সম্পাদকীয়

বারবার সিদ্ধান্ত বদলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে

ধারাবাহিকতার অভাব।

মহম্মদ মফিজুল ইসলাম: ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর সবচেয়ে সংবেদনশীল স্তম্ভগুলির একটি নির্বাচন ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে ভারতীয় নির্বাচন কমিশন— যার উপর সংবিধান অর্পণ করেছে স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও সর্বোচ্চ দায়িত্ববোধের ভার। এই প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক ক্ষমতার ঊর্ধ্বে থাকবে, নাগরিকের ভোটাধিকারের চূড়ান্ত রক্ষক হয়ে উঠবে- এই বিশ্বাসের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কমিশনের একের পর এক সিদ্ধান্ত, আবার সেই সিদ্ধান্ত থেকে হঠাৎ সরে আসা, কখনও আংশিক পরিবর্তন, কখনও ব্যাখ্যার নামে নতুন বিভ্রান্তি— সব মিলিয়ে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে; নির্বাচন কমিশন কি আজ নিজের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তিভূমি নিজেই নড়বড়ে করে তুলছে না?

সমস্যা কোনও একটি সিদ্ধান্তকে ঘিরে নয়। সমস্যা সেই সিদ্ধান্তগুলির ধারাবাহিকতা, বা আরও স্পষ্টভাবে বললে— ধারাবাহিকতার অভাব। নির্বাচন কমিশনের মতো সংস্থার ক্ষেত্রে নীতিগত স্থিরতা শুধু প্রশাসনিক গুণ নয়, তা একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতা। কারণ কমিশনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রভাব ফেলে কোটি কোটি নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার, সামাজিক মর্যাদা ও জীবনের নিরাপত্তার উপর। যখন সেই সিদ্ধান্তগুলি বারবার বদলে যায়, তখন কেবল প্রশাসনিক বিভ্রান্তিই তৈরি হয় না, তৈরি হয় গভীর আস্থাহীনতা।

এই প্রেক্ষিতেই এসআইআর শুনানির বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুনানির উদ্দেশ্য, কাঠামো ও প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও বলা হয়েছে এটি শুধুই নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া, আবার কোথাও আচরণ করা হয়েছে যেন এটি নাগরিকত্বের বিচারালয়। কখনও বলা হয়েছে আধার ও ভোটার কার্ড যথেষ্ট, আবার কখনও সেই একই নথি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। কখনও শুনানির সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে, কখনও হঠাৎ করে কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে। এই দোলাচলের মধ্যেই আটকে পড়েছে প্রান্তিক মানুষ— দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, পরিযায়ী শ্রমিক, সংখ্যালঘু, দলিত, আদিবাসী, বৃদ্ধ, একাকী নারী।

তাঁদের কাছে নির্বাচন কমিশনের এই খামখেয়ালিপনা কোনও বিমূর্ত প্রশাসনিক সঙ্কট নয়, এটি দৈনন্দিন জীবনের নির্মম বাস্তবতা। দূরবর্তী ব্লক অফিসে পৌঁছতে একদিনের মজুরি হারানো, প্রয়োজনীয় নথি জোগাড় করতে ঋণের বোঝা, শুনানির তারিখ বদলের ফলে বারবার যাতায়াত, আর সর্বোপরি— এক অদৃশ্য আতঙ্ক। এই আতঙ্ক কোনও আইনের ভাষায় লেখা নেই, কিন্তু মানুষের চোখে, শরীরী ক্লান্তিতে, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়ে তা স্পষ্ট।

নির্বাচন কমিশন হয়তো বলবে— এই সবই নিয়ম রক্ষার স্বার্থে। কিন্তু প্রশ্ন হল, নিয়ম কাদের জন্য? আর সেই নিয়ম প্রয়োগের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কমিশন কি মানবিকতার ন্যূনতম মানদণ্ডটুকুও ভুলে যাচ্ছে না? গণতন্ত্র কেবল ভোটের বাক্সে সীমাবদ্ধ নয়। গণতন্ত্র মানে মানুষের সম্মান, সহজ প্রবেশাধিকার, এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস। যখন সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়, তখন নির্বাচন হয় কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা, আর কমিশন পরিণত হয় একটি শীতল আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, কমিশনের সিদ্ধান্ত বদলের কোনও স্পষ্ট যুক্তি বা স্বচ্ছ ব্যাখ্যা জনসমক্ষে আসে না। একদিন যা আইনসম্মত, পরদিন তা সন্দেহজনক হয়ে ওঠে— কিন্তু কেন? কোন নতুন তথ্য, কোন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, কোন আদালতের নির্দেশ এই পরিবর্তনের কারণ? এই প্রশ্নগুলির উত্তর না দিয়ে কেবল বিজ্ঞপ্তি জারি করা একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ গণতন্ত্রে কর্তৃত্ব আসে যুক্তি থেকে, ভয় থেকে নয়।

