বিনোদন

অনীক দত্তের মৃত্যুতে নতুন মোড়! উদ্ধার পরিচালকের সুইসাইড নোট

প্রখ্যাত এই পরিচালক দীর্ঘদিন ধরেই ফুসফুস ও স্নায়ুর নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন।

Truth of Bengal: বুধবার দুপুরে আচমকাই এক চরম দুঃসংবাদে স্তব্ধ হয়ে গেল গোটা টলিপাড়া। চলে গেলেন বাংলার বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক অনীক দত্ত। প্রথমটায় শোনা গিয়েছিল, গড়িয়াহাটের হিন্দুস্তান পার্কের চার তলার বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে গুরুতর জখম হয়েছেন তিনি। এর পর অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় তাঁকে ঢাকুরিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু এই চিলতে রোদে ভরদুপুরের হাঁসফাঁস গরমে পরিচালক কেনই বা ছাদে গিয়েছিলেন, আর কীভাবেই বা নিচে পড়ে গেলেন— তা নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন উঠছিল। এবার সেই রহস্যে এক নতুন মোড় এল। পুলিশ সূত্রে খবর, গড়িয়াহাটের ওই বাড়ি থেকে পরিচালকের একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার হয়েছে, যেখানে লেখা রয়েছে, “এই ঘটনার জন্য কেউ দায়ী নয়।” প্রাথমিকভাবে পুলিশের অনুমান এটি আত্মহত্যার ঘটনা। তবে তদন্তকারীরা হাতের লেখাটি সত্যিই পরিচালকের কিনা, তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে খতিয়ে দেখছেন।

ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহল এবং পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রখ্যাত এই পরিচালক দীর্ঘদিন ধরেই ফুসফুস ও স্নায়ুর নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। এর আগে বাড়ির মধ্যেও কয়েক বার ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি শেষ দিকে তীব্র মানসিক অবসাদও নাকি তাঁকে গ্রাস করেছিল। কাজের প্রতি অসম্ভব নিষ্ঠাবান একজন মানুষ কেন এমন চরম পথ বেছে নিলেন, তা নিয়ে সিনেমহলে তুমুল কৌতূহল ও গুঞ্জন শুরু হয়েছে। এদিকে ঘটনার খবর পেয়েই গড়িয়াহাট থানার পুলিশ এবং লালবাজারের হোমিসাইড শাখার বিশেষ আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। বাড়ির নিচে যেখানে পরিচালকের দেহটি পড়েছিল, সেখানে এখনও চাপ চাপ রক্ত জমে রয়েছে এবং সুরক্ষার স্বার্থে সেই এলাকাটি পুলিশ দড়ি দিয়ে ঘিরে রেখেছে।

অনীক দত্তর এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক প্রয়াণের খবর চাউর হতেই বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। খবর পাওয়া মাত্রই হাসপাতালে ছুটে যান টলিউডের একঝাঁক তারকা ও প্রথম সারির ব্যক্তিত্বরা। পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়, অরিন্দম শীল, কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে অভিনেতা আবির চট্টোপাধ্যায়, জীতু কমল, বিদীপ্তা ও সুদীপ্তা চক্রবর্তী— সকলেই এই ক্ষতি মেনে নিতে পারছেন না। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় অভিনেতা আবির চট্টোপাধ্যায় অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে জানান যে তিনি হাসপাতালের দিকেই রওনা দিচ্ছেন। অন্যদিকে এই খবর শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র, কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে ছিলেন না তিনিও। বর্ষীয়ান অভিনেতা বাদশা মৈত্র গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, মানুষ এবং পরিচালক— দুদিক থেকেই অনীক দত্ত ছিলেন তাঁর অত্যন্ত পছন্দের, আর এই অকাল চলে যাওয়া সিনেমা জগৎ তো বটেই, সমাজের জন্যও এক মস্ত বড় ক্ষতি।

চলচ্চিত্র পরিচালনার পাশাপাশি বামপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্য আলাদা পরিচিতি ছিল অনীক দত্তর। বামেদের কঠিন পর্বেও তিনি বরাবর বুক চিতিয়ে লাল পতাকাকে আগলে রেখেছিলেন। তাঁর প্রয়াণের খবর পেয়ে হাসপাতালে ভিড় করেন মহম্মদ সেলিম ও শতরূপ ঘোষের মতো রাজনৈতিক নেতারাও। ২০১২ সালে সম্পূর্ণ নিজস্ব ঘরানার রাজনৈতিক ও সামাজিক বিদ্রুপাত্মক সিনেমা ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ পরিচালনার মাধ্যমে রাতারাতি খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেছিলেন তিনি। ভৌতিক আবহের আড়ালে সমাজ ও সময়কে চাবুক মারার যে অভিনব ভাষা তিনি তৈরি করেছিলেন, তা বাংলা সিনেমার ইতিহাসে চিরকাল মাইলস্টোন হয়ে থাকবে। পরবর্তীকালে ‘অপরাজিত’, ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ কিংবা ‘মেঘনাদবধ রহস্য’-র মতো কালজয়ী ছবি উপহার দেওয়া এই ক্ষুরধার পরিচালকের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তাঁর এই রহস্যময় চলে যাওয়া বাংলা সংস্কৃতি জগতের এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করল।