Uncategorizedসম্পাদকীয়

অল্পায়ু জীবনে অনন্ত প্রভাব! বাংলার রেনেসাঁসের প্রধান স্থপতি হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও

অন্নদাশঙ্কর রায় বলেন, তিনি ছিলেন হিন্দু কলেজের ইয়ং বেঙ্গল নামক ছাত্র গোষ্ঠীর বন্ধু, দার্শনিক ও পথপ্রদর্শক।

সুকান্ত পাল: বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসে হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। জন্মসূত্রে তিনি ছিলেন ইউরেশিয়ান। তাঁর পারিবারিক পরিচয় ছিল মিশ্র জাতিগত। তিনি ছিলেন পর্তুগিজ পিতা ফ্রান্সিস ডিরোজিও ও মাতা সুফিয়া জনসনের পুত্র। ডিরোজিওকে একজন অ্যাংলো- ইন্ডিয়ান হিসেবে বিবেচনা করা হতো এই কারণে, যেহেতু তিনি ছিলেন মিশ্র পর্তুগিজ ভারতীয় এবং ইংরেজ বংশোদ্ভূত। কিন্তু তিনি নিজেকে মনেপ্রাণে একজন ভারতীয় হিসেবে বিবেচনা করতেন। ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে ১৮ এপ্রিল মাসে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু খুবই সল্পায়ু ছিলেন। তাঁর স্বল্প জীবনের মধ্যেই তিনি আমাদের দিয়ে গিয়েছেন অনেক কিছু। বলা যেতে পারে একটি যুগের এক ধ্রুব চিহ্ন তিনি রেখে গিয়েছেন।

বাংলার রেনেসাঁসের ক্ষেত্রে তাঁর ছিল এক অনবদ্য অবদান যে অবদান আজও আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে।

বাংলা রেনেসাঁসের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে তাঁকে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে কোনও ভুল নেই। অন্নদাশঙ্কর রায় বলেন, তিনি ছিলেন হিন্দু কলেজের ইয়ং বেঙ্গল নামক ছাত্র গোষ্ঠীর বন্ধু, দার্শনিক ও পথপ্রদর্শক। ইয়ং বেঙ্গল যদি না থাকতো তবে বাংলা রেনেসাঁস কে জানে কত কাল পিছিয়ে থাকত! আর ডিরোজিও যদি না থাকতেন তা হলে ইয়ং বেঙ্গলের কতটুকু সাধ্য থাকত! তিনি তাদের শিখিয়েছিলেন বিনা বিচারে কিছু মেনে নেবে না। এই যে তাঁর শিক্ষা, এটা শুরু হয়েছিল তাঁর শিক্ষকতা দিয়ে।

তার জীবনকালে তিনি তাঁর মেধা ও প্রতিভার সংমিশ্রণে বাংলার শিক্ষার জগতে যে উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন তা বিস্ময়কর। স্কটল্যান্ডবাসী ড্রামন্ড সাহেবের কলকাতার ধর্মতলা স্কুলে তিনি ভর্তি হন। এখানেই তাঁর শিক্ষক ড্রামন্ডের ছত্রছায়ায় তিনি বেড়ে উঠেছিলেন। ফলে ড্রামন্ডের চিন্তাভাবনা, আদর্শ তাঁকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। তার শিক্ষক ড্রামন্ড ছিলেন হিউমের শিষ্য এবং সব বিষয়ে ঘোর সংশয়বাদী, শানিত যুক্তি ও স্বাধীন চিন্তার একজন সমর্থক। শিক্ষক ড্রামন্ডের ভাবাদর্শের দ্বারা তিনি যে প্রভাবিত হবেন এতে কোন বিস্ময়ের কিছু ছিল না। ডিরোজিও তার শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষিত হয়ে নিজেও একজন ঘোরতর যুক্তিবাদী চিন্তক, পণ্ডিত, লেখক, কবি এবং সর্বোপরি এক মহান শিক্ষক হয়ে ওঠেন।

