সম্পাদকীয়

নন্দনের আঙিনায় শৈশবের নতুন মানচিত্র

এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে সিনেমা হলের সেই বিশাল অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহ আসলে এক সমষ্টিগত যাপন।

সত্যগোপাল দে (সাংবাদিক শিশু ও নারী সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলর): এবারের সাপ্তাহিক পর্বটি সম্পূর্ণ খোলা চোখে দেখেছি। কিন্ত এই দেখার অনুরণন হয়তো রয়ে যাবে বন্ধ চোখে, অনেক অনেক দিন। এটি সাপ্তাহিক কলাম হিসেবে না লিখেও কিন্ত একটি সংবাদ হিসেবে লিখে দেওয়া যেত, কিন্ত বিষয়টি শুধু সংবাদ উপস্থাপনা নয়। সময় থমকে যায় সময়ের কাছে, আর সেই ধাবমান সময়কে অস্বীকার করার উপায় আজ নেই, সময়ের অনেকটাই আটকে গেছে মুঠোফোনের কি-প্যাডে। চার ইঞ্চি পর্দার নীল আলোয় যখন শৈশব আজ গৃহবন্দি, ঠিক তখনই নন্দন চত্বরে এক চিলতে মুক্তির আকাশ নিয়ে হাজির হল দ্বাদশতম আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব।

মুঠোফোনের হাতছানি বনাম বড় পর্দার রংমশাল

উদ্বোধনী মঞ্চে দাঁড়িয়ে চলচ্চিত্র জগতের প্রবীণরা যখন আগামীর প্রতিনিধিদের দেখছিলেন, তখন বারবার ফিরে আসছিল এক অমোঘ সত্য। বর্তমান প্রজন্মের বিনোদন আজ আর প্রকৃতির সান্নিধ্যে নেই, বরং তা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে চার দেওয়ালের কোণে ডিজিটাল স্ক্রিনে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নিভৃত বিনোদন আসলে এক প্রকার ‘রোদন’ বা কান্নারই অন্য নাম, যা শিশুকে সমাজবিচ্ছিন্ন করে তোলে।

​এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে সিনেমা হলের সেই বিশাল অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহ আসলে এক সমষ্টিগত যাপন। সেখানে যখন ‘সাউন্ড অফ মিউজিক’-এর সেই সুর বেজে ওঠে কিংবা ‘জয় জয়ন্তী’-র সেই চেনা দলবদ্ধ শিশুদের আলাপ ভেসে আসে, তখন শিশুর চোখের সামনে জ্বলে ওঠে শৈশবের আসল ‘রঙমশাল’। সন্দীপ রায় যথার্থই মনে করিয়ে দিলেন— বড় পর্দা আর মুঠোফোনের তফাৎটা হলো অনুভবের। বড় পর্দা মানে প্রকৃতির বিশালতা, যা শিশুকে কল্পনার ডানা মেলতে শেখায়; আর মুঠোফোন মানে সেই ডানাকে খাঁচাবন্দি করা। মনে করিয়ে দিলেন, শিশু-কিশোর অ্যাকাডেমির চেয়ারপার্সন অর্পিতা ঘোষ।

​​উৎসবের সেরা সম্ভার

আজ ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত শহরের ৮টি প্রেক্ষাগৃহে কচিকাঁচাদের জন্য দেখানো হয় বিশ্বসেরা সব ছবি। ৩২টি দেশের ছবির পাশাপাশি ছিল শিশুদের নিজেদের তৈরি মোবাইল ফিল্মও। কিন্তু সেই ফিল্মগুলিও দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বড় পর্দাতেই। কারণ, শৈশব তো আর একা একা ঘরের কোণে বসে থাকার নাম নয়, শৈশব মানে হল ভর্তি সমবয়সীদের সঙ্গে হাসি-কান্না ভাগ করে নেওয়া।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে অর্পিতা ঘোষ জানালেন, এই উৎসব ‘ফার্স্ট অফ ইটস কাইন্ড’, উৎসবের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে জাতি, ধর্ম, অর্থনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে সব শিশুর জন্য।

সময়টা ঠিক এগারো বছর আগের। আনন্দ নগরী তিলোত্তমা কলকাতার বুকে যখন প্রথমবার আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবের চারাগাছটি রোপণ করা হয়েছিল, তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন ছিল— স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের এই যুগে বড় পর্দায় সিনেমা দেখতে কি কচিকাঁচারা ভিড় জমাবে? কিন্তু, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই দূরদর্শী ভাবনা আজ এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। তিনি সবসময়ই বলেন, ‘শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ, আর তাদের সৃজনশীলতাকে ডানা মেলার সুযোগ করে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।’ তাঁরই অনুপ্রেরণায় এবং তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের উদ্যোগে এবং পশ্চিমবঙ্গ শিশু কিশোর অ্যাকাডেমি এবং তার চেয়ারপার্সন বিখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব অর্পিতা ঘোষের উদ্যোগে এই উৎসব কেবল চলচ্চিত্র প্রদর্শনের গণ্ডি পেরিয়ে এক সামাজিক উৎসবের রূপ নিয়েছে। যে উৎসব শুধু কয়েকদিনের হই হট্টগোল, প্রদর্শনী নয়, এই মুঠোফোনের যুগে, প্রকৃতির সান্নিধ্য বঞ্চিত ভিন্ন শৈশবের যুগে এই আন্তর্জাতিক চলচিত্র উৎসব ফিরিয়ে আনছে যথার্থ শৈশব।

