Moral Decline: প্রগতির শৃঙ্গে দাঁড়িয়ে নৈতিকতার পতন
মানুষের অভ্যন্তরীণ শক্তি, মানবিকতা, নৈতিকতা— সব মিলিয়ে যেন এক ধারাবাহিক পতনের পথে হাঁটছে।
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম: শিল্পায়ন, নগরায়ন ও বিশ্বায়নের ত্রিমুখী ঢেউ গোটা বিশ্বের আর্থসামাজিক পরিকাঠামোকে এমনভাবে পাল্টে দিয়েছে যে আজ আমরা প্রত্যেকে যেন এক নতুন বাস্তবতার মধ্যে বসবাস করছি। প্রযুক্তির অগ্রগতি, আর্থিক সদ্যোজাত সমৃদ্ধি ও দ্রুত বদলে যাওয়া জীবনযাত্রা— এই সব মিলিয়ে মানুষের মনোজগতে জন্ম দিয়েছে এক অপরিমেয় ভোগাকাঙ্ক্ষা। আরও সুখ, আরও স্বাচ্ছন্দ্য, আরও বিলাস— এই তীব্র আকাঙ্ক্ষা সমাজকে নিয়ে গিয়েছে এক অভূতপূর্ব অবক্ষয়ের দিকে। আজ যেদিকে তাকানো যায়, সেদিকেই শোনা যায় অসন্তোষের শব্দ, অবিশ্বাসের প্রতিধ্বনি। মানুষের অভ্যন্তরীণ শক্তি, মানবিকতা, নৈতিকতা— সব মিলিয়ে যেন এক ধারাবাহিক পতনের পথে হাঁটছে।
অথচ কয়েক দশক আগেও আমাদের সমাজ এতটা ভোগবাদী ছিল না। তখনও সীমিত প্রাপ্তি ও স্বল্প আকাঙ্ক্ষার মধ্যেও মানুষ ছিল পরিতৃপ্ত। ছিল আত্মমর্যাদা, ছিল একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা। আজ সেই সব যেন অতীতের গল্প। এখন সমাজজুড়ে এক আত্মহারা দৌরাত্ম্য— লোভ, লালসা, প্রতিশোধ, প্রতিযোগিতা ও স্বার্থপরতার এক গভীর অন্ধকার। আধুনিকতার নামে আমরা যে প্রগতির ধ্বজা ওড়াচ্ছি, তা আসলে আমাদের মূল্যবোধের শবযাত্রার শিঙ্গা ছাড়া আর কিছু নয়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতিতে পৃথিবী আজ আমাদের হাতের মুঠোয়। স্মার্টফোনের পর্দায় খবর, বিনোদন, তথ্য, জ্ঞান— সবই আমরা মুহূর্তে পেয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এই যন্ত্রনির্ভরতা মানুষকে করেছে যান্ত্রিক। হারিয়ে যাচ্ছে শ্রমশীলতা, হারাচ্ছে সহনশীলতা। শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধের মতো মানবিক গুণাবলির বিস্ময়কর পতন খুবই চোখে পড়ছে। একসময়ের ত্যাগ-শ্রদ্ধা-সততা— এই শব্দগুলো এখন শুধু বক্তৃতার অলঙ্কার, বাস্তব সমাজে তার চিহ্ন মেলে না বললেই চলে।
অর্থই আজ সবকিছুর মাপকাঠি। যে বেশি কামাই করছে সেই শ্রেষ্ঠ— এই বোধ এখন বিপজ্জনকভাবে প্রোথিত হচ্ছে সমাজের ভিতরে। ফলে যে কোনও উপায়ে অর্থলাভই হয়ে দাঁড়াচ্ছে জীবনের মূল লক্ষ্য। মানুষ আজ লোভের পেছনে দৌড়াচ্ছে এক নিঃশ্বাসে, কিন্তু কোথায় তার সীমা, কোথায় শেষ— সেটা নিতান্তই অজানা। সন্তুষ্টি যেন এখন বিলুপ্তপ্রায় একটি শব্দ।
আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে হতাশা, মানসিক অবসাদ ও মূল্যবোধহীনতা। দেখা দিয়েছে নৈতিকতার সঙ্কট। রাজনীতির নোংরা ছোবল সমাজের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়ছে। দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, হঠকারিতা— এসব যেন আজ জন্মগত অধিকার। রাজনীতিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী কেউই বাদ নয় এই অপসংস্কৃতির ছোঁয়া থেকে। মানুষের কাজের প্রতি নিষ্ঠা কমছে, কিন্তু বাড়ছে সুবিধাবাদী মনোভাব।
সবচেয়ে দুঃখের কথা— আজকের প্রজন্মের সামনে নেই কোনও অনুকরণযোগ্য আদর্শ। পরিবার থেকে সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে রাজনৈতিক পরিমণ্ডল— সব জায়গায় মূল্যবোধের শূন্যতা। শৈশব থেকেই তারা দেখছে আদর্শহীনতা। ফলে বড় হয়ে ন্যায়-অন্যায় বোধটাও গড়ে উঠতে পারছে না। মানসিক ও সামাজিক দিক থেকে তারা হচ্ছে বিভ্রান্ত, দিশাহীন। তাদের কাছে পড়াশোনা অনেক সময় গৌণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, আর প্রাধান্য পাচ্ছে উন্মত্ততা, আক্রমণাত্মক আচরণ ও ক্ষমতাবিষয়ক প্রদর্শনী।
প্রশ্ন উঠতেই পারে— কেন? কেন স্কুল-কলেজে পড়াশোনার চেয়ে রাজনীতি, দলাদলি, কর্তৃত্ব ফলানো এত বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে? কেন ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক অবনতি হচ্ছে? এর পিছনে আছে প্রচ্ছন্ন মদত, আছে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, আছে ক্ষমতার স্বার্থ। সমাজ তা বুঝেও চুপ। আর নীরবতারই সুযোগ নিচ্ছে অসাধু শক্তি।
সমাজজুড়ে আজ এক ধরনের বিকৃত মানসিকতা কাজ করছে। ইভটিজিং, শ্লীলতাহানি, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, এমনকী নৃশংস খুন— সবকিছু যেন দ্রুত সাধারণ হয়ে উঠছে। কখনও রক্ষকই হয়ে উঠছে ভক্ষক, কখনও পরিবারের অন্দরমহলেই ঘটে যাচ্ছে জঘন্য অপরাধ। আবার কখনও রাজনীতির ছত্রছায়ায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অপরাধীরা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সংস্থাগুলিও কখনও-সখনও হয়ে ওঠে নিরুত্তাপ।
সিনেমা, সিরিজ, সোশ্যাল মিডিয়া— সর্বত্রই হিংসা ও যৌনতার প্রদর্শনী। শিশু ও কিশোরেরা সহজেই এসবের নাগাল পাচ্ছে, আর সেখান থেকেই তৈরি হচ্ছে ভুল অনুকরণ। শিল্পচর্চা ও শিক্ষামূলক দৃষ্টিভঙ্গির বদলে আজ অনেক পরিচালক বিকৃত রুচির প্রদর্শনকেই ব্যবসার মূলধন বানিয়েছেন। সেন্সর বোর্ড থাকার পরও অশ্লীলতার অবাধ বহিঃপ্রবাহ প্রশ্ন তোলে— নৈতিকতা কোথায়? দায়িত্ব কোথায়?
এই দীর্ঘদিনের অবক্ষয়ের পরিণতি খুবই ভয়াবহ। সমাজ ক্রমশ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। পরবর্তী প্রজন্মের হাতে আমরা কী তুলে দিচ্ছি? বিষাক্ত পরিবেশ, নোংরা মানসিকতা, আর বিকৃত জীবনবোধ? আমাদের কি কোন দায় নেই? প্রতিবাদ কি শুধু বক্তৃতার বিষয়? নাকি প্রতিরোধের প্রয়োজন হলে আমরা সবাই ঠুঁটো জগন্নাথ হয়েই থাকব?