আমরা যখন বর্তমানে শিক্ষার এক স্থিতিহীন, অন্ধকারময় দিনগুলির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি তখন ডিরোজিও­র ভাবনা ও আদর্শ আমাদের নতুন করে পথ দেখাতে সাহায্য করবে বলে মনে করি। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার যে চালচিত্র আমাদের সামনে উঠে আসছে তা আমাদের প্রতি মুহূর্তে শিহরিত  করছে। আমরা আতঙ্কিত। আমরা ভীত। সন্ত্রস্ত। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে আমরা রীতিমতো রুদ্ধবাক। এই ঘন অন্ধকারে আমাদের সামনে একমাত্র উজ্জ্বল আলো ডিরোজিও। তাই আজ এই মহান শিক্ষক ডিরোজিও চর্চা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন মনীষী বেকনের আদর্শ অনুপ্রাণিত মাত্র আঠেরো বছর বয়সে ১৮২৬ সালে তিনিও হিন্দু কলেজের অধ্যাপক রূপে নিযুক্ত হন সময়কালটা ছিল ঊনিশ শতকের এক আন্দোলিত সময়। ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন রামমোহন রায়। তারই প্রেক্ষাপটে তিনি যখন হিন্দু কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন তখন”… ১৮২৮ সালে কৃষ্ণমোহন ছিলেন প্রথম শ্রেণীর ছাত্র রসিক কৃষ্ণ দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র একজন তরুণ শিক্ষককে ঘিরে তরুণ ছাত্রদের এরকম সমাবেশ সাধারণত ঘটে না কেবল পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষক রূপে নয় নবযুগের আদর্শ শিক্ষক রূপে ডিরোজিও নব্য বঙ্গের তরুণ ছাত্রদের সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন… শিক্ষার পদ্ধতিও ছিল তার অভিনব। প্রত্যেক প্রশ্নের ও বিষয়ের স্বপক্ষে বিপক্ষে সমস্ত বক্তব্যটিকে পেশ করে তিনি ছাত্রদের স্বাধীন চিন্তার সুযোগ দিতেন এবং তার ভেতর থেকে আসল বৈজ্ঞানিক যুক্তির পথে তাদের সন্ধান করে নিতে সাহায্য করতেন। ক্লাসের মধ্যে এক বিচিত্র রোমান্টিক পরিবেশের সৃষ্টি হতো এবং ছাত্রদের কাছে ডিরোজিও যেন তার নায়ক।”

উপরের কথাগুলি বলেন বিনয় ঘোষ তাঁর বাংলার বিদ্বৎ সমাজ গ্রন্থে।

যে কোনও ছাত্রছাত্রী তাদের শিক্ষকদের এই নায়কের ভূমিকাতে দেখতে চান, কিন্তু বর্তমান শিক্ষার পরিবেশ কি আমাদের হতাশ করছে না? প্রশ্নটা সততই জেগে ওঠে এবং আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠি। ডিরোজিও-র উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ও প্রখর পাণ্ডিত্য কলেজের উজ্জ্বল ছাত্রদের ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছিল। ডিরোজিও-র জীবনীকার এডওয়ার্ডস বলেন যে, ডিরোজিও-র মতো ছাত্রদের উপর আর কোন শিক্ষকের এমন প্রভাব ছিল না। ডিরোজিও উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ও মেধা যুক্তি ও স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার দিয়ে ছাত্রদের আকৃষ্ট করেছিলেন। শুধুমাত্র কলেজের মধ্যেই নয় কলেজের বাইরেও তিনি ছাত্রদের মনন, চিন্তা, যুক্তির, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ও উন্নতির জন্য। তিনি ছাত্রদের সঙ্গে বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন, যুক্তিবাদ প্রভৃতি নিয়ে আলোচনা করতেন। এর একটাই উদ্দেশ্য ছিল। তা হল সত্যানুসন্ধান। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে সত্য ছাড়া কখনও শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ হতে পারে না। মিথ্যা ,অলীক চিন্তাভাবনার দ্বারা কখনও শিক্ষা তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না। সবকিছুকেই যুক্তি ও বিচার দিয়ে বিশ্লেষণ করা এবং তারপর তাকে গ্রহণ বর্জনের মধ্য দিয়ে একটি নিজস্ব যুক্তিনিষ্ঠ মত ও পথ ঠিক করাই হচ্ছে একজন প্রকৃত শিক্ষিত মানুষের কাজ। একজন প্রকৃত শিক্ষক কখনওই অহঙ্কারী হতে পারেন না। হওয়া উচিত নয় যদি তাই হয় তা হলে তা হবে শিক্ষার মর্মমূলে গভীর আঘাত। এবং শিক্ষার অপঘাত মৃত্যুর শামিল।

কোনও শিক্ষক যদিও-বা কখনও নিজের অজান্তে কোনও ভুল কথা, ভুল তথ্য বা ব্যবহার করে থাকেন তবে তাকে অকপটে স্বীকার করে নেওয়া কর্তব্য। ডিরোজিও-র মধ্যে এই গুণটি ছিল যা আজকালকার দিনে স্বপ্নের মতো মনে হয়। তাই তিনি Acknowledgement of Errors এ বলেন যে অভিভাবক বা শিক্ষকরা অনেক সময় তার সন্তান বা ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি এমন ভাব করেন যেন তারা যেটা করেছেন বা বলেছেন তার মধ্যে কোন ভুল নেই। তাদের কোনও ভুল হয় না, তারা সব সময় সঠিক— এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। তাইতো তিনি লেখেন “I, this day (19th Oct. 1829), most rashy, told, one of my students that I disbelieved him— a circumstance which has given me much sorrow. It appeared afterwards that I was mistaken: and I confessed my indiscretion before the whole class.”

এমন মহৎ স্বীকারোক্তি তাঁর মতো মহান ব্যক্তিই করতে পারেন। এই কারণেই তিনি ভারতবর্ষের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহান শিক্ষক।