সম্পাদকীয়

কলকাতার রাজপথে স্থবিরতার স্বরূপ ও উত্তরণের পথ

উষ্ণ মানবিক সম্পর্কের সমান্তরালে যে বিষয়টি নগরবাসীকে প্রতিনিয়ত পীড়িত করে, তা হল রাজপথের এই অবরুদ্ধ স্থবিরতা

রাজাগোপাল ধর চক্রবর্ত্তী: কলকাতার নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক অভিধানে সবচেয়ে ক্লান্তিকর ও বেদনাদায়ক অধ্যায়টির নাম যানজট। তিলোত্তমার শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্যের বহমান ধারা এবং উষ্ণ মানবিক সম্পর্কের সমান্তরালে যে বিষয়টি নগরবাসীকে প্রতিনিয়ত পীড়িত করে, তা হল রাজপথের এই অবরুদ্ধ স্থবিরতা। সীমিত ভৌগোলিক বিস্তার, মাত্রাতিরিক্ত জনঘনত্ব এবং শতাব্দীর প্রাচীন পরিকাঠামোর জটিল গ্রন্থিতে জড়িয়ে পড়ে এই শহরের গতিশীলতা আজ গভীর সঙ্কটে নিমজ্জিত।

Kolkata Traffic Fines & Rules: List, Penalties

সঙ্কটের অন্তর্নিহিত কারণ

কলকাতার রাজপথে যানজট কোনও আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘকালের অপরিকল্পিত নগর বিন্যাসের পুঞ্জীভূত বিষাদ।

  • সংকীর্ণ সড়ক ক্ষেত্রফল- দেশের রাজধানী দিল্লির সামগ্রিক নগর আয়তনের প্রায় একুশ ভাগ কিংবা বাণিজ্য নগরী মুম্বইয়ের বারো থেকে পনেরো শতাংশ জায়গা যেখানে রাজপথের অধিকারে, সেখানে কলকাতায় মোট নগর এলাকার মাত্র ছয় শতাংশ জায়গা জুড়ে রয়েছে রাস্তা। এই নগণ্য পরিসরে যখন প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ যান চলাচল করে, তখন ধারণক্ষমতার চরম বিপর্যয় ঘটা অনিবার্য।
  • যানবাহনের বিস্ফোরণ ও বেআইনি দখল- ব্যক্তিগত চারচাকা ও মোটরবাইকের সংখ্যা উল্কার গতিতে বাড়ছে। অথচ সেই তুলনায় পরিকল্পিত গাড়ি রাখার কোনও নির্দিষ্ট স্থান নেই। ফলে রাজপথের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চলে যায় রাস্তার ধারে বেআইনি ও এলোমেলোভাবে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখার দখলে, যা সচল রাস্তাকে আরও সংকুচিত করে তোলে।
  • ফুটপাথ বেদখল ও পথচারীদের অসহায়তা- ফুটপাথ হকার ও অস্থায়ী বিপণির গ্রাসে চলে যাওয়ায় পথচারীরা বাধ্য হয়ে মূল রাস্তায় নেমে হাঁটেন। এর ফলে যানবাহনের স্বাভাবিক ছন্দ যেমন প্রতি পদে ব্যাহত হয়, তেমনই পথচারী ও চালক উভয়ের জন্যই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।
  • মিশ্র গতির সংঘাত- একই রাস্তায় দ্রুতগামী মোটরগাড়ির পাশাপাশি ধীরগতির অটো, রিকশা এবং টোটো চলাচল করায় গতিশীলতার সুষম তাল সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।
  • মিছিল ও সমাবেশ- ধর্মতলা, মৌলালি কিংবা সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের মতো প্রধান সংযোগস্থলগুলিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক মিছিলের কারণে প্রায়শই যান চলাচল অবরুদ্ধ হয়ে যায়। শহরের একটি মোড় স্তব্ধ হলে তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে দূরদূরান্তের গলিপথেও।
  • ধীরগতির নির্মাণযজ্ঞ- পাতালরেল সম্প্রসারণ এবং উড়ালপুল সংস্কারের কাজ দীর্ঘ সময় ধরে চলায় প্রধান পথগুলি কৃত্রিমভাবে সঙ্কীর্ণ হয়ে থাকে।
  • Kolkata Traffic Alert For Bengal Polls 2026: Diversions, No-Entry Zones &  Vehicle Curbs On April 28, 29 And May 4 | Republic World

