সম্পাদকীয়

Tagore Legacy: ভরা থাক স্মৃতি সুধায়

রবীন্দ্রনাথের স্বরূপ উপলব্ধি করবার জন্য যাঁরা প্রয়াস করেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের কাছে একটি লক্ষণ সুস্পষ্ট যে রবীন্দ্র প্রতিভার বৈচিত্র্য-মুখিতা।

রাজু পারাল: কারও কাছে তিনি পরম আশ্রয়, তো কারও কাছে তিনি অনুপ্রেরণা। আবার কারও তিনি জীবনের বোধ তো কারও কাছে তিনি মৃত্যুর চেতনা (Tagore Legacy)। জানতে, অজান্তে সকলেই তাঁকে অনুসরণ করে চলেছেন। তিনি আমাদের বিশ্বকবি। জাতীয় জীবনের এক মহান সম্পদ। বঙ্গসংস্কৃতির প্রাণপুরুষ আজও নি:সন্দেহে তিনিই। তাঁর সাহিত্য, তাঁর গান আমাদের জীবনের অঙ্গ। তিনি নেই। কিন্তু আজও তাঁর প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি আমাদের জীবনে। কারণ জীবনের প্রতিটি স্তরেই তিনি বিদ্যমন। যাঁরা শিল্প বা সংস্কৃতি জগতের মানুষ তাঁদের বড় অনুপ্রেরণা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রেমে – অপ্রেমে, সুখে – দু:খে, হর্ষ – বিষাদে, মিলন – বিচ্ছেদে, ব্যর্থতায়…সর্বক্ষেত্রে এবং আমাদের জীবনের সব অনুভূতিতেই কোথাও না কোথাও রবিঠাকুর বিরাজমান। যিনি শিক্ষা ও প্রকৃতি চেতনাকে মিশিয়ে দিয়েছিলেন পড়ুয়াদের জীবনে। বিশ্বমানবতার পাঠ দিয়েছেন সহজ কথায়।

রবীন্দ্রনাথের বিপুল সৃষ্টি কেবল বাঙালির কাছে নয়, সমগ্র ভারতবাসীর কাছে আজও গৌরবের বস্তু। রবীন্দ্রনাথের স্বরূপ উপলব্ধি করবার জন্য যাঁরা প্রয়াস করেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের কাছে একটি লক্ষণ সুস্পষ্ট যে রবীন্দ্র প্রতিভার বৈচিত্র্য-মুখিতা। তাঁর এই বৈচিত্র্যমুখিতার জন্য তাঁর প্রতিভা জীবনে বিভিন্ন রূপে বিকশিত হয়েছে। কখনও তিনি সঙ্গীতসাধক, কখনও তিনি দেশনায়ক, কখনও তিনি রেখা ও রঙের অদ্ভুত বিলাসী চিত্রকর, কখনও তিনি উদাসীন বাউল, কখনও তিনি মরমী দার্শনিক, কখনও তিনি জনসেবক আবার কখনও তিনি হাস্যরসিক। কোন একটি বিশেষনে তাঁর প্রতিভার সামগ্রিক পরিচয় পাওয়া যায় না। এই মহাপুরুষের হৃদয় গহনের রহস্য উদঘাটন করা ভাগীরথীর উৎস সন্ধানের মতই দূরুহ। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে চর্চা একদিনের, এক বছরের বা এক দশকের নয়। তাঁকে নিয়ে ভাবতে গেলে, চর্চা করতে গেলে লেগে যায় একটা গোটা জীবন (Tagore Legacy)।

