সম্পাদকীয়

বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সিপিএম যে আন্তরিক, প্রমাণ করতে হবে তাদেরই

ভরা সভায় অশোকবাবুর মুখে এমন একটি কথা শোনার জন্য সেলিম খুব প্রস্তুত ছিলেন বলে মনে হয় না।

রন্তিদেব সেনগুপ্ত: কিছুদিন আগে শিলিগুড়িতে একটি দলীয় সভায় সিপিএম নেতা অশোক ভট্টাচার্য তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, গত দু’বারের মতো এবার আপনারা ভোট বিজেপির দিকে দেবেন না। এবার ভোটটা সিপিএমকেই দিন। অশোকবাবু দলীয় কর্মীদের এই কথাটি যখন বলছেন, তখন মঞ্চে তাঁর পাশেই উপস্থিত ছিলেন দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। ভরা সভায় অশোকবাবুর মুখে এমন একটি কথা শোনার জন্য সেলিম খুব প্রস্তুত ছিলেন বলে মনে হয় না। যাঁরা ওই সভায় ছিলেন তাঁরা বলছেন, দৃশ্যত তখন অপ্রস্তুত দেখাচ্ছিল সিপিএম রাজ্য সম্পাদককে। যে সত্যটি সিপিএম নেতা-কর্মীরা সযত্নে এড়িয়ে যেতে চান, বলা ভাল গোপন রাখতে চান, হাটের মাঝে হাঁড়ি ভাঙার মতো সেই সত্যটি অশোকবাবু প্রকাশ করে দিয়েছেন। তাতে দলের রাজ্য সম্পাদকের অস্বস্তিতে পড়ারই কথা। তবু ভাল, অশোকবাবু আর একটু এগিয়ে হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সেলিমের গোপন বৈঠকটি নিয়ে কিছু বলে বসেননি।

সিপিএম নেতারা যতই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করুন না কেন, এই সত্যটি এখন সর্বজনবিদিত যে, ২০১৯, ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন এবং ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে সিপিএম তাদের ভোট ট্রান্সফার করেছিল। সেই ভোট ট্রান্সফার করেছিল অন্য কাউকে নয়, বিজেপিকে। এই ভোট ট্রান্সফার দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে হয়েছিল, নাকি জেলা নেতৃত্বের উদ্যোগেই স্থানীয় স্তরে এই ভোট ট্রান্সফারের খেলা হয়েছিল তা পরিষ্কার নয়। তবে এটা পরিষ্কার, কোনও একটা স্তর থেকে নির্দেশ না এলে সর্বত্র এভাবে ভোট ট্রান্সফার সম্ভব হতো না।

তাঁদের ভোট যে তাঁরা ঢেলে উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপিকে দিয়ে এসেছেন গত তিনটি নির্বাচনে এটি সিপিএম নেতারা জানতেন না এমন নয়। তাঁরা যে জানতেন সেটা অশোকবাবুর কথাতেই পরিষ্কার। অশোকবাবু যেটা জানেন, সেটা দলের অন্য নেতারাও জানেন। জেনেও তাঁরা যে এই ভোট ট্রান্সফার রুখতে উদ্যোগী হননি সেটিও এবার পরিষ্কার। এই ভোট ট্রান্সফারের খেলায় সিপিএমের রাজনৈতিক লাভ কী হল? সেটা বোঝার আগে বুঝতে হবে সিপিএম কেন এই ভোট ট্রান্সফারের রাজনীতি করেছে? এর পিছনে কোন রাজনৈতিক অঙ্ক কাজ করেছে তাদের?

