রাজ্যের খবর

রবী ঠাকুরের ‘সহজ পাঠ’-এর অঞ্জনা নদী কোথায় জানেন? চন্দনী গাঁ-টি কোথায়?

Do you know where the Anjana River is in Rabi Tagore's 'Sahaj Path'? Where is Chandani Gaon?

Truth Of Bengal: সুব্রত দত্ত, নদিয়া:

“অঞ্জনা-নদী-তীরে চন্দনী গাঁয়ে
পোড়ো মন্দিরখানা গঞ্জের বাঁয়ে
জীর্ণ ফাটল-ধরা— এক কোণে তারি
অন্ধ নিয়েছে বাসা কুঞ্জবিহারী।”
– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই অঞ্জনা নদী কোথায় জানেন? চন্দনী গাঁ-টি কোথায়? সেই ঠিকানায় আজ আপনাদের নিয়ে যাব। কলকাতা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। শিয়ালদহ থেকে কৃষ্ণনগর লোকালে চলুন নামা যাক বাদকুল্লা স্টেশন। ট্রেন থেকে নেমে কিছুটা হাঁটলেই এই নদীকে আপনি দেখতে পাবেন। আর এই নদীর ধারেই সেই সময় ছিল চন্দনী গাঁ বা চন্দনদহ।

বাদকুল্লা ছোট্ট একটি মফস্বল যা নদিয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগর থেকে ১২ কি.মি দক্ষিণে অবস্থিত, এই বাদকুল্লার পূর্ব দিকে অবস্থিত চন্দন-দহ গ্রাম। আর এই চন্দন-দহ গ্রামের কোল দিয়েই অঞ্জনা নদীর প্রবাহ পথ। জনশ্রুতি অনুযায়ী ‘সহজ পাঠ’-এর এই বিখ্যাত কবিতাটিতে যে ‘অঞ্জনা’ নদীর কথা কবিগুরু বলেছেন সেই ‘অঞ্জনা’ নদী আর চন্দন-দহ’ হল এই ‘চন্দনী’ গ্রাম। অঞ্জনা নদী নদিয়ার কৃষ্ণনগরের কাছে থেকে উৎপত্তি হয়ে ধর্মদহ, বাদকুল্লা হয়ে ব্যাসপুরে চূর্নী নদীতে মিশেছে। এই অঞ্জনা-র সৌন্দর্যেই মুগ্ধ হয়ে বিশ্বকবি লিখেছিলেন; আজও আছে সেই ‘অঞ্জনা’ আর তার পাশের সেই ‘চন্দনী’ ওরফে চন্দন-দহ গ্রাম।

এখানেই নাকি বাস করতেন অন্ধ ভিখারী কুঞ্জ বিহারী। এই নদীর ধারেই চন্দনদহে ছিল সেই পোড়ো মন্দির। শোনা যায় এই নদী পথ ধরে যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যাচ্ছিলেন, তখন কিছুটা থমকে গিয়েছিলেন এখানে। তার চোখের সামনে ধরা দিয়েছিল মন্দির খানি। বড় হাট বসত এই নদীর ধারে। সাধারণ মানুষের কোলাহলে চন্দনদহ ছিল জমজমাট। নিজের চোখে সেই ছবি দেখেছিলেন কবিগুরু। পরে তার কলমে ফুটে উঠেছিল এই কবিতা। কবি লিখে ছিলেন,

“আশ্বিনে হাট বসে ভারী ধুম ক’রে,
মহাজনি নৌকায় ঘাট যায় ভ’রে;
হাঁকাহাঁকি ঠেলাঠেলি, মহা শোরগোল,
পশ্চিমি মাল্লারা বাজায় মাদোল।
বোঝা নিয়ে মন্থর চলে গোরুগাড়ি,
চাকাগুলো ক্রন্দন করে ডাক ছাড়ি।”