নগরজীবনের ওপর বহুমাত্রিক অভিঘাত

এই রুদ্ধগতির পরিণতি কেবল সময়ের অপচয় নয়, বরং তা নগরের আত্মাকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দেয়। আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, কলকাতার একজন নিত্যযাত্রীর বছরে গড়ে প্রায় দেড়শো ঘণ্টারও বেশি অমূল্য সময় নিঃশব্দে হারিয়ে যায় কেবল সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থেকে। সকালে কাজের জায়গায় পৌঁছানোর তীব্র উদ্বেগ নাগরিকের মানসিক শান্তি ও কর্মক্ষমতা কেড়ে নেয়।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইঞ্জিন চালু রেখে দাঁড়িয়ে থাকার ফলে কোটি কোটি টাকার মহার্ঘ জ্বালানি অহেতুক ভস্মীভূত হয়, যা সাধারণ মানুষের আর্থিক ক্ষতির কারণ। একই সাথে যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়া এবং অবিরাম তীব্র হর্নের কর্কশ শব্দে শহরের বাতাস ও শান্ত পরিবেশ বিষিয়ে উঠছে। এর প্রত্যক্ষ অভিঘাতে ঘরে ঘরে বাসা বাঁধছে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, রক্তচাপের সমস্যা এবং গভীর মানসিক অবসাদ।

Kolkata has 2,448 Cars/Km – Highest in India! » Car Blog India

বিদ্যালয় ও বাণিজ্য বিতানের প্রবেশদ্বারে সঙ্কট

সাধারণ লোকালয়ের তুলনায় নামী বিদ্যালয় এবং বহুতল বাণিজ্য বিতানগুলির সামনে অচলাবস্থা বহুগুণ বেশি। বিদ্যালয়ের শুরু ও ছুটির সময়টি অত্যন্ত নির্দিষ্ট— সাধারণত আধ ঘণ্টা থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। এই স্বল্প পরিসরে শত শত ব্যক্তিগত গাড়ি, স্কুলগাড়ি ও অটো গেটের মুখে একসঙ্গে এসে জমা হয়। শহরের বহু প্রাচীন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব গাড়ি নামানোর বা তোলার চত্বর নেই। অভিভাবকরা সন্তানকে সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে মূল রাস্তার ওপরেই গাড়ি দাঁড় করিয়ে দেন, কখনও কখনও যা দ্বিগুণ বা তিনগুণ সারিতে রাস্তা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দেয়।

বাণিজ্য বিতানগুলির ক্ষেত্রে প্রবেশমুখে নিরাপত্তা পরীক্ষা ও পরিচয়পত্র নেওয়ার জটিলতায় প্রতিটি গাড়ির কিছু সময় নষ্ট হয়, যা পেছনের মূল রাজপথে দীর্ঘ গাড়ির সারি তৈরি করে। সপ্তাহান্তে বা উৎসবের মরসুমে ভেতরের জায়গা পূর্ণ হয়ে গেলে গাড়িগুলিকে বাইরে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। সেই সঙ্গে অ্যাপ-ক্যাব এবং অনলাইন খাদ্য সরবরাহকারীদের যত্রতত্র দাঁড়িয়ে থাকা এই বিশৃঙ্খলাকে চূড়ান্ত রূপ দেয়।

পুলিশি ভূমিকা

শহরের ট্রাফিক পুলিশকে একতরফাভাবে ব্যর্থ বা সফল আখ্যা দেওয়া যায় না। আইন প্রয়োগে কিছু শৈথিল্য, নো-পার্কিং এলাকায় নজরদারির অভাব, প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে নমনীয় মনোভাব এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির চেয়ে হাতে ইশারা দিয়ে সিগন্যাল ঘোরানোর সেকেলে অভ্যাসের কারণে পুলিশি ব্যর্থতা অবশ্যই চোখে পড়ে।

তবে পুলিশের ভূমিকা মূলত রোগের উপসর্গ উপশম করার মতো। মূল অসুখটি লুকিয়ে রয়েছে নগর পরিকল্পনার গোড়ায়। মাত্র ছয় শতাংশ রাস্তায় যখন ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ গাড়ি নামে, কিংবা মাত্র তিরিশ ফুট চওড়া একটি ঘিঞ্জি রাস্তায় পুরসভা যখন তিন হাজার শিক্ষার্থীর বিদ্যালয় বা বিশালাকার বাণিজ্য বিতানের অনুমতি দেয়, তখন মাঠপর্যায়ে দাঁড়িয়ে কোনও ট্রাফিক কর্মীর পক্ষেই সেই চাপ সামলানো সম্ভব নয়।

Kolkata traffic congestion | Calcutta overtakes Bengaluru to become India's  most traffic congested city in 2024: Report - Telegraph India

 

বৈশ্বিক ও জাতীয় অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা

বিশ্বের বহু মেগাসিটি উড়ালপুলের পেছনে না ছুটে বিজ্ঞানসম্মত নীতিতে যানজট নিয়ন্ত্রণ করেছে;

সিঙ্গাপুর ও টোকিও- সিঙ্গাপুর গাড়ি কেনার অধিকারের ওপর চড়া নিয়ন্ত্রণ রেখেছে এবং যানজটের সময়ে স্বয়ংক্রিয় অতিরিক্ত মাসুল চালু করেছে। টোকিওতে গাড়ি কিনতে হলে নিজস্ব গ্যারেজ থাকা বাধ্যতামূলক, রাস্তায় গাড়ি রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে তারা বিশ্বমানের ও সময়নিষ্ঠ রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।

লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপ- ব্রাজিল ও কলম্বিয়া সাধারণ রাস্তার মাঝে ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত কেবল দ্রুতগতির বাসের জন্য সংরক্ষিত লেন তৈরি করে গণপরিবহণে গতি এনেছে। প্যারিস তৈরি করেছে এমন পরিবেশ যাতে নাগরিকরা প্রয়োজনীয় সব কাজ বাড়ি থেকে পনেরো মিনিট হাঁটা বা সাইকেল চালানোর দূরত্বের মধ্যেই সারতে পারেন। দক্ষিণ কোরিয়ার সিওল শহরের মাঝখান থেকে দীর্ঘ উড়ালপুল ভেঙে ফেলে নদী ও সবুজ হাঁটার পথ উদ্ধার করে মানুষকে গণপরিবহণে ফিরিয়েছে।

ভারতের অভ্যন্তরীণ নজির- সুপরিকল্পিত গ্রিড নকশা ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে চণ্ডীগড় লেন ভাঙার প্রবণতা শূন্যে নামিয়ে এনেছে। ইন্দোর তৈরি করেছে সফল সংরক্ষিত বাস করিডর। হায়দরাবাদ শহরের বাইরে সুদীর্ঘ চক্রাকার পথ তৈরি করে পণ্যবাহী ভারী গাড়িকে মূল শহরের ভেতর ঢুকতেই দেয় না।

দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা ও নীতিগত উত্তরণ

ব্যস্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্রে অতিরিক্ত সড়ক ব্যবহারের জন্য মাসুল ধার্য করার ভাবনাটি যুক্তিযুক্ত হলেও কলকাতার মতো শহরে তা সরাসরি প্রয়োগ করলে মধ্যবিত্তের ক্ষোভ, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ক্ষতি এবং চার্জ এড়াতে পাড়ার গলিপথে গাড়ি ঢোকানোর আশঙ্কা তৈরি হবে। তাই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আগে বিকল্প পরিকাঠামো গড়ে তোলাই প্রধান শর্ত। একক নগর পরিবহণ কর্তৃপক্ষ- পুরসভা, পূর্ত দফতর, পুলিশ এবং রেলের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করতে একটিমাত্র ছাতার তলায় সমস্ত পরিবহণ পরিকল্পনা ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত করতে হবে।

সংহত গণপরিবহণ- পাতালরেল, শহরতলি রেল, বাস এবং গঙ্গার নৌ-পরিবহনকে একটি একক সাধারণ ভ্রমণ কার্ডের আওতায় আনা প্রয়োজন, যাতে নাগরিকরা স্বাচ্ছন্দ্যে মাধ্যম বদল করতে পারেন। চওড়া রাস্তায় বাসের জন্য সংরক্ষিত লেন তৈরি করা জরুরি।

SwitchON Foundation | NGO India – Solar & Renewable Energy

গাড়ি নিয়ন্ত্রণ ও পার্কিং সংস্কার- নিজস্ব নির্দিষ্ট পার্কিং ছাড়া গাড়ি কেনায় বিধিনিষেধ আনা এবং রাস্তার ধারের সস্তা পার্কিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে বহুতল আধুনিক গাড়ি রাখার স্থান গড়ে তুলতে হবে। বিদ্যালয় ও বাণিজ্যিক নীতি- বড় বিদ্যালয়গুলির জন্য নিজস্ব বাস পরিষেবা বাধ্যতামূলক করা এবং বাণিজ্যিক ছাড়পত্র দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার সড়কের ধারণক্ষমতা যাচাই করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। পথচারীবান্ধব ফুটপাথ- হকারদের নির্দিষ্ট কেনাবেচার অঞ্চলে পুনর্বাসন দিয়ে ফুটপাথ সম্পূর্ণ মুক্ত করতে হবে, যাতে মানুষ ছোটখাটো দূরত্বের জন্য গাড়ি বা রিকশার বদলে হাঁটতে বা সমতল রাস্তায় সাইকেল চালাতে উৎসাহিত হন।

নগরবিদদের একটি কথা স্মর্তব্য— যানজট কমাতে কেবল নতুন নতুন উড়ালপুল নির্মাণ আসলে স্থূলতার রোগীকে বেল্ট আলগা করার পরামর্শ দেওয়ার মতো; এতে রোগ নিরাময় হয় না, কেবল সাময়িক উপশম মেলে। একটি মহানগরের উৎকর্ষের মাপকাঠি কত বেশি মানুষ ব্যক্তিগত গাড়িতে চলছেন তা নয়, বরং ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকল নাগরিক কতটা নিশ্চিন্তে ও স্বাচ্ছন্দ্যে গণপরিবহণ এবং ফুটপাথ ব্যবহার করতে পারছেন, সেখানেই নিহিত থাকে নগরীর প্রকৃত গৌরব। কলকাতার ক্ষেত্রেও এই নীতিগত রূপান্তরই আজ বাঁচার একমাত্র উপায়।

Related Articles