এগারো বছরের উত্তরাধিকার

দ্বাদশ আন্তর্জাতিক শিশু চলচিত্র উৎসবের উদ্বোধন হয়ে গেল ২৩ জানুয়ারি নন্দন ১ প্রেক্ষাগৃহে। উদ্বোধনীর আলোয় দাঁড়িয়ে সেই এগারো বছরের স্মৃতি রোমন্থন করলে বোঝা যায়, এটি আসলে এক শৈল্পিক গণতান্ত্রিক মঞ্চ, যেখানে বিশ্বের ৩২টি দেশের ভাষা, সংস্কৃতি আর যাপন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

গত এগারো বছরের পথচলায় আমরা দেখেছি কীভাবে একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ শিশুদের মনস্তত্ত্বকে বদলে দিতে পারে। এই উৎসবের লক্ষ্য কখনওই কেবল কয়েকটা ‘কার্টুন’ কিংবা ছোটদের চলচ্চিত্র দেখানো ছিল না। এর মূল ভিত্তি ছিল শিশুদের আন্তর্জাতিক আইন ইউনাইটেড নেশনস চাইল্ড রাইটস কনভেনশন ১৯৮৯-এর সেই গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ— শিশুর অংশগ্রহণের অধিকার অর্থাৎ চিল্ড্রেন্স রাইটস টু পার্টিসিপেশন, এই আন্তর্জাতিক আইনকে ভারত সরকার মান্যতা দিয়েছেন ১৯৯২ সালে। সুতরাং, এটি শুধু পশ্চিমবঙ্গের উৎসব নয় আন্তঅর্জাতিক আঙিনায় ভারতের অঙ্গীকার রক্ষার একটি পদক্ষেপ।

ছোটপর্দার মায়া কাটিয়ে বড় পর্দার রোমাঞ্চ

উদ্বোধনী মঞ্চে বসে পরিচালক সন্দীপ রায় যখন বলছিলেন, ‘সিনেমা দেখতে হয় বড় পর্দায়, মোবাইলে নয়,’ তখন প্রেক্ষাগৃহে বসা শত শত শিশুর চোখেমুখে এক অদ্ভুত বিস্ময় খেলা করছিল। তিনি মনে করিয়ে দিলেন, সিনেমার প্রতিটি ডিটেলিং, প্রতিটি শব্দ আর আলোর খেলা অনুধাবন করতে হলে ওই অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহের বিশালাকার পর্দার কোনও বিকল্প নেই। সত্যজিৎ রায়ের শতবর্ষ পেরিয়েও আজ যখন ‘সোনার কেল্লা’-র মরুভূমি বড় পর্দায় ফুটে ওঠে, তখন মোবাইল গেমের প্রতি আসক্তি নিমেষেই ম্লান হয়ে যায়।

উদ্বোধনী মঞ্চের মধ্যমণি— ‘নয়নওরফে অভিনব বড়ুয়া

এবারের উৎসবের উদ্বোধনী মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন সন্দীপ রায়, গৌতম ঘোষ, মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য্য, ইন্দ্রনীল সেন, ছিলেন কিউবার রাষ্ট্রদূত, সরকারি আধিকারিক-সহ এই মহতী যজ্ঞের ডাইরেক্টর এবং পশ্চিমবঙ্গ শিশু কিশোর অ্যাকাডেণির চেয়ারপার্সন অর্পিতা ঘোষ। এই চাঁদের হাটে সবার চোখ ছিল একটি ছোট ছেলের দিকে, সে অভিনব বড়ুয়া। সন্দীপ রায়ের সর্বশেষ ফেলুদা ছবি ‘নয়ন রহস্য’-তে নামভূমিকায় অভিনয় করে সে ইতিমধ্যেই ছোটদের এবং বড়দের মন জয় করে নিয়েছে।

সন্দীপ রায় নিজে মঞ্চে অভিনবর প্রশংসা করে বলেন, ‘এই উৎসবে অভিনবর মতো প্রতিভারা যখন আসে, তখন বোঝা যায় আমাদের সিনেমা জগৎ সঠিক হাতেই আছে।’

উদ্বোধনী প্রদীপ প্রজ্বলনের সময় অভিনবর সাবলীল উপস্থিতি প্রমাণ করে দেয় যে, আধুনিক শৈশব কেবল স্মার্টফোনের গেমসে আটকে নেই, তারা সৃজনশীলতার মঞ্চেও সমান উজ্জ্বল।

