রাজ্যের খবর

‘হাট অবৈধ নয়’, বৈধ নথি নিয়ে পরিবেশ আদালতে হস্তশিল্পীরা

আবেদনকারীদের দাবি, সোনাঝুরির হস্তশিল্পীদের হাটকে কোনওভাবেই পুরোপুরি অবৈধ বলা যায় না

Truth of Bengal: শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্যবাহী সোনাঝুরি হাটের ভবিষ্যৎ ঘিরে আইনি লড়াইয়ে নতুন মোড়। একদিকে বনাঞ্চল ও পরিবেশ রক্ষার দাবি, অন্যদিকে কয়েক হাজার হস্তশিল্পী, কারিগর এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবিকা—এই দুইয়ের টানাপোড়েন এবার পৌঁছেছে জাতীয় পরিবেশ আদালতে। হাটের সঙ্গে যুক্ত একাধিক হস্তশিল্পী ও ব্যবসায়ী এনজিটির হস্তক্ষেপ চেয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। আবেদনকারীদের দাবি, সোনাঝুরির হস্তশিল্পীদের হাটকে কোনওভাবেই পুরোপুরি অবৈধ বলা যায় না। দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় বস্ত্র মন্ত্রকের পরিচয়পত্র, রাজ্যের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং হস্তশিল্প দপ্তরের শংসাপত্র-সহ প্রয়োজনীয় নথি নিয়েই তাঁরা সেখানে ব্যবসা করছেন। হাট বন্ধ হয়ে গেলে বহু শিল্পী, কারিগর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর আয়ের একমাত্র পথ বন্ধ হয়ে যাবে বলেও আশঙ্কা তাঁদের। রাসিদুল মোল্লা, মহম্মদ আবদুল ফজল ও সমাপ্তি দেবনাথ-সহ আবেদনকারীদের বক্তব্য, সোনাঝুরি হাটকে কেন্দ্র করেই হাজার হাজার পরিবারের রুটিরুজি চলে। তাই পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি জীবিকার অধিকারটিও যাতে আদালত বিবেচনা করে, সেই আবেদন জানিয়েছেন তাঁরা।

অন্যদিকে, পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্তের দায়ের করা মামলাতেই সোনাঝুরি বনাঞ্চলের দখলদারি, হাটের বিস্তার এবং বাণিজ্যিক কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় পরিবেশ আদালতের পূর্বাঞ্চলীয় বেঞ্চে মামলাটি ওএ নম্বর ৭৯/২০২৫ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। আদালতে জমা দেওয়া নথিতে হাটটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কোন কর্তৃপক্ষের অনুমতিতে চলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। পাশাপাশি বনভূমিতে হোটেল-রিসর্টের সম্ভাব্য দখলদারি খতিয়ে দেখতে বিস্তারিত যৌথ সমীক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। এগুলি মামলাকারীর অভিযোগ এবং বিষয়টি এখনও বিচারাধীন। সুভাষ দত্তের অভিযোগ, জঙ্গলের মধ্যে বিপুল সংখ্যক দোকান বসানো, চারচাকা গাড়ির অবাধ যাতায়াত, প্লাস্টিকের ব্যবহার, অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলা, গাছের ক্ষতি এবং কংক্রিটের নির্মাণ সোনাঝুরির পরিবেশের উপর গুরুতর চাপ তৈরি করেছে। বন দপ্তরের নথি অনুযায়ী, বনভূমি দখলের অভিযোগ যাচাই করতে ২০২৫ সালের অক্টোবরে একাধিক হোটেল ও রিসর্টে যৌথ সমীক্ষার নোটিসও দেওয়া হয়েছিল।

পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যে ২০২৬ সালের মে মাসে হাট সংলগ্ন জঙ্গলে চারচাকা গাড়ির প্রবেশ ঠেকাতে কয়েকটি রাস্তা বন্ধ করে বন দপ্তর। একই সঙ্গে হোটেল ও রিসর্টের বেআইনি বিজ্ঞাপনী বোর্ড সরিয়ে দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে প্রকাশ। স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০০০ সালের কাছাকাছি সময়ে কয়েকজন আদিবাসী শিল্পী শনিবার খোয়াই এলাকায় নিজেদের তৈরি সামগ্রী নিয়ে বসতে শুরু করেন। সমাজকর্মী শ্যামলী খাস্তগীরের উদ্যোগে শুরু হওয়া ছোট্ট হাটটি ধীরে ধীরে শান্তিনিকেতনের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে হাটের দিন এবং ব্যবসায়ীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বহিরাগত ব্যবসায়ী, পর্যটক ও যানবাহনের চাপও বৃদ্ধি পায়। ২০২৪ সালেও হাট সপ্তাহে আরও বেশি দিন চালু রাখার সিদ্ধান্তের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ফলে এখন প্রশ্ন শুধু হাট বন্ধ হবে কি না, তা নয়। পরিবেশের ক্ষতি না করে হাটকে নিয়ন্ত্রিত পরিসরে রাখা, প্রকৃত হস্তশিল্পীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা তৈরি কিংবা বিকল্প জায়গায় পুনর্বাসন—সমাধান কোন পথে মিলবে, সেটাই মূল আলোচ্য। সোনাঝুরির সবুজ এবং হস্তশিল্পীদের জীবিকা—দু’টিই বাঁচিয়ে আদালত কী ভারসাম্যপূর্ণ পথ দেখায়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে শান্তিনিকেতন।

Related Articles