সম্পাদকীয়

Bangladesh India Relations Crisis: কী হচ্ছে পড়শি বাংলাদেশে? এই দুঃসাহসের উৎস কোথায় ?

বাংলাদেশ ওসমান হাদির মৃত্যু পরবর্তী এই জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ তাঁর গরামাগরম ভারত বিদ্বেষী বক্তব্য।

সত্যগোপাল দে (লেখক— সাংবাদিক, শিশু নারী  সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং সাইকোলজিকাল কাউন্সেলর): মন ভাল নেই আমার, থাকবেই বা কী করে। বাংলাদেশে যে আমার অজস্র বন্ধু, তাদের কেউ হিন্দু, কেউ মুসলিম, দু-একজন খ্রিষ্ট ধর্মালম্বী আছেন। ধর্ম নিয়ে তাদের কোনও বাড়াবাড়ি নেই, যে যার ধর্ম পালন করেও তারা ভিন ধর্মের বন্ধুর সঙ্গে উৎসবে শুভেচ্ছা পাঠিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ এ লেখেন ইদ মোবারক, শুভ বিজয়া অথবা মেরি ক্রিসমাস। আমার মনে হয়, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ হয়ত আমার এই সব বন্ধুদের মতো। আর তাই যদি হয় তা হলে এখন কী হচ্ছে বাংলাদেশে?

বাংলাদেশ ওসমান হাদির মৃত্যু পরবর্তী এই জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ তাঁর গরামাগরম ভারত বিদ্বেষী বক্তব্য। যে বক্তব্যকে পরোক্ষে সিলমোহর দিয়ে চলেছেন মহম্মদ ইউনুস। যে তরুণ প্রজন্ম ২৪-এর অভ্যুত্থানে অগ্রবর্তী ছিলেন তারা তো বলেছিলেন তারা রাজনীতিতে আসবেন না। কিন্ত গণতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করার জন্য এই অভুত্থান ইতিমধ্যে তরুণ নেতারা অনেকেই ইউনুসের উপদেষ্টামণ্ডলীতে এসে বিতর্কিত হয়েছেন। শোনা যাচ্ছে, ওসমান হাদিও নমিনেশনন পেয়েছিলেন ঢাকা ৮ আসন থেকে। দিনকয়েক আগে বেঘোরে তাঁকে প্রাণ দিতে হল। হাদি কিন্ত ইউনুসকেও ছেড়ে দিচ্ছিলেন না। তার সমালোচনায় মুখর হচ্ছিলেন। উচ্চাকাঙ্ক্ষী ইউনুস বুঝতে পারছিলেন হয়ত আগামীতে এই কট্টরপন্থীদের জন্য তিনি তাঁর গদি টিকিয়ে রাখতে পারবেন না। টালবাহানা করে নির্বাচন বিলম্ব করতে পারবেন না। তাই সন্দেহ হয়, হাদির মৃত্যুর নেপথ্যে ইউনুসের কোনও প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ মদত থাকা কি অযৌক্তিক? এটা আমার নিছক বিশ্লেষণাত্মক সন্দেহ, ভুল হতেও পারে, তবে সত্যিটা কী তা সময় বলবে।

যে সরকারের নেই কোনও আইনগত সিদ্ধতা এবং গণতান্ত্রিক বিধিবদ্ধতা, সেই বাংলাদেশের সেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মূল কাজ ছিল নির্বাচনকে ত্বরান্বিত করা। কারণ শেখ হাসিনার নির্বাচন স্বচ্ছতা নিয়ে প্রতিবাদীরা প্রশ্ন তুলেছিলেন। নির্বাচনের বিষয়টি দেরাজে তুলে ইউনুস শেখ হাসিনার বিচারে মাতলেন। ইউনুস এখন পাকিস্তানের দোসর। ইতিহাস ভুলে গিয়ে বাংলাদেশের তথাকথিত বর্তমান সরকার চোখের সামনে সদ্যগঠিত রাজনৈতিক দল ভারতের সেভেন সিস্টার্সকে বিচ্ছিন্ন করার হুঙ্কার দিচ্ছে। মৌলবাদীরা দীপু দাসকে নৃশংস ভাবে হত্যা করেছে। সংবাদ মাধ্যমের দফতরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এতা হতে পারে এসব কি ইউনুসের ইন্টিলিজেন্স বিভাগ জানত না?

গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। এ সময়ে দেশে বিক্ষোভে শত শত মানুষের মৃত্যু হয় এবং হাজারও মানুষ আহত হন। হাসিনাকে গত মাসে ঢাকার একটি তথাকথিত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাঁর উপস্থিতি ব্যতিরেকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।

এই অন্তর্বতী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যথেষ্ট বিঘ্নিত হয়েছে। শুরু থেকেই ইউনুস এবং তার পার্ষদ্গণ ভারতের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে চলেছেন। সখ্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন পাকিস্তানের দিকে। বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি টলমলে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি তলানিতে ঠেকেছে। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশে এবার হিন্দু মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁর স্ত্রী-কে খুন করা হয়েছে। দু’জনেরই গলা কেটে খুন করে দুষ্কৃতীরা। আওয়ামি লিগের অভিযোগ, জামাত-ই-ইসলামি এই খুনের সঙ্গে যুক্ত। তবে তা নিয়ে ওই সংগঠনের কোনও বিবৃতি সামনে আসেনি। এদিকে ওই বৃদ্ধ দম্পতির মৃত্যুর কারণে হিন্দুদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