সিপিএম অতি সরল একটি অঙ্ক করার চেষ্টা করেছিল। সিপিএমের হিসাবটা ছিল এই যে, নিজেদের ভোট বিজেপির দিকে ট্রান্সফার করে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিজেপিকে শক্তিশালী করা। সিপিএম আশা করেছিল, এই ভোট ট্রান্সফারের রাজনীতির অস্ত্রেই বিজেপির মাধ্যমে তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে পারবে তারা। তারপরে বিজেপির সঙ্গে মোকাবিলা করবে। সিপিএমের ভোট ট্রান্সফারের অঙ্ক বিশেষ কাজে দেয়নি। পরপর তিনটে নির্বাচনে এভাবে ভোট ট্রান্সফার করিয়ে তারা বিজেপির ভোট শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে এটা ঠিক। কিন্তু তৃণমূলের ক্ষমতা থেকে অপসারণের বিন্দুমাত্র সম্ভাবনাও সৃষ্টি করতে পারেনি। উপরন্তু তাদের নিজেদের ভোট শতাংশ হু হু করে নেমে গিয়েছে।

তা হলে এই রাজনীতিতে কী লাভ হয়েছে সিপিএমের? কিছুই লাভ হয়নি। বরং এক মারাত্মক আত্মঘাতী খেলা সিপিএম খেলে চলেছে। আর এই আত্মঘাতী খেলাটি খেলতে গিয়ে দলের যে কী সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে, তা অশোকবাবুর মতো কতিপয় নেতা বুঝছেন। খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে অশোকবাবুর মতো নেতা তাই আর্তনাদ করে এবার ভোটটা দলকেই দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন দলীয় নেতা-কর্মীদের। কারণ, অশোকবাবু বুঝতে পারছেন, এরপরও যদি তাঁর দলের কর্মীরা নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করার নীতিতে অটল থেকে আবার বিজেপিকেই ভোট ট্রান্সফারের পণ করেন, তা হলে অচিরেই এই রাজ্য থেকে সিপিএম দলটি বিলীন হয়ে যাবে।

সিপিএম নেতারা স্বীকার করুন কি না করুন, এটা দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার যে, ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে এই রাজ্যের বিরোধী রাজনীতির পরিসরে বিজেপির তড়িৎ গতিতে উত্থান এবং রমরমার পিছনে অনেকখানি পরোক্ষ অবদান রয়েছে তাঁদেরই। ২০১১-র বিধানসভা ভোটে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত হওয়ার পর সিপিএম কার্যত বিরোধী রাজনীতির পরিসর থেকে পলায়ন করে। আসলে ওই পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসকে মোকাবিলা করার মানসিক সাহসটুকুও সিপিএম নেতা-কর্মীরা হারিয়ে ফেলেছিলেন। সাড়ে তিন দশক ক্ষমতায় থেকে এবং ক্ষমতার দুগ্ধ-মধু সেবন করে সিপিএম নেতা-কর্মীদের বিরোধী হিসেবে শাসকের মোকাবিলা করার মনোবলই আর ছিল না। তাদের সংগঠনটাও উপচে পড়েছিল বেনোজলে। তবু, ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনে কিছুটা লড়াই করার চেষ্টা করেছিল সিপিএম। কিন্তু ২০১৬-র ভোটের ফলাফল ২০১১-র থেকেও শোচনীয় হওয়ায় সিপিএম নেতা-কর্মীদের আর তৃণমূলকে মোকাবিলা করার মতো মনোবল অবশিষ্ট ছিলই না।

‘৬৭ এবং ‘৬৯ সালে পরপর দুটি যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা পতনের পর, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের কংগ্রেসি জমানা, জরুরি অবস্থা— এইসব কঠিন সময়ের পরেও কিন্তু বিরোধী রাজনীতির পরিসর ছেড়ে সিপিএম পলায়ন করেনি। ওই সময়কালে অজস্র নির্যাতন সহ্য করেও সিপিএম নেতা-কর্মীরা দলীয় সংগঠনকে অটুট রাখার কাজ করে গিয়েছেন। যার ফলশ্রুতিতে ‘৭৭ -এর নির্বাচনে কংগ্রেসকে পরাজিত করে একক শক্তিতে বামফ্রন্টের ওই বিপুল জয়। ২০১১-তে তৃণমূলের কাছে পরাজিত হয়ে পলায়নপর সিপিএমের সঙ্গে সাতের দশকের ওই সিপিএমকে যেন মেলানোই যায় না।