এসআইআর শুনানির ক্ষেত্রেও তাই দেখা যাচ্ছে। কোথাও শুনানি স্থগিত, কোথাও দ্রুত শেষ করার চাপ, কোথাও আবার নতুন নির্দেশিকা। ফলত মাঠপর্যায়ের আধিকারিকরাও বিভ্রান্ত, নাগরিকরাও। এই প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার খেসারত দিচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলোই। যাঁদের কাছে রাষ্ট্র মানে এখনও একটি দূরের, কঠিন, প্রায় ভীতিকর কাঠামো— তাঁদের জন্য এই অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস আরও গভীর করে তুলছে।

এখানেই কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। নির্বাচন কমিশন কোনও সাধারণ দফতর নয়। এটি সংবিধানের একটি নৈতিক প্রতিষ্ঠান। তার আচরণে সংবিধানের আত্মা প্রতিফলিত হওয়া উচিত। সেই আত্মার কেন্দ্রে রয়েছে সমতা, ন্যায় ও মানবিকতা। কিন্তু যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় এই মূল্যবোধগুলি অনুপস্থিত থাকে, তখন কমিশনের নিরপেক্ষতা কেবল ঘোষণার স্তরেই থেকে যায়।

অনেকে বলবেন, সমালোচনা করা সহজ, প্রশাসন চালানো কঠিন। এই যুক্তি আংশিক সত্য। কিন্তু কঠিন কাজ করার জন্যই নির্বাচন কমিশনকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। সেই মর্যাদার অর্থ হল— কমিশনকে রাজনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক সুবিধা কিংবা সংখ্যার খেলায় নয়, নীতিগত দৃঢ়তার উপর দাঁড়াতে হবে। বারবার সিদ্ধান্ত বদলে সেই দৃঢ়তা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

আজ যে সঙ্কট আমরা দেখছি, তা হঠাৎ তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে ছোট ছোট প্রশ্ন জমতে জমতে আজ বড় আকার নিয়েছে। কখনও নির্বাচনী আচরণবিধির প্রয়োগে অসামঞ্জস্য, কখনও ভাষা ও আচরণে পক্ষপাতের অভিযোগ, কখনও আবার নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে অস্পষ্টতা। এই সবকিছু মিলিয়েই একটি বৃহত্তর উদ্বেগ তৈরি করেছে— কমিশন কি ক্রমশ তার ঐতিহাসিক ভূমিকা থেকে সরে আসছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে সেই আদর্শের দিকে, যেখান থেকে নির্বাচন কমিশনের পথচলা শুরু হয়েছিল। একসময় এই প্রতিষ্ঠান ছিল সাহসের প্রতীক। ক্ষমতাবানদের চোখে চোখ রেখে কথা বলার ইতিহাস রয়েছে তার। আজ সেই সাহসের জায়গায় যদি সতর্কতা, দ্বিধা ও খামখেয়ালিপনা জায়গা করে নেয়, তা হলে তা শুধু কমিশনের নয়, গোটা গণতন্ত্রের জন্যই অশনিসঙ্কেত।

এসআইআর শুনানির অভিজ্ঞতা আমাদের তাই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। নাগরিকের অধিকার রক্ষার নামে যদি নাগরিককেই হয়রানির মুখে পড়তে হয়, তবে সেই প্রক্রিয়ার নৈতিক বৈধতা কোথায়? গণতন্ত্র কোনও পরীক্ষাগার নয়, যেখানে নীতির খসড়া নিয়ে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলবে, আর মানুষ হবে তার অবজেক্ট। গণতন্ত্র জীবিত মানুষের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে থাকে।

এই অবস্থায় নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রত্যাশা একটাই— স্বচ্ছতা, স্থিরতা ও মানবিকতা। সিদ্ধান্ত নিন, কিন্তু ভেবেচিন্তে নিন। নিন এমন সিদ্ধান্ত, যা বদলাতে হবে না পরদিন। নিন এমন সিদ্ধান্ত, যার ব্যাখ্যা নাগরিককে দেওয়া যায় চোখে চোখ রেখে। কারণ কমিশনের শক্তি তার বিজ্ঞপ্তিতে নয়, তার বিশ্বাসযোগ্যতায়। বারবার সিদ্ধান্ত বদলের মধ্যেই আজ সেই বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে। এই প্রশ্নের উত্তর কমিশনকেই দিতে হবে— শব্দে নয়, বিবৃতিতে নয়, কাজে।

Related Articles