কবিগুরুর অঙ্কন শিক্ষার চর্চাও শুরু হয়েছিল স্বাভাবিক নিয়মে
পিতা গুণেন্দ্রনাথও ছিলেন একজন শিল্পরসিক মানুষ।
রাজু পারাল: তাঁর কাছে বাঙালির ঋণের শেষ নেই। সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির এমন কোন দিক নেই যেখানে তিনি তাঁর অমর সৃষ্টি রেখে যাননি। ‘স্কাই ইজ দ্য লিমিট’ কথাটা বোধহয় এমন মানুষের ক্ষেত্রেই খাটে। চিত্র চর্চায় কবিগুরুর অসামান্য কৃতিত্বের কথা ভুলে যাওয়ার নয়। নবজাগরণের প্রাণকেন্দ্র জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে অন্যান্য বিদ্যাশিক্ষার মতো ছবি আঁকা শিক্ষার চর্চাও শুরু হয়েছিল স্বাভাবিক নিয়মে। এই বাড়ির গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ এবং অবনীন্দ্রনাথ প্রত্যেকেই যুক্ত ছিলেন শিল্পচর্চার সঙ্গে। তাঁদের পিতা গুণেন্দ্রনাথও ছিলেন একজন শিল্পরসিক মানুষ।
গুণেন্দ্রনাথের ছোট মেয়ে সুনয়নী দেবীও ছিলেন একজন উঁচু দরের চিত্রশিল্পী। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী প্রতিমাদেবীও ছিলেন একজন দক্ষ শিল্পী। নিয়মিত তিনি ছবি আঁকায় নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন। শান্তিনিকেতনে, শ্রীনিকেতনে কারুশিল্পের চর্চায় তাঁর আগ্রহ ও উৎসাহ ছিল অপরিসীম। কাজেই ঠাকুরবাড়ির সুপুত্র (মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ছেলে) রবীন্দ্রনাথও যে শিল্পচর্চা বিষয়টি থেকে দূরে থাকবেন না এটাই স্বাভাবিক। চিত্রকলার প্রতি কবিগুরুর মনের মধ্যে একটা সুপ্ত বাসনা ছিল কিশোর বয়স থেকেই এবং সেটাই তাঁর অবচেতন মনকে নাড়া দিত বার বার। ১৮৯৩ সনে লেখা ‘ছিন্নপত্র’ এর পাতাতে সুস্পষ্টভাবে কবিগুরু উল্লেখ করেছেন সেকথা। তিনি লিখেছেন ‘ঐ যে চিত্রবিদ্যা ব’লে একটা বিদ্যা আছে তার প্রতিও আমি সর্বদা হতাশ প্রণয়ের লুব্ধ দৃষ্টিপাত করে থাকি।…’
বেশিরভাগ মানুষই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে জানেন কবি, লেখক, নাট্যকার, সংগীতজ্ঞ, শিক্ষক এবং দার্শনিক হিসেবে। চিত্রশিল্পী হিসেবেও তিনি যে পরবর্তী সময়ে একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন সে কথা খুব কম লোকই জানেন। কবিগুরু যখন ছবি আঁকা শুরু করেন তখন তাঁর বয়স পঁয়ষট্টি বছর পেরিয়ে গেছে। শৈশবের চিত্রকলার ফল্গুধারা একদিন বাঁধভাঙা জলস্রোতের মতো তাঁর কাছে হাজির হয়েছে এবং মনের আনন্দে তার চর্চা চালিয়ে গেছেন মৃত্যুর আগে পর্যন্ত। কবিগুরু মৃত্যুর আগে পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজারের মতো ছবি এঁকেছিলেন।