রাজনীতিতে যে কখনও শূন্যস্থান থাকে না, এটি সিপিএম নেতারা বুঝতেই পারেননি। বিরোধী রাজনীতির পরিসর থেকে তাঁরা যদি পলায়ন করেন, তা হলে সেটিও যে ক্রমে অন্য কারও দখলে চলে যাবে এ ভাবনাটাও তাঁদের মাথায় আসেনি। উপরন্তু ২০১৬-র নির্বাচনে শূন্যে নেমে আসার পর তাঁরা যে ভোট ট্রান্সফারের রাজনীতিটি খেললেন সেটি একেবারেই তাঁদের জন্যই রাজনৈতিক হারাকিরি হয়ে গেল। সিপিএমের ভোট ট্রান্সফারে বিজেপি শক্তিশালী হল। আর সিপিএমের কী হল? বিরোধী রাজনৈতিক পরিসর থেকে তারা সম্পূর্ণ হটে গিয়ে গুরুত্বহীন রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হল। এই রাজ্যে এখন তৃণমূলের প্রধান বিরোধী বিজেপি। আর সিপিএম? এবারের ভোটেও সে শূন্য থেকে একে উঠতে পারবে কিনা— সেটাই এখন সংশয়ের।

গত কয়েক বছরে এই রাজ্যের রাজনীতির দিকে যদি তাকিয়ে দেখেন, তা হলে দেখবেন, বিজেপির যত দ্রুত উত্থান হয়েছে, যত দ্রুত বিজেপি তাদের বিভাজনের রাজনীতি ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে, ততই সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সিপিএমের আন্তরিকতার অভাব চোখে পড়েছে। বরং সিপিএম নেতৃত্বের অনেক কার্যকলাপ এবং বক্তব্য পক্ষান্তরে বিজেপিকেই যেন উৎসাহ জুগিয়েছে। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গুরুত্বই যেন তারা বুঝতে পারেনি। এই রাজ্যে গত ক’বছরে বিজেপি-আরএসএস বিরোধী কোনও আন্দোলনে সেভাবে সক্রিয়ই হতে দেখা যায়নি সিপিএমকে। মাঝে মাঝে ধন্দ হয়, সাম্প্রদায়িকতা মৌলবাদ এই শব্দগুলি বঙ্গ সিপিএম জানে তো? মৌলবাদের বিস্তার কী বিপদ ডেকে আনতে পারে সে সম্পর্কে তারা সচেতন তো? নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ভোট ট্রান্সফারের রাজনীতি করে এই রাজ্যে একটি সাম্প্রদায়িক শক্তির পায়ের নিচের জমি যে তারাই শক্ত করে দিয়ে যাচ্ছে— এই বোধটাই সম্ভবত সিপিএমের হয়নি।

ভোট ট্রান্সফার করে আগে তৃণমূলকে সরাবো, পরে বিজেপিকে বুঝে নেব— সিপিএমের এই ভাবনার গোড়াতেই গলদ রয়েছে। বিজেপি যদি কখনও ক্ষমতায় আসীন হয় তা হলে যে সংখ্যালঘুদের পাশাপাশি তাদের লক্ষ্যবস্তু হবে কমিউনিস্টরা এবং কমিউনিস্টদের উপর ভয়াবহ আঘাত নামিয়ে আনবে তারা— এই সত্যটি সিপিএম নেতারা বোধকরি বিস্মৃত হয়েছেন। আরএসএসের দ্বিতীয় সরসংঘচালক এমএস গোলওয়ালকরের লেখা স্মরণ করতে অনুরোধ করি সিপিএম নেতৃত্বকে। গোলওয়ালকর লিখেছেন, ‘আমাদের প্রধান শত্রু তিনজন। মুসলমান, খ্রিস্টান এবং কমিউনিস্ট।’ এই চিন্তাধারা যাদের, পরপর তিনটি নির্বাচনে তাদেরই ভোট ট্রান্সফার করে বসে রইল সিপিএম? পরোক্ষে তাদেরই শক্তিশালী করল?

