সুলতানা পারভিন (লেখক— বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক): এখন আমরা আর অত কাঁদি না কেউ মারা গেলে। মোবাইলে সব কিছু ডিলিট করতে করতে কারও মৃত্যুতে কষ্ট পাওয়াকেও যেন আমরা অনায়াসে ডিলিট করতে শিখে গেছি। কেউ মারা গেলে তার লাশ নষ্ট হয়ে যাওয়ার দোহাই দিয়ে আমরা যেন তাকে যত তাড়াতাড়ি পারি কাফন দাফন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। এইভাবে আমরা আসলে তাড়াতাড়ি তার নশ্বর দেহের কাফন দাফন করছি না, তাড়াতাড়ি কাফন দাফন করতে চাইছি তার মৃত্যুর সঙ্গে জুড়ে থাকা দুঃখ কষ্টকে। দুঃখকে আর আমরা যেন জিইয়ে রাখতে চাইছি না। তাকে যত তাড়াতাড়ি কাটানো যায় ততই ভাল। মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত ব্যক্তির নাম কেড়ে নিয়ে, তাকে লাশ নাম দিয়ে, উঠোনে স্নান করিয়ে কাফন পরিয়ে রেখে দিই একাকী, নির্বান্ধবভাবে জানাজার সময়ের আগে পর্যন্ত।
অন্তত সেই দিন শুধু যিনি মারা গিয়েছেন তার কথাই হোক, অন্তত তার জন্য শোকযাপন করি শুধু সেই দিনটুকু, এই ধৈর্যটাও যেন আমরা হারিয়ে ফেলছি। তাকে উঠোনো রেখে দিব্যি আমরা মেয়ের চাকরি, ছেলের বিলেত যাত্রার খোশ গল্প জুড়ে দিই। মৃত ব্যক্তি মহিলা হলে এবং তার স্বামীর বয়স যদি ষাটের নিচে হয় তা হলে তো কথাই নেই। দিব্যি শুরু হয়ে যায় তাকে কে দেখবে এবার, সেই ভাবনা। তার জন্য দুশ্চিন্তাবশত তড়িঘড়ি হয়তো সেখানেই মান্যতা পায় তার দ্বিতীয় বিবাহের সম্ভাবনা। এখন শুধু বাকি থাকে পাত্রী পছন্দ ও বিয়ের ডেট ঠিক করার ব্যাপারটা। যে মানুষটা কাল অবধি আমাদের সবটা জুড়ে ছিল, যাকে ছাড়া আমাদের এক মুহূর্তও চলতো না তার মৃত্যু যন্ত্রণাকে ভোলার এত তাগিদ আমরা কোথা থেকে পাচ্ছি, সেটা বেশ ভাবনার বিষয়।

কোনও দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে আমাদের একই রকম প্রতিক্রিয়া। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পুজোর সময় কলকাতার চোরবাগানে পুজো প্যান্ডেলে যখন এতগুলো প্রাণ অকালে ঝরে গেল, তখন আমরা সাময়িকভাবে অশ্রু ঝরালাম। তাদের পরিবারের লোকজনের জন্য খানিকক্ষণের জন্য ব্যথিত হল আমাদের হৃদয়। অথচ পরের দিনই আবার নতুন পোশাক পরে হাসতে হাসতে প্যান্ডেল হপিংয়ে দৌড়ালাম। আনন্দের খামতি কোথাও থাকল না। অর্থাৎ আমরা খুব তাড়াতাড়ি মুছে ফেলছি সবকিছুকে, সব খারাপ লাগাকে এক ঝটকায় হটিয়ে দিতে সময় লাগছে না আমাদের একটুও। তা হলে আমরা কি বড় বেশি ভুলে যেতে শিখে গেছি? অতি দ্রুত মুক্তি পেতে চাইছি সব দুঃখানুভূতি, সব খারাপ অনুভূতি থেকে! বর্তমানে ডুব দিতে গিয়ে, বর্তমানকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে অতীতকে খুব তাড়াতাড়ি কবর দিয়ে দিচ্ছি না তো? অতীত থেকেও তো শিক্ষা নেওয়ার দরকার আছে। অনুরূপ পরিস্থিতি থেকে সমাজকে বাঁচানোর পদ্ধতির অনুসন্ধানের দরকার আছে। পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে যাওয়াই কি একমাত্র উপায়?