শেষ বয়সে এই বহুমুখী প্রতিভাধরের শিল্পের আসরে আসা এবং ভারতীয় শিল্পকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধনে কোনওভাবে গ্রথিতকরণ আমাদেরকে কেবলমাত্র অবাক করে না– বিস্ময়ে হতবাক বা বিমূঢ় করে দেয়। কলমের কাটাকুটি দিয়েই কবিগুরুর ছবি আঁকা শুরু হয়েছিল, পরে সেই কলমই হয়ে ওঠে তরবারি অপেক্ষা ভয়ঙ্কর। একদিন কবিতার মধ্যে দিয়ে যা তিনি ব্যক্ত করতে পারেননি, তারই যেন প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন ছবিতে। ১৯২৪ সালে পূরবী’র কবিতাগুলির সংশোধনের সময় থেকেই কবির ছবির জগতে প্রবেশ, যা চলেছিল জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। ওকাম্পো (আর্জেন্টিনার এক নারীবাদী লেখিকা, কবিগুরুর বন্ধু) লিখেছিলেন, ‘ওঁর একটি ছোট খাতা টেবিলে পড়ে থাকতো, ওরই মধ্যে কবিতা লিখতেন বাংলায়।
বাংলা বলেই যখন-তখন খাতাটা খুলে দেখা আমার পক্ষে তেমন দোষের কিছু ছিল না। এই খাতা আমায় বিস্মিত করল, মুগ্ধ করল। লেখার নানা কাটাকুটিকে একত্রে জুড়ে দিয়ে তার ওপর কলমের আঁচড় কাটতে যেন মজা পেতেন কবি। এই আঁকিবুঁকি থেকে বেরিয়ে আসতো নানা রকমের মুখ, প্রাগৈতিহাসিক দানব, সরীসৃপ অথবা নানা আবোল তাবোল। সমস্ত ভুল, সমস্ত বাতিল করা লাইন, কবিতা থেকে বহিষ্কৃত সব শব্দ এমনি করে পুনরুজ্জীবিত হতো এক ভিন্ন রূপের জগতে, আমাদের দিকে তাকিয়ে যেন স্নিগ্ধ কৌতুকে হাসত তারা… এই ছোট খাতাটাই হল শিল্পী রবীন্দ্রনাথের সূচনাপর্ব।’
তবে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর হয়ে ওঠার পেছনে যদি কেউ থেকে থাকে নিঃসন্দেহে তিনি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। ১৯২৪ সালে পূরবীর খাতায় বিচিত্র কাটাকুটিতে উৎসাহ প্রদান থেকে শুরু করে তার ছ’বছর পরে প্যারিসের ‘পিগ্যাল গ্যালারি’তে প্রদর্শনীর আয়োজন– সর্বত্রই লুকিয়েছিল
ওকাম্পোর মায়াবী হাতের ছোঁয়া। কবিগুরুর আঁকা বেশ কিছু নারীমুখের পোট্রেটও ওকাম্পো প্রচ্ছন্নভাবে লুকিয়ে আছেন বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
বলাবাহুল্য, কবিগুরুর শেষ বয়সে চিত্রকর হয়ে ওঠার নেপথ্যে ওকাম্পো’র প্রভাব ছিল যথেষ্ট। কবিগুরু নিজের ছবি আঁকার শখকে উল্লেখ করেছেন ‘শেষ বয়সের প্রিয়া’ হিসেবে।
রবীন্দ্রনাথের প্রাথমিক শিল্পচর্চার কিছু নিদর্শন দেখা যায় ‘জীবনস্মৃতি’র পাতায়। ১৯২৮ সাল থেকে কবিগুরু পুরোদস্তুর ছবি আঁকা শুরু করেন। ওই সময় থেকে পরবর্তী দশ-বারো বছরে তিনি এঁকে ফেলেছিলেন প্রায় আড়াই হাজারের মতো ছবি। একটা সময়ে পল ক্লি, এমিল নোলদে, এডওয়ার্ড মুঙ্খ প্রমুখ শিল্পীর আঁকা ছবি দেখে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হন কবি। সে সবের ছাপ দেখা যায় কবির আঁকা নর-নারীর শরীর, মুখমণ্ডল, আদিম জীবজন্তু, পাখি, সরীসৃপ ইত্যাদি ছবিতে। বিচিত্র বর্ণের সমাবেশে নর-নারীর চিত্র, প্রাকৃতিক দৃশ্য, ফুল পাতা ইত্যাদি ছবিগুলি ও কবির হাতে রূপ পেয়েছে স্বমহিমায়।