ভোগবাদী সমাজে এখন সাফল্যের পরিমাপ শুধু অর্থ দিয়ে। তাই অসাধু ব্যবসায়ীরা চাতুর্যের সঙ্গে মানুষের মানসিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে স্লো পয়জনের মতো বিকৃতির বিষ ছড়াচ্ছেন। কেবল হিংসা ও যৌনতাকে মূলধন করে যখন চলচ্চিত্র বা দৃশ্যমান শিল্প তৈরি হয়, তখন সমাজও তার মূল্যবোধ বিকিয়ে দেয়। শৈথিল্য দেখে পরিচালকেরা আরও সাহস পায়। প্রশাসনের ভূমিকা প্রায়শই রহস্যময় নির্লিপ্ততায় মোড়া।
এর দায় শুধুই প্রশাসনের নয়; আমরাও দায়ী। কারণ আমরা দেখেও দেখি না। শুনেও শুনি না। প্রতিবাদ করার সাহস হারিয়ে ফেলেছি অনেক খানি। ফলে সমাজের যে কোনও ঘৃণ্য অপরাধ করে বেড়ানো কিছু মানুষ দাপট নিয়ে ঘোরে, কারণ তারা জানে— দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে তাদের কোনওদিন কিছুই হবে না। রাজনৈতিক আশ্রয় থাকলে তো কথাই নেই— আইনের চোখে তারা প্রায় অব্যাহতি পাওয়া এক বিশেষ গোষ্ঠী।
ফলে আমাদের রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যেই জন্ম নিচ্ছে অবক্ষয়। রাজনৈতিক ক্ষমতার ছত্রছায়ায় অপরাধীরা নিরাপত্তা পায়, আর সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। যে সমাজে সৎ মানুষের মূল্য নেই, যে সমাজে ভাল কাজের ফল মেলে না, সে সমাজে মূল্যবোধ গড়ে উঠবে কীভাবে?
দেশের বড় অংশ যখন অপসংস্কৃতি, অশ্লীলতা ও নৈতিক শূন্যতায় ভোগে, তখন সেটি এক জাতির পক্ষে লজ্জাজনক। বিবেকহীন মানুষ পশুতুল্য— এ কথাটি আমরা অনেকবার শুনেছি। কিন্তু আজ সমাজের বড় অংশ বিবেককে অকার্যকর করে ফেলেছে। ফলে মানুষ ও পশুর সীমারেখাটি ক্রমশ ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে।
স্কুলে নৈতিক শিক্ষা কমছে, বাড়িতে সময়ের অভাবে অভিভাবকরা সন্তানদের কাছে মনোযোগ দিতে পারছেন না। সামাজিক মাধ্যমে শিশুদের অপ্রাপ্তবয়স্ক মনের উপর পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। ব্যক্তিগত জীবনে বাড়ছে প্রতিযোগিতা ও চাপ। ফলে পরিবার থেকে শুরু করে অফিস-আদালত সব জায়গায় মানুষের আচরণে অস্থিরতা।
এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। সমাজকে সুস্থ পথে ফিরিয়ে আনতে হলে পরিবার, শিক্ষা ব্যবস্থা, রাষ্ট্র এবং ব্যক্তি— সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে।
পরিবারে নৈতিক শিক্ষা, স্কুলে মূল্যবোধভিত্তিক পাঠ, সমাজে দায়িত্বশীল নাগরিক চেতনা, রাষ্ট্রে কঠোর আইন ও তার নিরপেক্ষ প্রয়োগ— এসবের সম্মিলিত প্রয়াসেই অবক্ষয়ের স্রোত রোধ করা সম্ভব।
মূল্যবোধের সঙ্কটে ভোগা এই সময়ে আমাদের বড় প্রয়োজন বিবেকের পুনর্জাগরণ। মানুষ তার মানবিক সত্তা, নৈতিক সাহস ও সামাজিক দায়িত্ববোধ পুনরুদ্ধার করলেই সম্ভব এই সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা। উন্নতি তো কেবল প্রযুক্তির উন্নতি নয়; প্রকৃত উন্নতি তখনই, যখন মানুষ তার মনুষ্যত্ব রক্ষা করতে পারে।
সেই শুভ দিনের প্রত্যাশা থাকে— যেদিন সমাজ আবার উঠে দাঁড়াবে, মানুষ আবার মানুষকে শ্রদ্ধা করবে, আর আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এক সুস্থ, স্বচ্ছ ও মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজে শ্বাস নেবে।






