কলকাতা

Bijon Bridge: ডাকাতের তাণ্ডব! এই সেতুর নামের পিছনে রয়েছে এক বীভৎস খুন

Bijon Bridge in Kolkata stands as a tribute to engineer Bijon Basu, who was brutally murdered while resisting a train robbery in 1974.

বিকাশ ঘোষ: শিয়ালদহ থেকে সোনারপুর, বারুইপুর, বজবজ, ডায়মন্ড হারবার, ক্যানিং, নামখানা ছুটে চলেছে ট্রেন (Bijon Bridge)। পার্ক সার্কাসের পর বালিগঞ্জ। ট্রেন বালিগঞ্জে ঢোকার মুখে পরে বিজন সেতু। অবশ্য বিজন সেতুর তলা দিয়েই ছুটে যায় ট্রেন। অন্যদিকে গড়িয়াহাট থেকে বালিগঞ্জ হয়ে কসবা যাওয়ার প্রধান রাস্তার ওপর এই বিজন সেতু। নিচে দিয়ে রেল চলেছে, ওপর দিয়ে যানবাহন। বিজন সেতুর নাম সামনে আসলেই আনন্দমার্গী হত্যাকাণ্ডের কাহিনী সামনে উঠে আসে। সেই বীভৎস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা।

বামফ্রন্টের আমলে ঘটে যাওয়া, সেই কাহিনী আজও ভোলেননি বিজন সেতুর আশপাশের ব্যবসায়ীরা ও ওই এলাকার মানুষ। তবে ‘চেনা বাংলার অজানা কথা’য় আজ অন্য কথা। সেই আনন্দমার্গীদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নয়। বিজন সেতুর নামকরণ নিয়ে আজকের লেখা। রেল লাইনের ওপর গড়ে ওঠা এই সেতুর নামকরণ কেন বিজন সেতু? এই সেতুর নামকরণ করা হয়েছিল বিজন বসুর নামে। কে ছিলেন এই বিজন বসু? এই নামকরণের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক মর্মান্তিক ঘটনার কাহিনী। কলকাতার বুকে ঘটে যাওয়া এক বীভৎস খুনের কাহিনী।

সালটা ১৯৭৪। ২আগস্ট। সন্তোষপুর থেকে শিয়ালদায় ট্রেনে চেপে ফিরছিলেন বিজন বসু। তিনি পেশায় ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার। কলকাতার শ্যামপুকুর এলাকার বাসিন্দা। বোনের সঙ্গে দেখা করতে সন্তোষপুরে গিয়েছিলেন। রাতের ট্রেনে বাড়ি ফিরছিলেন। সেই ট্রেনে হামলা চালায় এক দল ডাকাত। রেল যাত্রীদের যা কিছু ছিল সর্বস্ব লুঠ করে নেয় ডাকাত দল। ডাকাত দলের আগ্নেয়াস্ত্রের সামনে যাত্রীদের টু’শব্দটি করার উপায় ছিল না। নগদ টাকা, সোনার গয়না, ঘড়ি, মানিব্যাগ যার কাছে যা ছিল সব কেড়ে নেয় ডাকাতেরা। বালিগঞ্জে ট্রেন ঢোকার আগে থেকেই ডাকাত দলের এই তান্ডব চলতে থাকে। সমস্ত কিছু কেড়ে নিয়ে যখন সামনের স্টেশনে নেমে যাওয়ার উপক্রম করছে ডাকাত দলের সদস্যরা সেই সময় রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক যুবক। ডাকাতদের আগ্নেয়ারাতেরের সামনে নিরস্ত্র ওই যুবকের সাহসী পদক্ষেপ অনেকটাই আশ্বস্ত হতে পেরেছিলেন রেলের অন্যান্য যাত্রীরা (Bijon Bridge)।

সেই সময় ওই ডাকাত দলের সদস্যরা ট্রেনের মধ্যেই এলোপাতাড়ি কোপ মারে ওই যুবককে। বিজন বসু ক্ষতবিক্ষত হন। তার রক্তে ভেসে যেতে থাকে লোকাল ট্রেনের কামরা। একটা সময় নিথর হয়ে যায় দেহ। ডাকাতরা ট্রেনের বগি থেকে লাইনে ফেলে দেয় তাকে। পরবর্তীতে রেল পুলিশ রেললাইনের ধার থেকে উদ্ধার করে বিজন বসুর দেহ। তবে শিয়ালদায় ট্রেন পৌছালে ওই কামরার কোন যাত্রী সাহস করে পুলিশে অভিযোগ জানাতে যাননি। পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হয়তো কেউ চাননি! তবে এক সাধু সমস্ত ঘটনা জানিয়েছিলেন রেল পুলিশকে। নাম প্রভুস্বরূপ দাস। ওইদিন তিনিও ছিলেন ওই ট্রেনের যাত্রী। সমস্ত ঘটনা খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। বনগাঁ বর্ডারের কাছে হরিদাসপুরের আশ্রমে থাকেতেন তিনি। রেল পুলিশের কাছে ওইদিনের সমস্ত ঘটনা বিস্তারিত জানিয়ে তদন্তের প্রথম দাবি তুলেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে ওই দাবি আরও জোরালো হয়।

