সম্পাদকীয়

কার্তিক মাসে দামোদর লীলার মাহাত্ম্য

শ্রীকৃষ্ণের এই অপূর্ব বাল্যলীলাই পরিচিত ‘দামোদর লীলা’ নামে।

মানিক রায়: একদিকে মা যশোদা, অন্যদিকে ছোট্ট কানাই! হাতে দড়ি নিয়ে মা যতবারই ছেলেকে উলূখলের সঙ্গে বাঁধতে যান, ততবারই দড়ি ঠিক দু’আঙুল ছোট হয়ে যায়। আরও দড়ি আনা হয়, আগের দড়ির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়, আবার চেষ্টা চলে। কিন্তু ফল সেই একই! দড়ি কিছুতেই কৃষ্ণের কোমরে এঁটে ওঠে না। চারপাশে তখন গোপিনীদের ভিড়। কেউ অবাক, কেউ হাসিতে মশগুল। আর ছোট্ট কানাই? চোখের জলে মুখের কাজল মাখামাখি করে তিনি তখন মায়ের হাতে ধরা পড়ে আছেন!

শেষ পর্যন্ত অবশ্য মা যশোদার ভালবাসার কাছে হার মানতেই হল স্বয়ং ভগবানকে। তিনি নিজেই ধরা দিলেন মায়ের হাতে। যশোদাও পারলেন পুত্রকে উলূখলের সঙ্গে বেঁধে রাখতে। যে ভগবান সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বর, তাঁকেই কি না সামান্য দড়িতে বেঁধে ফেললেন এক মা! ভাবলে বিস্ময় জাগে, আবার এই কাহিনি শুনলে মন ভরে ওঠে আনন্দে। শ্রীকৃষ্ণের এই অপূর্ব বাল্যলীলাই পরিচিত ‘দামোদর লীলা’ নামে। কার্তিক মাসের সঙ্গে এই লীলার সম্পর্ক এতটাই নিবিড় যে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কাছে এই মাস ‘দামোদর মাস’ হিসেবে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে।

শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের দশম স্কন্ধে বর্ণিত হয়েছে এই মনোমুগ্ধকর কাহিনি। একদিন কার্তিক মাসে গোকুলের নন্দভবনে মা যশোদা দই মন্থন করে মাখন তৈরি করছিলেন। হাত তাঁর দই মন্থনের কাজে ব্যস্ত থাকলেও মন পড়েছিল আদরের পুত্র কানাইয়ের কাছে। কৃষ্ণের নানা দুষ্টুমি, মিষ্টি হাসি আর চঞ্চলতার কথা মনে করে তিনি সুর দিয়ে সেই সব কাহিনি গাইছিলেন। মাতৃস্নেহে তাঁর হৃদয় তখন পরিপূর্ণ।

এমন সময় নূপুরের রুনুঝুনু শব্দ তুলে টলমল পায়ে সেখানে এসে হাজির হল ছোট্ট কৃষ্ণ। মায়ের কাছে এসে দুধ খাওয়ার বায়না ধরল সে। যশোদা কাজ থামিয়ে পুত্রকে কোলে তুলে নিলেন। পরম স্নেহে তাকে স্তন্যপান করাতে লাগলেন। মা ও ছেলের এই স্নেহময় মুহূর্তে সংসারের অন্য সব কাজ যেন তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু উনুনে তখন দুধ গরম হচ্ছিল। হঠাৎ সে কথা মনে পড়তেই যশোদা কৃষ্ণকে কোলের থেকে নামিয়ে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরের দিকে ছুটলেন, যাতে দুধ উথলে পড়ে নষ্ট না হয়। মায়ের এই আকস্মিক চলে যাওয়া ছোট্ট কানাইয়ের মোটেই ভাল লাগল না। অভিমানে সে কাঁদতে লাগল। রাগ করে দই মন্থনের পাত্রটা ভেঙে দিয়ে সেখান থেকে ছুটে অন্য ঘরে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে যশোদা দেখলেন, দই মন্থনের পাত্র ভাঙা, অথচ পুত্র কোথাও নেই। কানাইয়ের কাণ্ড বুঝতে তাঁর দেরি হল না। ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে অন্য ঘরে গিয়ে দেখলেন, কৃষ্ণ একটা উলূখলের ওপর উঠে বসে আছেন। এক হাতে নিজে মাখন খাচ্ছেন, আর অন্য হাতে তা বিলিয়ে দিচ্ছেন বানরদের। আগের দিনের তৈরি মাখনের এই অবাধ বিতরণ দেখে যশোদার রাগ আরও বেড়ে গেল।