‘তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ –‘ একথা রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমরা বলতে পারি নি:সন্দেহে। শুধু কবি হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে দেখলে তাঁর মহত্ব ঠিক বোঝা যায় না। রবীন্দ্রনাথ আরও অনেক কিছু। সাহিত্যক্ষেত্রে তিনি ঔপন্যাসিক, গল্পলেখক, নাট্যকার, নিবন্ধকার, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে তিনি সংস্কারক, প্রচারক, শিক্ষাব্রতী, রাষ্ট্রবিদ, জন নায়ক, আবার তিনিই গায়ক, সঙ্গীতজ্ঞ, সুরস্রষ্টা, নৃত্যশিল্পবিদ, অভিনেতা এবং চিত্রকর। একজন সুবক্তা, দার্শনিক, জ্ঞানী ও পন্ডিত মানুষ হিসাবেও কবিগুরু জগৎ বিখ্যাত।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের জীবন কেটেছে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে। জীবনের প্রারম্ভে তিনি মা
সারদাসুন্দরী দেবীকে হারিয়েছিলেন। মায়ের আদর তাঁর কাছে ছিল অধরা। সে আক্ষেপ ছিল তাঁর সারাজীবন। এক প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন সেই আক্ষেপের কথা, ‘মাকে আমরা পাইনি কখনো, তিনি থাকতেন তাঁর ঘরে তক্তাপোশে বসে, খুড়ির সঙ্গে বসে তাস খেলতেন। আমরা যদি দৈবাৎ গিয়ে পড়তুম সেখানে, চাকররা তাড়াতাড়ি আমাদের সরিয়ে আনতেন, যেন আমরা একটা উৎপাত। মা যে কী জিনিস তা জানলুম কই আর। তাইতো তিনি আমার সাহিত্যে স্থান পেলেন না।’ মাকে নিবিড়ভাবে কাছে না – পাওয়ার বেদনা কবির মনে আজীবন বেজেছিল। তবে পেয়েছিলেন নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবীর পরম স্নেহ, প্রশ্রয়। তিনি ছিলেন বন্ধুর মতো। শিল্প – সাহিত্যের প্রেরণা (Tagore Legacy)।

তাঁর স্মৃতি আজীবন বয়ে বেরিয়েছেন কবি। শাশুড়ি সারদাসুন্দরী দেবীর মৃত্যুর পর কাদম্বিনী রবির দেখভালের দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন নিজের হাতে। তিনি হয়ে উঠেছিলেন রবির মায়ের মতো। আবার অন্যদিকে তিনি রবির একান্ত সঙ্গী। কাদম্বরী দেবী জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের (স্বামী) উৎসাহেই শিক্ষা লাভ করেন। একটা সময় হয়ে ওঠেন ঠাকুরবাড়ির শিল্প-সাহিত্যের মধ্যমণি। রবির সাহিত্যের প্রেরণা। সাহিত্যের প্রতি কাদম্বরী দেবীর ছিল গভীর অনুরাগ। সেই সময়ের বাংলা সাহিত্য নিয়ে তিনি আলোচনা করতেন। সঙ্গী থাকতেন রবি। রবিও নতুন বৌঠানকে পড়ে শোনাতেন বাংলা সাহিত্যের অনেক উপন্যাস। কখনও কখনও রবি শোনাতেন নিজের লেখা কবিতাও। শুনতে শুনতে দুপুরবেলায় হাতপাখা দিয়ে হাওয়া করতেন কাদম্বরী। নি:সন্তান এই নারী স্বামী জ্যোতিরিন্দ্রনাথের উৎসাহে জড়িয়ে পড়েন ‘ভারতী’ পত্রিকার সঙ্গে। নিজেগুনে ঠাকুরবাড়ির পরিবারিক সাহিত্যে সভার কেন্দ্রেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

১৮৮৪ সালের ফ্রেবুয়ারী মাসে রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘ ছবি ও গান’ প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ বইটি উৎসর্গ করেছিলেন নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবীকেই। রবি ও কাদম্বরীর সম্পর্ক নিয়ে কৌতুহলের শেষ ছিল না অনেকেরই। বাতাসে ভেসে বেড়াতো মুখরোচক অনেক গল্প। যদিও তাঁরা সে সব কর্ণপাত করতেন না। একদিন চিরবিদায় নিলেন কাদম্বরী দেবী। জীবনে ছিল অনেক অপ্রাপ্তি। সহ্য করেছেন অপমান। শিকার হয়েছেন স্বামীর উদাসীনতার। তাই হয়তো স্বেচ্ছানির্বাসন নিয়েছিলেন রবিকে শূন্য করে দিয়ে। নতুন বৌঠানকে কোনও দিন ভুলতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ। তাই রবির লেখা অজস্র কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে ফুঁটে ওঠে নতুন বৌঠান কাদম্বরীর কথা —–

“তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা,
এ সমুদ্রে আর কভু হব নাকো পথহারা।
‘ আমার প্রাণের ‘ পরে চলে গেল কে
বসন্তের বাতাস টুকুর মতো।
সে যে ছুঁয়ে গেল, নুয়ে গেল রে —
ফুল ফুটিয়ে গেল শত শত।
……… যেতে যেতে পথে পূর্ণিমা -রাতে
চাঁদ উঠেছিল গগনে।
দেখা হয়েছিল তোমাতে আমাতে কী
জানি কী মহা লগনে।
……..মনে রয়ে গেল মনের কথা—–
শুধু চোখের জল, প্রাণের ব্যথা। “

রবীন্দ্রনাথের জীবনের আর এক পর্বে সহ- ধর্মিনী রূপে উদয় হন মৃণালিনী দেবী। সাংসারিক জীবনে তিনি ছিলেন দারুণ ‌ব্যস্ত। তার মাঝেই করতেন সাহিত্যচর্চা, অনুবাদ। মৃণালিনীর চিঠি লেখার হাতও ছিল চমৎকার। রবীন্দ্রনাথ যখন দূরে কোথাও যেতেন, চিঠির মাধ্যমে দু’জনের ভাবের আদান – প্রদান হত। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন দূর আকাশের তারা। মনে মনে তা বুঝতেন মৃণালিনী। তাই স্বনামধন্য স্বামীকে কখনও বেঁধে রাখার চেষ্টা করেননি তিনি। তবে পরস্পরের প্রতি ছিল গভীর ভালোবাসা। ছিল নির্ভরতা। নানাভাবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন স্বামীর যোগ্য সহধর্মিণী। তবে তিনি দীর্ঘসময় পৃথিবীর আলো দেখেননি। ১৯০২ সালে রবীন্দ্রনাথকে একা করে দিয়ে চলে যান তিনি না ফেরার দেশে।স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা যে কতটা গভীর ছিল তা রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেন মৃণালিনীর মৃত্যুর পর (Tagore Legacy)।

ব্যাক্তিজীবনের ক্ষয়ক্ষতি, শোকতাপ, প্রিয়জন-বিচ্ছেদের প্রাথমিক আঘাতে তিনি ধীরে ধীরে বিচলিত হয়ে পড়েন। মা, বাবা, কাদম্বরী দেবী, স্ত্রী মৃণালিনী, দাদা, দিদি, ভাই, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুপরিজন, সর্বোপরি সন্তানদের মৃত্যুতে তিনি কী পরিমান মুহ্যমান হয়ে পড়েন, তাঁর অগণিত লেখাই তার সাক্ষী। সমস্ত জীবনব্যাপী দুঃখের দহনে কবিগুরুর হৃদয় হয়ে উঠেছিল উজ্জ্বল হীরে । যা অন্য সব কিছুকে কাটলেও, তাঁকে কেউ কাটতে পারত না। জীবনকে তিনি দেখেছিলেন মৃত্যুর জানালা দিয়ে। তিনি বলেছিলেন, ” জীবনকে মৃত্যুর জানালার ভিতর দিয়ে না দেখলে তাকে সত্য রূপে দেখা যায় না।” সেই সত্য রূপকেই তিনি চিত্তলোকের স্বচ্ছ আলোয় দেখেছিলেন। তাই তিনি হয়েছিলেন মৃত্যুঞ্জয়।

২২ শ্রাবণ , ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ। এক নীরব অনুভবের দিন। পৃথিবীর কর্মশালা থেকে ছুটি পেয়ে বিদায় নিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ। বিশ্বকবি বেঁচে থাকবেন তাঁর অগণিত কবিতা, ছড়া, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধের মধ্যে দিয়ে। আজ থেকে বহু বছর পরেও তিনি প্রাসঙ্গিক থাকবেন , কারণ তিনি কালজয়ী।

“শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে,
তোমার সুরটি আমার মুখের’ পরে, বুকের’ পরে।
পুরবের আলোর সাথে পড়ুক প্রাতে দুই নয়নে —–
নিশীথের অন্ধকারে গভীর ধারে পড়ুক প্রাণে।
নিশিদিন এই জীবনের সুখের ‘পরে দুখের পরে’
শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে।”

Related Articles