সেই সময় বিভিন্ন সংবাদপত্রে বিজন বসু হত্যাকাণ্ড নিয়ে শিরোনামে খবর প্রকাশিত হতে থাকে। ৮ থেকে ১৭ই আগস্ট কাগজের প্রথম পাতায় এই হত্যাকাণ্ডের খবর প্রকাশিত হয়। দাবি ওঠে ‘বিজন বসু মৃত্যু রহস্যের তদন্ত চাই’।
সেই সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়। বিজন বসুর অফিসের অন্যান্য সিআইটি ইঞ্জিনিয়ররা জোর দাবি তুললেন বিজন বসুর খুনের তদন্ত হোক। শিয়ালদহ রেল পুলিশের হাতে তখন এই মামলার দায়িত্বভার। উমাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় শিয়ালদা রেল পুলিশের সুপার পদে আসীন।

সেই সময় মুখে মুখে চর্চা এই খুনের ঘটনা নিয়ে। গভীর রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনা, ওই একজন সাধু ছাড়া কেউ ঘটনার কথা জানাননি পুলিশের কাছে। ফলে ট্রেন ডাকাতির ঘটনা কার্যত চাপা পড়ে রয়েছে। যাদের সর্বস্ব খোয়া গিয়েছে এমন কেউ এসে পুলিশের কাছে ঘটনা জানাননি। ফলে তদন্তের শুরুটা যথেষ্ট কঠিন ছিল পুলিশের কাছে। খুন না আত্মহত্যা এ নিয়েও চলছিল চর্চা। যখন চতুর্দিক থেকে তদন্তের জোরালো আওয়াজ উঠছে তখন কার্যত বাধ্য হয়েই সিআইডির কাঁধে গেল তদন্তভার। এই মৃত্যু রহস্যের তদন্তভার কাঁধে নিলেন তৎকালীন সিআইডির প্রধান জেসি তালুকদার। তিনি দেখা করলেন রাজ্যের মুখ্যসচিবের সঙ্গে। একদিকে সিআইডি তদন্ত অন্যদিকে রেল পুলিশ নিজেদের মতো করে তদন্ত শুরু করে (Bijon Bridge)।

সেই সময় এই এলাকা কার্যত ফাঁকা ছিল। ছিলনা জনবসতির চাপ। বিজন বসুর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রক্রিয়া চলতে লাগল। তবে সেই ভাবে মিলল না সাক্ষ্য প্রমাণ। দেখতে দেখতে কেটে গেল চারটে বছর। এর মধ্যে অনেকটাই জনসংখ্যা বেড়েছে এই এলাকায়। বেড়েছে মানুষের ব্যস্ততা। রেল ক্রসিং এর কারণে রাস্তা দুদিকে যানজট মারাত্মক আকার নেয়। রেল লাইনের ওপর তৈরি হল একটি রেল সেতু। উদ্বোধনের অপেক্ষা এই রেল সেতুটির। কি নামকরণ হবে এই রেল সেতুর? পাশেই জাদুসম্রাট পিসি সরকারের বাড়ি। তার নামেই এই রেল সেতুর নামকরণ হোক এমন দাবি তুললেন অনেকেই। তবে বিজন বসুর সেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তখনও ভোলেননি তার সহকর্মীরা। সিআইটি-র ইঞ্জিনিয়ারদের দাবি মেনেই সেতুর নামকরণ করা হল বিজন সেতু। সেতুর দুপাশের ফলকে লেখা হল সেই বীভৎস হত্যাকাণ্ডের কথা। ডাকাতদের সঙ্গে বিজন বসুর সেই সাহসী লড়াইয়ের কথা। বাংলা ও ইংরেজিতে ফলকের গায়ে সেই সাহসিকতার কাহিনী আজও জ্বলজ্বল করছে (Bijon Bridge)।

Related Articles