বকেয়া ডিএ মেটাতে গুনতে হবে পাহাড়প্রমাণ টাকা! সুপ্রিম নির্দেশে চাপ কতটা বাড়ল?
বৃহস্পতিবার রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া মহার্ঘভাতা (ডিএ) সংক্রান্ত মামলায় রায় ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে, পুরনো বকেয়া ডিএ-র অন্তত ২৫ শতাংশ অবিলম্বে মিটিয়ে দিতে হবে রাজ্য সরকারকে।
Truth Of Bengal: সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর মামলায় বুধবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সওয়াল ঘিরে জাতীয় ও রাজ্য রাজনীতিতে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছিল। তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শীর্ষ আদালতের আর এক নির্দেশে রাজ্য সরকারের উপর বড়সড় আর্থিক চাপ তৈরি হল। বৃহস্পতিবার রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া মহার্ঘভাতা (ডিএ) সংক্রান্ত মামলায় রায় ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে, পুরনো বকেয়া ডিএ-র অন্তত ২৫ শতাংশ অবিলম্বে মিটিয়ে দিতে হবে রাজ্য সরকারকে।
এই রায়ের পরেই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে—ভোটের মুখে নবান্নের ঘাড়ে ঠিক কতটা আর্থিক বোঝা চাপল? প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ মেটাতে রাজ্য সরকারের খরচ হতে পারে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকার কিছু কম। অর্থাৎ, মোট বকেয়া ডিএ-র অঙ্ক প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যের পক্ষে এই অঙ্ক যে অত্যন্ত বড়, তা মানছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরাও।
তুলনা টানলে দেখা যাচ্ছে, শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেটে রাজ্যের কৃষিখাতে বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ, শুধু ২৫ শতাংশ বকেয়া ডিএ মেটাতেই কৃষিখাতের বরাদ্দের থেকেও বেশি টাকা খরচ করতে হবে। আবার ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে রাজ্য সরকারের ব্যয় ছিল ১৯ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। সম্পূর্ণ বকেয়া ডিএ মেটাতে হলে তার দ্বিগুণেরও বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে।
স্বাভাবিকভাবেই বিরোধীরা এই রায়কে রাজ্য সরকারের জন্য বড় ‘ধাক্কা’ হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করেছে। বিধানসভার বাইরে দাঁড়িয়ে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী স্লোগান দেন, “হারিল রে হারিল, মমতা হারিল।” বিরোধী শিবিরের মতে, এই রায় রাজ্যের আর্থিক অবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে।
তবে তৃণমূলের অন্দরে বিষয়টিকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। শাসকদলের এক আইনজীবী নেতার বক্তব্য, হাই কোর্টের আগের নির্দেশ রাজ্য সরকারের জন্য অনেক বেশি কঠিন ছিল। সেই রায়ে বলা হয়েছিল, তিন মাসের মধ্যে ১০০ শতাংশ বকেয়া ডিএ মিটিয়ে দিতে হবে। সেখানে সুপ্রিম কোর্ট আপাতত মাত্র ২৫ শতাংশ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে এবং বাকি অংশ নিয়ে আলোচনার জন্য সময়ও দিয়েছে। ফলে এই রায়কে নবান্নের জন্য ‘স্বস্তি’ বলেই দেখছে তৃণমূল।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে জানানো হয়েছে, ২০০৯ সালের অগস্ট থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের যে বকেয়া ডিএ রয়েছে, তার ২৫ শতাংশ এখনই মেটাতে হবে। বাকি ৭৫ শতাংশ কীভাবে এবং কত কিস্তিতে দেওয়া হবে, তা বিবেচনার জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। ওই কমিটিই ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেবে।
তৃণমূলের দাবি, রাজ্য সরকার শুরু থেকেই সময় পাওয়ার কৌশল নিয়েছিল এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সেই লক্ষ্যই পূরণ হয়েছে। শাসকদলের এক প্রথম সারির নেতার মতে, এই সময়ের মধ্যে রাজ্য সরকার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারবে।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবারই বিধানসভায় অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ করেছেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। সেখানে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য ৪ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা বৃদ্ধির ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও এই বৃদ্ধি বকেয়া ডিএ মামলার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। এই ঘোষণার ফলে কেন্দ্র ও রাজ্যের ডিএ-র ব্যবধান দাঁড়াবে ৩৬ শতাংশ।
বুধবার এসআইআর মামলায় সুপ্রিম কোর্টে মমতার সওয়ালকে রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিল তৃণমূল। আর বৃহস্পতিবার ডিএ মামলার রায়কে রাজ্যের ‘পরাজয়’ বলে প্রচার শুরু করেছে বিরোধীরা। যদিও শাসকদলের মতে, এসআইআর মামলায় তৈরি হওয়া রাজনৈতিক অভিঘাতের কাছে ডিএ মামলার প্রভাব খুবই সীমিত। তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের দাবি, এই রায় নির্দিষ্ট একটি অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং সামগ্রিক ভোটের অঙ্কে তার বড় কোনও প্রভাব পড়বে না।