অঞ্জন নদী নদিয়ার অন্যতম দুই নদীর সংযোগকারী নদী হিসেবে পরিচিত ছিল। চূর্ণী এবং জলঙ্গিকে সংযোগ স্থাপন করেছিল এই নদী। বড় বড় নৌকো, বাণিজ্য তরী এই নদী পথ ধরে চলাচল করতো। জলঙ্গি নদী থেকে উৎপত্তি অঞ্জনার। সেখান থেকে হাটবোয়ালিয়া, খামার শিমুলিয়া, পাটুলি, চন্দনদহ হয়ে রানাঘাটের কাছে চূর্ণি নদীতে মিশেছে। নদিয়ার সদর শহর কৃষ্ণনগরের মধ্যে প্রায় ৭ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে অঞ্জনা। কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ীর পাশ দিয়েই এই নদী বয়ে যেত। কথিত আছে, কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় চূর্ণী আর জলঙ্গির মাঝে জলপথ হিসেবে নদীটি তৈরি করান। ১৭৭৬ সালে রেনেল সাহেবের ‘সিস্টেমেটিক সার্ভে’-তে অঞ্জনার অস্তিত্ব অনুমান করা যায়।

অঞ্জনা আজ তার প্রকৃত সৌন্দর্য হারিয়ে পরিণত হয়েছে একটা খালে। এলাকাবাসীও তাকে আর অঞ্জনা নদী’ নামে ডাকেনা, বলে অঞ্জনা খাল’। বর্ষাকাল ছাড়া জল থাকেনা তার কোলে, কচুরিপানাদের সাথে তার এখন খুব সখ্যতা, বার্ধক্যতা অঞ্জনাকে গ্রাস করেছে। আবারও ইতিহাসের একটা অধ্যায় মিলিয়ে যাবার প্রহর গুনছে। যদিও কবিগুরুর রচনা পড়লে মনে হয় এ তো আমাদেরই গ্রাম, আমাদেরই ছোট নদী, আমাদেরই আঁচলে ছেঁকে ছোট মাছ ধরা আমাদেরই সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলার কথা। কিন্তু কবিতায় বর্ণিত সেই নদী, পুকুর, পোড়ো মন্দির বাস্তবেও যদি দেখা যায় তখন আবার অন্য রকম অদ্ভুত একটা ভালোবাসায় ভরে যায় মনটা।

আবার দুঃখ হয় যখন আমাদের কল্পনায়, মননে মিশে থাকা দৃশ্য আমাদেরই অপরিকল্পিত পরিকল্পনায় সেই ভূপ্রকৃতি হারিয়ে যায়, নগরায়নের কারণে হারিয়ে যায় ছোট্টোবেলার সেই পুকুর, খাল, বিল, ছোট নদী সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলার মতো। অঞ্জনা নদীতে পলি পরে নদী নাব্যতা হারিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পুনরায় নদী খনন করে চুর্নীর কাছে যেখানে অঞ্জনা মিশেছে সেখানে একটা বাঁধ নির্মাণ করে লক গেট করলে হয়তো সারাবছর জল থাকবে, কারন বর্ষার যা জল হয় সব অঞ্জনা হয়ে চূর্ণীতে চলে যায়।

সহজ পাঠের এই কবিতা শুনলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্রোতস্বিনী একটি নদীর ছবি। কিন্তু বর্তমানে তার অবস্থা খুবই করুণ। আজ নদীটি আর নদী নেই, হয়ে গেছে সরু একটি খাল। কৃষ্ণনগরের শ্মশান কালীবাড়ির জলঙ্গী নদী থেকে উৎপত্তি এই অঞ্জনা নদীর। তারপর রাজবাড়ির সামনে দিয়ে শক্তিনগর হাসপাতালের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়ে নদী গেছে দোগাছি এলাকায়। তারপর রানাঘাটের ব্যাসপুরের কাছে চূর্ণি নদীতে মিশেছে। কোথাও মাছ চাষ বা কোথাও সবজি চাষ, কোথাওবা বাড়িঘর তৈরি হয়েছে। এইভাবেই নদী তার স্বাভাবিক বহমানতা হারিয়েছে।

Related Articles