১৯৩০ সালের মে মাসে প্যারিসে কবির প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী হয়। যা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সাহায্যেই হয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ সে কথা এক চিঠিতে (২ মে, ১৯৩০) লেখেন পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকে… ‘ভিক্টোরিয়া যদি না থাকত, তা হলে ছবি ভালোই হোক আর মন্দই হোক, কারো চোখে পড়ত না।… রথী (পুত্র রথীন্দ্রনাথ) ভেবেছিল ঘর পেলেই ছবির প্রদর্শনী আপনিই ঘটে– অত্যন্ত ভুল। খরচ কম হয়নি– তিন চারশো পাউন্ড হবে। ভিক্টোরিয়া অবাধে টাকা ছড়াচ্ছে। এখানকার সমস্ত বড় বড় গুণীজনদের ও জানে ডাক দিলেই তারা আসে।’
রবীন্দ্রনাথ নিজের আঁকা ছবি নিয়ে প্যারিসে একটা প্রদর্শনী করার সুপ্ত বাসনা ছিল। সেজন্যে ১৯৩০ সালে প্যারিসে যাওয়ার সময় সঙ্গে নিয়ে যান নিজের হাতে আঁকা চারশো ছবি; কিন্তু সেখানে গিয়ে বুঝেছিলেন, ছবির প্রদর্শনী করাটা অত সোজা নয়। ভাল গ্যালারি এমনিতেই চট করে পাওয়া যায় না, আর তার মধ্যে আবার প্যারিসে তাঁর জানাশোনাও ছিল কম। সেবারে ওকাম্পোই কবিগুরুকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন।
কবিগুরুর বেশকিছু কাছের বন্ধু-বান্ধব প্যারিসে প্রদর্শনীর সময় ছবির সমালোচনা করলেও প্রদর্শনী থেমে থাকেনি। পরবর্তী সময়গুলিতে বিভিন্ন স্থানে (যথা– লন্ডন, বার্লিন, কোপেনহেগেন, জেনেভা, মস্কো, আমেরিকা, নিউইয়র্ক, জার্মানি এবং ফিলাডেলফিয়া) কবিগুরুর ছবি প্রদর্শনী হতে দেখা যায়।
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির রবীন্দ্রনাথ ও ভাইপো অবনীন্দ্রনাথ একে ওপরের প্রতি ছিলেন যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। পরস্পর পরস্পরকে প্রেরণা জুগিয়েছেন ছবি আঁকতে ও লিখতে। রবীন্দ্রনাথ ‘চিত্রাঙ্গদা’র জন্য দুটি ছবি চেয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথকে। যে প্রসঙ্গটির অবতারণা করে অবনীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘এই হল রবিকার সঙ্গে আমার প্রথম আর্ট নিয়ে যোগ। তার পর থেকে এত কাল রবিকা’র সঙ্গে বহুবার আর্টের ক্ষেত্রে যোগাযোগ হয়েছে, প্রেরণা পেয়েছি তাঁর কাছ থেকে। আজ মনে হচ্ছে আমি যা কিছু করতে পেরেছি তার মূলে ছিল তাঁর প্রেরণা।’ ১৯৪১ সাল। অবনীন্দ্রনাথের প্রাণের রবিকা চলে গেলেন চিরশান্তির দেশে। ছিন্ন হল রবিকার সঙ্গে তাঁর শিল্প নিয়ে চর্চা। বিষণ্ণ হৃদয়ে, ভারাতুর মনে অবীন্দ্রনাথ আঁকলেন জীবনের শেষ ছবি, ‘সম্মুখে শান্তি পারা পার।’