যে ‘বড় পর্দা’ আর ‘প্রকৃতির সান্নিধ্যের’ কথা উৎসবের মূল মন্ত্র হিসেবে উঠে এসেছে, অভিনব বড়ুয়া তার অন্যতম সফল উদাহরণ। মুঠোফোনের হাতছানি কাটিয়ে সে নিজেকে মেলে ধরেছে সেলুলয়েডের বিশাল ক্যানভাসে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর দেখা গেল, উপস্থিত কয়েকশো খুদে দর্শক অভিনবর সঙ্গে কথা বলার জন্য উন্মুখ। সে কেবল একজন শিল্পী হিসেবে নয়, বরং সমবয়সীদের কাছে এই বার্তাই পৌঁছে দিল যে— শৈশব মানেই হল নিজেকে প্রকাশ করার আনন্দ অর্থাৎ রাইটস টু পার্টিসিপেশন।

সেদিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনব যখন লাজুক হেসে ছোটদের উদ্দেশ্যে বলল, ‘তোমরাও বড় পর্দায় ছবি দেখো, খুব আনন্দ হবে,’ তখন প্রেক্ষাগৃহে হাততালির রোল উঠেছিল। এই এক চিলতে কথাটুকুই যেন এবারের উৎসবের হাজারও শব্দের সার্থকতা বহন করে আনল।

গুপ্তধনের সন্ধানে

এবারের বিশেষ আকর্ষণ হল গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শশালায় আয়োজিত ‘ট্রেজার হান্ট’ বা গুপ্তধনের সন্ধানে প্রদর্শনীটি। এটি কেবল একটি এগজিবিশন নয়, এটি যেন ইতিহাসের এক ধুলোমাখা সুড়ঙ্গ দিয়ে বর্তমানে ফেরার পথ। এখানে প্রদর্শিত প্রতিটি উপাদান— পুরনো দিনের ক্যামেরা থেকে শুরু করে বিখ্যাত সিনেমার প্রপস— শিশুদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে জগতটা কেবল ‘গুগল সার্চ’-এ সীমাবদ্ধ নয়। নিজের চোখে দেখে, হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখার যে আনন্দ, সেটাই আসল গুপ্তধন। তথ্যে ঠাসা এই প্রদর্শনীটি প্রতিটি শিশুর কল্পনাশক্তিকে এক ধাক্কায় অনেকটা বাড়িয়ে দেবে গগনেন্দ্র চিত্রশালার প্রদর্শনীটি যেন এক জাদুর জগৎ। সেখানে রাখা সত্যজিৎ রায়ের আঁকা খেরোর খাতা, পুরনো দিনের বিশাল ক্যামেরা আর সিনেমার নেপথ্যের গল্পগুলো শিশুদের কাছে আসল গুপ্তধন। এটি কেবল প্রদর্শনী নয়।

বিনামূল্যে বিশ্বভ্রমণএক নজরে সেরা ছবি

সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ডেলিগেট কার্ডের মাধ্যমে শিশুরা বড় পর্দায় দেখার সুযোগ পেয়েছে ভারতীয় ধ্রুপদী সিনেমা সোনার কেল্লা, জয় জয়ন্তী, গুপী গাইন বাঘা বাইন, হীরক রাজার দেশে। বিশ্ব সিনেমা— দ্য সাউন্ড অফ মিউজিক (আমেরিকা), দ্য রেড বেলুন (ফ্রান্স), চিলড্রেন অফ হেভেন (ইরান), মাই নেইবার তোতোরো (জাপান)।

এগারো বছর আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে স্বপ্ন যাত্রা শুরু করেছিল, আজ তা এক মহীরুহ। দলবেঁধে বন্ধুদের সঙ্গে বড় পর্দায় সিনেমা দেখার এই আনন্দই হোক প্রতিটি শিশুর শৈশবের পাথেয়।

নন্দনের  সিঁড়ি বেয়ে যখন খুদেদের কলতান ভেসে আসে, তখন মনে হয় রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগ সার্থক। এই উৎসব শিশুদের শেখাচ্ছে কীভাবে অন্যের সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করতে হয়, কীভাবে ভিড়ের মাঝেও নিজের সত্তাকে খুঁজে নিতে হয়। এগারো বছর আগে যে স্বপ্ন দেখা শুরু হয়েছিল, দ্বাদশ বর্ষে এসে তা আজ এক পূর্ণাঙ্গ শিশু অধিকার রক্ষার যজ্ঞে রূপান্তরিত। আর এই মহতী প্রচেষ্টার জন্য অভিনন্দন প্রাপ্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য সংস্কৃতি দফতর, পশ্চিমবঙ্গ শিশু কিশোর আকাডেমি এবং তার চেয়ারপার্সন অর্পিতা ঘোষ এবং সর্বোপরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের দূরদর্শিতা।

Related Articles