আমরা যে সূক্ষ্ম মানবিক অনুভূতিগুলোর জন্য নিজেদের মানুষ বলি সেগুলো ক্রমশ হারাচ্ছি? এটা কি এক অর্থে সভ্যতারই দান? আসলে আমরা ক্রমশ ভোগবাদী হয়ে যাচ্ছি। সব সময় আমাদের মাথায় ঢুকে আছে ‘আমি’। আমাকে ভাল থাকতে হবে, আমাকে ভাল রাখতে হবে, অন্তত সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাকে ভাল দেখাতে হবে। তাই হয়তো শোকযন্ত্রণাকে আমরা পাত্তা দিতে চাইছি না। চাইছি যত তাড়াতাড়ি হোক পার করতে। মারা গিয়েছে যে সে যত আপনজনই হোক সে তো আর আমি নই। আমি তো মরিনি, আমি তো বেঁচে আছি। আমাকে তো ভাল থাকতে হবে। এইটা যেন কে আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে। এটার দ্বারাই আমরা যেন পরিচালিত হচ্ছি। এর দায় অনেকটাই ডিজিটাইজেশনের। সে তো চলে গেল। কিন্তু আমাকে তো ভাল থাকা অব্যাহত রাখতে হবে, অন্তত ডিজিটাল লাইফে। পরের দিন একটা কিছু পোস্ট করতে হবে, সেটা তার মৃত্যু নিয়েই হোক না কেন। কিন্তু সেখানেও তো ডিসেন্ট দেখাতে হবে, সুন্দর দেখাতে হবে, এটাই যেন মোটিভেশনের মতো নিঃশব্দে কাজ করছে আমাদের মধ্যে।
নিজেদের ভাল রাখার স্বার্থে আমরা নিজেদেরকে ধর্ম, সম্প্রদায়, জাতি, বর্ণে ভাঙতে ভাঙতে নিজেদেরকে বড় ক্ষুদ্র করে ফেলছি। আগে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য দ্বীপে চালান করা হতো। আজ আমরা যেন স্বেচ্ছায় দ্বীপ নির্বাসনে চলে যাচ্ছি। সবাইকে কাটছাঁট করে, সবাইকে বাদ দিয়ে আমরা নিজেদের ক্রমশ শুধু অনু, পরমাণু নয়, নিউট্রন, প্রোটন, ইলেকট্রনে ভেঙে ফেলছি। নিজের চারিপাশে ব্যারিকেড করে রাখছি, যাতে কেউ আমার সুখের অন্তরায় না হয়। কেউ আমায় সুখী হতে বাধা না দেয়।
ফলস্বরূপ চারিদিকে কী হচ্ছে না হচ্ছে সেটার জন্য তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দিচ্ছি ঠিকই কিন্তু বেশি ঢুকছি না তার ভেতর। যাদের ভাবনা তারা ভাবুক এই গোছের ভাবছি। সমস্তকে এড়িয়ে এড়িয়ে পাশ কাটিয়ে কাটিয়ে নিজেকে সযত্নে রাখতে চাইছি। যেন আমার ওপর কোনও আঁচ না পড়ে। অন্তত আমার ডিজিটাল লাইফে কোনও আঁচ না পড়ে।
এই অনুভূতিহীন সুখযাপন কি সত্যিই সুখযাপন? সমাজ মাধ্যমে যে রকম ভাল আছি দেখাই আমরা, সে রকম ভাল কি আমরা সত্যিই আছি? ভিতরে ভিতরে কি ক্ষয়ে যাচ্ছি না আমরা? নিজেকে ভাল রাখতে গিয়ে নিজের কবর কি নিজেই খুঁড়ছি না ! ডিজিটাল লাইফে সবার সঙ্গে ভাল থাকার প্রতিযোগিতায় লড়তে লড়তে, নিজেকে কি বড় একা, বড় নিঃসঙ্গ করে তুলছি না! এই শামুক জীবন, এই জগতের আনন্দযজ্ঞ থেকে নিজেকে আলাদা করে রেখে সত্যি কি ভাল থাকা যায়? এভাবে বাঁচা কি সত্যিই মানবিক বাঁচা! শুধু নিজের সুখই কি আমাদের কাম্য? সমাজের প্রতি কোনও দায়, কোনও দায়বদ্ধতা কি কিছুই নেই আমাদের? এভাবে বেশি দিন নিজে সুখে থাকতে পারব তো আমরা! নিজের ঘরে যখন আগুন লাগবে তখন কে বাঁচাবে আমাদের! তখন আমাদের পুড়ে মরা ছাড়া আর কোনও উপায় বেঁচে থাকবে কি? যে সমাজকে আমরা কিছুই দিলাম না, যে সমাজের ঘুণকে কীটনাশক দিয়ে মেরে না ফেলে তাকে বাড়তে দিলাম, সেই ঘুণসর্বস্ব সমাজের কাছ থেকে কিছু চাওয়া কি তখন আদৌ নৈতিক হবে?