খিয়ারাপাড়া গ্রামে। যোগেশবাবু পেশায় একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। বেশ কয়েক বছর আগে অবসর নেন তিনি। তবে সমাজসেবামূলক কাজে ব্যস্ত থাকতেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি।

পুলিশ জানিয়েছে, রবিবার সকালে বাড়ির ভিতর থেকে স্বামী ও স্ত্রীর দেহ উদ্ধার হয়। সেদিন সকাল হয়ে গেলেও ঘুম থেকে উঠতে না দেখে ওই দম্পতির বাড়িতে যান প্রতিবেশীরা। তারপর তাঁরা ঘরে ঢুকে দেখেন, দুজনই গলা কাটা অবস্থায় মাটিতে পড়ে রয়েছেন। তারপরই খবর দেওয়া হয় পুলিশে। পুলিশ এসে দেহ উদ্ধার করে নিয়ে যায়। এমন দৃষ্টান্ত কিন্ত একটি নয় অগণিত।

বাংলাদেশের রাজনৈতিকে বিশ্লেষকগণ মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান নিয়ে অনেক কথা বলা শুরু করেছেন, কিন্ত তারা ভুলে গেছেন ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে মুক্তিবাহিনীকে পৌঁছে দিয়েছিলেন ভারতের বীর সেনানিরা। এর মধ্যে ভারতের বাংলাদেশকে দেওয়া স্বীকৃতি মহান মুক্তিযুদ্ধকে নতুন মাত্রা দেয়, ভারতকে অনুসরন করে ভুটান। শত্রুমুক্ত হয় বেশ কয়েকটি জেলা। এর পর মাত্র দশ দিন পর আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। মুজিবনগর সরকার ভারত সরকারের কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরপরই ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে পাকিস্তান।

ইতিহাসবিদদের মতে, ভরতের স্বীকৃতির পর থেকেই আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করে বাংলাদেশ। ভারতীয় সর্বোপরি এপার বাংলার একজন বাঙালি হিসেবে দুঃখ পাই যখন দেখি, বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতা এখন সম্ভবত স্মরণকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।  মুক্তিযুদ্ধের সময় যে দেশ তাদের সীমান্ত খুলে, মানবিক সাহায্য দিয়ে বাংলাদেশিদের জীবন বাঁচিয়েছিল; অস্ত্র, ট্রেনিং ও সামরিক সাহায্য দিয়ে ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি যুদ্ধ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাত থেকে এ দেশকে মুক্ত করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিল, আজ পাঁচ দশক পর কেন সে দেশের মানুষের মধ্যে ভারত বিরোধিতা এত প্রবল হয়ে উঠল। সেই উত্তর খোঁজার চেষ্টা জরুরি।

বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ বিশেষ করে নুতন প্রজন্ম বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে ভারতের  ভূমিকা কী ছিল তা নিয়ে একদম অবগত নয়।  শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসন হয়ত অনেক আভ্যন্তরীণ সমস্যাকে এড়িয়ে গেছে। তদারকি সরকারের একমাত্র অগ্রাধিকার হয়া উচিত ছিল গণন্তান্ত্রিক নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া। তা না করে ইউনুসের নেতৃত্বে তারা মেতে উঠলেন ভারত বৈরিতায়।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে— রাজনৈতিক বক্তব্যের দায় কোথায় গিয়ে শেষ হয় এবং কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার সীমারেখা কোথায় শুরু হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শব্দচয়ন ও রাজনৈতিক উচ্চারণ নিছক অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়; বরং তা প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বা তথাকথিত ‘সেভেন সিস্টার্স’ অঞ্চলটি কেবল ভৌগোলিকভাবে নয়, কৌশলগতভাবেও অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের রয়েছে দীর্ঘ সীমান্ত, যোগাযোগ ও জনগোষ্ঠীগত আন্তঃসম্পর্ক। সন্ত্রাস দমন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সংযোগ— এই সব ক্ষেত্রে গত এক দশকে দুই দেশের মধ্যে যে সহযোগিতার কাঠামো গড়ে উঠেছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে বিচ্ছিন্নতামূলক ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য সেই পরম্পরাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

ভারতের প্রতিক্রিয়াও কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অসমের মুখ্যমন্ত্রীর কড়া মন্তব্য এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা ইঙ্গিত দেয় যে বিষয়টিকে দিল্লি হালকাভাবে নিচ্ছে না। একইসঙ্গে ঢাকায় ও দিল্লিতে পাল্টাপাল্টি তলবের ঘটনাপ্রবাহ দুই দেশের সম্পর্কে এক ধরনের অস্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়।

ওসমান হাদির আগেকার ভারত বিদ্বেষমূলক মন্তব্য, পরে আততায়ীর হাতে মৃত্যু, দীপু দাসের হত্যা, হাসানত আবদুল্লার সেভেন সিস্টার্স নিয়ে মন্তব্য– মিলিয়ে, হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্য এসব নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেগুলি দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের সংবেদনশীল ভারসাম্যকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্তরেও স্পষ্ট অবস্থান, দায়িত্বশীল যোগাযোগ এবং পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখাই হবে সময়ের দাবি। আর বাংলাদেশ সরকারের বোঝা উচিত কে তাদের প্রকৃত বন্ধু। গণতান্ত্রিক ভারত না বিচ্ছিন্নতাবাদী, উগ্রপন্থার মদতদাতা মৌলবাদের বীক্ষণাগার পাকিস্তান?

Related Articles