তিনি ছেলেকে শাসন করতে এগিয়ে যেতেই কৃষ্ণ উলূখল থেকে নেমে ছুটে পালাতে শুরু করলেন। মা ছুটছেন পেছনে, আর ছোট্ট কানাই পালাচ্ছেন এদিক-ওদিক। অবশেষে অনেক চেষ্টার পর যশোদা পুত্রকে ধরে ফেললেন। ঠিক করলেন, এবার দুষ্টুমির জন্য তাকে শাস্তি দিতেই হবে।

একটা দড়ি এনে কৃষ্ণকে উলূখলের সঙ্গে বাঁধতে গেলেন যশোদা। কিন্তু আশ্চর্য! দড়ি ঠিক দু’আঙুল ছোট। আরও দড়ি জুড়েও লাভ হল না। বারবার একই ঘটনা ঘটতে লাগল। যত দড়িই আনা হয়, ততবারই যেন দু’আঙুলের ঘাটতি থেকে যায়। যশোদা ক্লান্ত হয়ে পড়লেন, তাঁর কপালে ঘাম জমল, তবু চেষ্টা ছাড়লেন না। মায়ের এই অক্লান্ত পরিশ্রম দেখে অবশেষে শ্রীকৃষ্ণ স্বেচ্ছায় নিজেকে বাঁধতে দিলেন। এভাবেই সম্পন্ন হল দামোদর লীলা।

‘দামোদর’ নামের সঙ্গে এই বাল্যলীলার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সংস্কৃত ‘দাম’ শব্দের অর্থ দড়ি এবং ‘উদর’ অর্থ পেট বা উদর। মা যশোদা যখন দড়ি দিয়ে শ্রীকৃষ্ণের উদর উলূখলের সঙ্গে বেঁধেছিলেন, তখন থেকেই তাঁর এই লীলার সঙ্গে ‘দামোদর’ নামটা বিশেষভাবে যুক্ত হয়ে যায়।

এই কাহিনির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, অসীম শক্তির অধিকারী ভগবানও ভক্তের ভালবাসার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন। কৃষ্ণ চাইলে মুহূর্তেই নিজেকে মুক্ত করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। মায়ের স্নেহ, পরিশ্রম ও আন্তরিকতাকে মর্যাদা দিয়েই তিনি বাঁধা পড়েছিলেন। তাই এই বাঁধন কোনও পরাজয়ের চিহ্ন নয়, বরং ভক্তের প্রতি ভগবানের অপার ভালবাসা ও করুণার প্রকাশ।

কৃষ্ণের বাল্যলীলায় মাখন চুরি, গোপিনীদের অভিযোগ কিংবা মায়ের শাসনের ঘটনা বারবার ফিরে আসে। এই সব কাহিনিতে ভগবানের সঙ্গে ভক্তের সম্পর্ককে অত্যন্ত সহজ, ঘরোয়া ও আপন করে তুলে ধরা হয়েছে। দামোদর লীলা সেই ধারারই এক অনন্য উদাহরণ। এখানে ঈশ্বর দূরের কোনো ভয়ঙ্কর শক্তি নন, তিনি মায়ের আদরের সন্তান, যিনি অভিমান করেন, কাঁদেন, দুষ্টুমি করেন, আবার মায়ের স্নেহের কাছে ধরা দেন।

সনাতন ধর্মে কার্তিক মাস অত্যন্ত পবিত্র ও পুণ্যময় বলে বিবেচিত। বৈষ্ণব পরম্পরায় এই মাস ‘দামোদর মাস’ বা ‘ঊর্জাব্রত’ নামে পরিচিত। শ্রীকৃষ্ণের দামোদর রূপের আরাধনা, নামসংকীর্তন, ভক্তিমূলক পাঠ এবং প্রদীপ নিবেদনের মধ্য দিয়ে ভক্তরা এই মাস পালন করেন।

