শোকস্তব্ধ টলিপাড়া! প্রয়াত ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ খ্যাত পরিচালক অনীক দত্ত
বুধবার দুপুরের দিকে নিজের বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে গুরুতরভাবে জখম হন তিনি।
Truth of Bengal: টলিপাড়ায় বড় বিপর্যয়! আকস্মিক দুর্ঘটনায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বাংলার অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক অনীক দত্ত। বুধবার দুপুরের দিকে নিজের বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে গুরুতরভাবে জখম হন তিনি। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে তড়িঘড়ি কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি। ২০১২ সালে সম্পূর্ণ নতুন ঘরানার রাজনৈতিক বিদ্রুপাত্মক সিনেমা ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ পরিচালনার মধ্য দিয়ে রূপোলী পর্দায় তাঁর পরিচালক জীবনের এক ধামাকাদার সূচনা হয়েছিল। এর পর বিখ্যাত সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে তিনি নির্মাণ করেন ‘আশ্চর্য প্রদীপ’। তাঁর পরিচালিত তৃতীয় সাড়াজাগানো ছবি ছিল ‘মেঘনাদবধ রহস্য’। ক্ষুরধার সংলাপ আর অনন্য নির্মাণশৈলীর জন্য সমাদৃত এই পরিচালকের আকস্মিক প্রয়াণে স্তব্ধ টলিউডের বিনোদন দুনিয়া।
কীভাবে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটল, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। পরিচালকের পরিবার বা পুলিশের তরফে এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে বিস্তারিতভাবে কিছু জানানো হয়নি। ঠিক কী পরিস্থিতিতে এবং কীভাবে তিনি ছাদ থেকে পড়ে গেলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। অনীক দত্তের এই আকস্মিক মৃত্যুকে ঘিরে ইতিমধ্যেই নানা জল্পনা শুরু হয়েছে। তবে পুলিশ ও তদন্তকারীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিক তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও সম্ভাবনাকেই নিশ্চিতভাবে মেনে নেওয়া যাবে না।
বিজ্ঞাপনের জগৎ থেকে চলচ্চিত্র পরিচালনায় আসা অনীক দত্ত বাংলা সিনেমায় ব্যতিক্রমী চিন্তাভাবনা এবং তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনার জন্য এক আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিলেন। ২০১২ সালে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছবির মাধ্যমে পরিচালনায় তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং মুক্তির পরই ছবিটি দর্শকমহলে বিপুল সাড়া ফেলে। ভৌতিক আবহের আড়ালে সমাজ ও রাজনীতিকে ব্যঙ্গ করার অভিনব ভাষা তাঁকে বাংলা ছবির অন্যতম স্বতন্ত্র নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়। এর পর একে একে তিনি পরিচালনা করেন ‘আশ্চর্য প্রদীপ’, ‘মেঘনাদবধ রহস্য’, ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ এবং ‘অপরাজিত’-র মতো একাধিক আলোচিত ছবি। বিশেষ করে সত্যজিৎ রায়কে শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি তাঁর ‘অপরাজিত’ ছবিটি দর্শক ও সমালোচক মহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। তাঁর প্রতিটি ছবিতেই বারবার উঠে এসেছে মধ্যবিত্ত বাঙালির মনন, সামাজিক টানাপোড়েন এবং সূক্ষ্ম রসবোধ।
ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারের সদস্য ছিলেন। অনীক দত্ত ছিলেন ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা নরেন্দ্রচন্দ্র দত্তের পৌত্র। চলচ্চিত্র পরিচালনায় আসার আগে দীর্ঘদিন বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর সিনেমার ভাষাকেও সমৃদ্ধ করেছিল বলে মনে করেন চলচ্চিত্র জগতের একাংশ। নিজের কেরিয়ারে মোট আটটি ছবি পরিচালনা করেছিলেন অনীক দত্ত। তাঁর শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ছিল ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’, যা ২০২৫ সালে প্রেক্ষাগৃহে এসেছিল। কাজের প্রতি নিখাদ নিষ্ঠা এবং নিজস্ব ঘরানার জন্য ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বরাবরই আলাদা মর্যাদা পেয়েছিলেন তিনি।
পরিচালকের এই আকস্মিক মৃত্যুসংবাদ সামনে আসতেই গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন টলিউডের বহু প্রথম সারির অভিনেতা, পরিচালক ও টেকনিশিয়ানরা। সোশ্যাল মিডিয়ায় সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে বিশিষ্টজনেরা লিখেছেন, অনীক দত্তের প্রয়াণে বাংলা সিনেমা হারাল এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বুদ্ধিদীপ্ত নির্মাতাকে। তবে এই মৃত্যুর নেপথ্যের আসল রহস্য ঠিক কী, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরাই রয়ে গিয়েছে।






