরা। ফলে শত্রুরা নকল মূর্তি নিয়েই জয়ী হওয়ার ভুয়ো অহংকার বুকে চেপে দিল্লি ফিরে যায়।
আজ শত শত বছর পরেও সমস্ত ঝড়ের তাণ্ডব সামলে নীলচক্রের ওপর সগর্বে উড়ছে পতিতপাবন বানা। ১৮ বার আছড়ে পড়া ধ্বংসলীলার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও জগন্নাথদেব আজ একই রত্নবেদীতে আসীন। এই রহস্যময় টিকে থাকা কেবল ওড়িশার ইতিহাস নয়, বরং কোটি সনাতন ধর্মাবলম্বীর বিশ্বাসের এক অনন্য ও অলৌকিক বিজয়গাথা।