কার্তিক মাসে শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশে প্রদীপ জ্বালানোর বিশেষ প্রথা রয়েছে। বিভিন্ন বৈষ্ণব মন্দিরে এই সময় দামোদরাষ্টকম্ পাঠ ও বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, আন্তরিক ভক্তি ও নিষ্ঠার সঙ্গে ভগবানের আরাধনা করলে তাঁর কৃপা লাভ করা যায়। এই মাসে সংযম, দয়া, সেবা, নামস্মরণ ও ধর্মাচরণের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

কার্তিক মাসের মাহাত্ম্য শুধু একটা নির্দিষ্ট পুজোপদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই মাস মানুষকে নিজের আচরণ পর্যালোচনা করতে, অহঙ্কার ও বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকতে এবং জীবনের প্রতি আরও সংবেদনশীল হতে অনুপ্রাণিত করে। প্রদীপ জ্বালানোর মধ্য দিয়ে যেমন অন্ধকার দূর করে আলোর আহ্বান জানানো হয়, তেমনই ভক্তির সাধনা মানুষের মনের অন্ধকার দূর করার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

দামোদর লীলায় বারবার দড়ি দু’আঙুল ছোট হয়ে যাওয়ার ঘটনাটা বৈষ্ণব ব্যাখ্যায় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই দুই আঙুলের ঘাটতি মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং ভগবানের কৃপা, এই দুইয়ের প্রতীক। শুধু নিজের চেষ্টায় নয়, ঈশ্বরের কৃপা লাভের মধ্যে দিয়েও ভক্তি পূর্ণতা পায়।

মা যশোদার অক্লান্ত চেষ্টা ছিল মাতৃস্নেহের প্রকাশ। তিনি একবার ব্যর্থ হয়ে হাল ছাড়েননি। বারবার দড়ি জুড়েছেন, আবার চেষ্টাও করেছেন। অন্যদিকে কৃষ্ণও শেষ পর্যন্ত তাঁর ভালবাসার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছেন। এই দুইয়ের মিলনেই সম্ভব হয়েছে লীলার পরিণতি। ভক্তের আন্তরিকতা ও ভগবানের কৃপা যে পরস্পরের পরিপূরক, এই কাহিনি সেই উপলব্ধি জাগিয়ে তোলে।

এখানে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি, দামোদর লীলার মাহাত্ম্য কেবল অলৌকিক ঘটনার বিস্ময়ে নয়, তার অন্তর্নিহিত প্রেমের বার্তায়। ভগবানকে জয় করার জন্য শক্তি প্রদর্শনের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন নিষ্কলুষ ভালোবাসা, বিনয় ও আত্মনিবেদন। বৈষ্ণব ভাবধারায় এই কারণেই দামোদর লীলাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

দামোদর লীলার শিক্ষা আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও প্রাসঙ্গিক। সন্তানকে ভালবাসার পাশাপাশি তাকে শাসন করার প্রয়োজন যেমন আছে, তেমনই সম্পর্কের মধ্যে ধৈর্য, মমতা ও আন্তরিকতার গুরুত্বও অপরিসীম। যশোদার শাসনের মধ্যেও ছিল গভীর স্নেহ, আর কৃষ্ণের দুষ্টুমির আড়ালেও ছিল মায়ের সান্নিধ্য পাওয়ার আকুলতা। তাই এই কাহিনি শুধু ধর্মীয় উপাখ্যান নয়, মা ও সন্তানের চিরন্তন সম্পর্কেরও এক মধুর ছবি।

কার্তিক মাসে দামোদর লীলা স্মরণ ভক্তদের কাছে একদিকে ধর্মীয় সাধনা, অন্যদিকে প্রেম ও মমতার চর্চা। প্রদীপ নিবেদন, নামসংকীর্তন কিংবা শাস্ত্রপাঠের পাশাপাশি এই কাহিনির অন্তর্নিহিত শিক্ষাকে জীবনে ধারণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

যিনি অনন্ত, যাঁকে কোনও সীমার মধ্যে বাঁধা যায় না, তিনিই ভক্তের ভালবাসায় বাঁধা পড়েন, দামোদর লীলার এটাই সবচেয়ে মধুর উপলব্ধি। কার্তিক মাসের পবিত্র আবহে এই কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভক্তি মানে শুধু প্রার্থনা নয়, ভক্তি হল হৃদয়ের আন্তরিকতা, ভালবাসার নিবেদন এবং অহঙ্কার ছেড়ে ঈশ্বরের কাছে নিজেকে সমর্পণ করার পথ।