অবশ্য অতীতেও দেখেছি, সাম্প্রদায়িকতার বিপদটিকে সিপিএম নেতারা যেন সময়ে বুঝতেই চান না। এর আগে নয়ের দশকে যখন সইফুদ্দিন চৌধুরী, সমীর পুততুণ্ডর মতো নেতারা সাম্প্রদায়িকতার ক্রমবর্দ্ধমান বিপদ সম্পর্কে দলকে সতর্ক করেছিলেন, যাবতীয় ছুঁৎমার্গ ভুলে কংগ্রেসের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলেছিলেন, তখন প্রকাশ কারাট-সীতারাম ইয়েচুরির মতো সিপিএমের শীর্ষ নেতারা তাতে কর্ণপাত করেননি। এখন, যখন বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদ গ্রাস করেছে ভারত ভূখণ্ডের এক বড় অংশকে, তখন সিপিএম নেতৃত্বের চৈতন্যোদয় হয়েছে। এখন তাঁদের কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধতে অসুবিধা নেই। কিন্তু ইতিমধ্যে দেরি অনেক হয়ে গিয়েছে। তাদের ঘরেও চুরি করতে শুরু করেছে হিন্দুত্ববাদীরা। একদা সিপিএমের ডাকসাইটে নেতারা অনেকেই গত ক’বছরে বিজেপিতে নাম লিখিয়েছেন। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’-এর বদলে ‘জয় শ্রীরাম’ বলা রপ্ত করেছেন।

অশোক ভট্টাচার্য সিপিএমের পোড় খাওয়া নেতা। দলের বিপদটা কোন দিক দিয়ে ঘনিয়ে আসছে তিনি বুঝতে পেরেছেন। বুঝতে পেরে সতর্ক করেছেন দলের নেতা-কর্মীদের। অশোকবাবু বুঝতে পারছেন, এবারের ভোটেও যদি বিজেপিকে ভোট ট্রান্সফারের খেলায় মত্ত থাকেন সিপিএম নেতা-কর্মীরা তা হলে দলের অস্তিত্বই আরও বিপন্ন হয়ে পড়বে। ক্রমে আর একটি বাংলা কংগ্রেসে পরিণত হবে সিপিএম। অশোকবাবু এ-ও বুঝেছেন, ভবিষ্যতে তৃণমূলের মোকাবিলা যদি করতেই হয়, তা হলে বিজেপিকে শক্তিশালী করে নয়, বিরোধী রাজনীতিতে নিজেদের পায়ের নিচের জমি আবার শক্ত করে তুলেই তা করতে হবে। আর তা করতে গেলে বিজেপিকে ভোট ট্রান্সফারের রাজনীতি করলে চলবে না।

প্রশ্ন হল, অশোকবাবুর মতো পোড় খাওয়া নেতা তো বুঝেছেন। কিন্তু সিপিএমের নেতা-কর্মীরা তা বুঝছেন তো? এবারের ভোটেও যদি তাঁরা আরও একবার বিজেপিকেই তাঁদের ভোট ট্রান্সফার করেন, তা হলে তৃণমূলের যাত্রাভঙ্গ করতে গিয়ে নিজেদের নাকটাই তাঁরা কেটে ফেলবেন। সিপিএমের কফিনেই শেষ পেরেকটি ঠুকবেন তাঁরা। এবারের নির্বাচনে সিপিএমকেই প্রমাণ করতে হবে, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা আন্তরিক, কি না।

Related Articles