বিপন্নতার এক সুতোয় বাঁধা আজকের ইউক্রেন, ভেনেজুয়েলা এবং গ্রিনল্যান্ড
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ ছিল মিথ্যাচারে ভরা। দ্বিতীয় মেয়াদে সেই অভ্যাসে কোনও ছেদ পড়েনি।
প্রবীর মজুমদার: ইউক্রেন, ভেনেজুয়েলা, গ্রিনল্যান্ড— তিনটি আলাদা মহাদেশে হলেও আজ একই সুতোয় বাঁধা পড়ল। বাঁধলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর পরপর মিথ্যাচার, অনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্রিক আস্ফালন আজকের বিশ্ব জুড়ে এক চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে। এরই মধ্যে অবাক করেছে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ ইউরোপের ন্যাটো গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলোর নেতৃত্বের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা ও দ্বিধা— যা বর্তমান এই সঙ্কটকে আরও গভীর করে দিচ্ছে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ ছিল মিথ্যাচারে ভরা। দ্বিতীয় মেয়াদে সেই অভ্যাসে কোনও ছেদ পড়েনি। প্রতিদিনই তিনি মার্কিন জনগণ এবং বিশ্ববাসীর কাছে সত্য বিকৃত করছেন। মিনিয়াপোলিসে প্রাণঘাতী গুলির ঘটনার পর তাঁর ঘৃণ্য প্রতিক্রিয়া আবারও দেখিয়ে দিয়েছে— জনজীবনে সত্য ও সততার প্রতি তাঁর কোনও দায়বদ্ধতা নেই। এই অবজ্ঞা শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, গভীরভাবে অনৈতিক এবং বিপজ্জনক।
আমেরিকান নাগরিকদের মতোই বিশ্বের বহু নেতা ট্রাম্পের এই দীর্ঘস্থায়ী মিথ্যাচারের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কিন্তু এই মিথ্যাকে মেনে নেওয়ার, চুপ করে থাকার বা এর বিরুদ্ধে অবস্থান না নেওয়ার মূল্য ক্রমেই বাড়ছে। ইউক্রেন, ভেনেজুয়েলা ও গ্রিনল্যান্ড— এই তিন জটিল আন্তর্জাতিক সঙ্কটে ট্রাম্পের মিথ্যা ও প্রতারণা সারা বিশ্বের কাছে দিনে দিনে উত্তেজনা বাড়িয়েই চলেছে।
প্রথমে ধরা যাক ইউক্রেনের কথা। বিগত চার বছর ধরে অচলাবস্থার মুখে পড়া এক অসহায় দেশ। এই ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সত্য-মিথ্যা আলাদা করতে না পারার অক্ষমতা ভয়াবহ ক্ষতি করছে। ট্রাম্প মিথ্যা দাবি করে বলেছিলেন, ২৪ ঘণ্টায় রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করে দেবেন। ব্যর্থ হয়ে তিনি বারবার ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার হুমকি দেন। আর পুতিন ট্রাম্পকে সামান্য তোষামোদ করে আবার বোমাবর্ষণ শুরু করেন। প্রতিবারই ট্রাম্প পিছু হটেন, আর প্রায়ই দোষ চাপান ইউক্রেনের অসহায় নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কির উপর।
গত এক পক্ষকালের মধ্যে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা রক্তাক্ত হল। গত সপ্তাহান্তের অভ্যুত্থানের আগে মিথ্যার এক ভয়াবহ স্রোত বয়ে যায়। ট্রাম্প কোনও প্রমাণ ছাড়াই দেশটির নেতা নিকোলাস মাদুরোকে ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেন। এই অভিযোগ তুলে ট্রাম্পের প্রশাসন মাদক পাচারের সন্দেহে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে ১০০ জনের বেশি মানুষকে নৌকোয় হত্যা করে কোনও সত্যতা যাচাই না করেই। ট্রাম্প আমেরিকাকে ‘যুদ্ধে আছে’ বলে ঘোষণা করে এবং এর মাধ্যমে তিনি মার্কিন কংগ্রেসের সাংবিধানিক ক্ষমতা অবৈধভাবে দখল করেন।
আসলে, ২০১৮ সালে নিকোলাস মাদুরো সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত শত্রুতা চলছে। ট্রাম্প এখন স্বীকারও করেছেন, এই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য গণতন্ত্র ফেরানো নয়; যদিও দেরিতে হলেও তিনি বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সঙ্গে বৈঠকে বসতে রাজি হয়েছেন। ট্রাম্পের লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার জনগণকে ‘উদ্ধার’ করা নয়, কিংবা আমেরিকার নিরাপত্তা নয়। লক্ষ্য একটাই—তেল। ট্রাম্প প্রকাশ্যেই, নির্মমভাবে দেশটি লুট করছেন। সঙ্গে লাতিন আমেরিকার অন্য দেশ মেক্সিকো, কিউবা ও কলম্বিয়াকেও হুমকি দিচ্ছেন।
এবার আসি গ্রিনল্যান্ডের কথায়। ট্রাম্প সম্পূর্ণ ভিত্তিহীনভাবে দাবি করেছেন, চিন ও রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ নাকি গ্রিনল্যান্ড জুড়ে ছড়িয়ে আছে আর তাই সেখানে আমেরিকার ‘নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়া দরকার। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন, কোথায় সেই জাহাজ? তিনি তো নিজেই ওই স্বশাসিত দ্বীপে গিয়েছেন। গ্রিনল্যান্ডবাসী ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে সরাসরি আজগুবি বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ডেনমার্ক স্পষ্ট করে বলেছে, তারা গ্রিনল্যান্ডে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করছে এবং সেখানে চিনা বিনিয়োগের ‘স্রোত’ যাচ্ছে বলে ট্রাম্প যে সব কথা বলছেন, তা তাঁর বানানো গল্প। জনমত সমীক্ষা বলছে, গ্রিনল্যান্ডের মানুষ ট্রাম্পের কাছে দ্বীপ বিক্রি বা আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিরোধী। তারা চায় স্বাধীনতা। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় জর্জের অধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন হয়েছিল। যে দেশ তার স্বাধীনতার ২৫০ বছর উদযাপন করছে, সে দেশের নাগরিকদের তো স্বাধীনতার মূল্য এবং আবেগ বোঝার কথা! ট্রাম্প যখন বলেন, গ্রিনল্যান্ডকে ‘নিরাপদ’ করতে চান, তখন পটভূমিতে কাজ করে এই দ্বীপভূমির বিপুল খনিজ সম্পদ লুট করা।
ইউক্রেন, ভেনেজুয়েলা এবং গ্রিনল্যান্ড— এই তিন সঙ্কটে ট্রাম্পের মিথ্যাচার ছাড়াও আর একটি বিষয় স্পষ্ট। সেটি হল ইউরোপীয় নেতাদের ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুর্বলতা ও বিভক্তি। এখন অন্তত ইউরোপের বোঝা উচিত— তাদের মিত্র হিসাবে পরিচিত ট্রাম্পকে বিশ্বাস করা যায় না, তাঁর ওপর নির্ভর করা যায় না। এখন ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে নিবিড় সহযোগিতা এবং বন্ধুত্বের আশু প্রয়োজন। আজকের এই প্রেক্ষাপটে দশ বছর আগেকার ‘ব্রেক্সিট’কে আর শুধু ভুল সিদ্ধান্ত মনে হয় না; এটি প্রায় আত্মঘাতী বলেই মনে হয়।






