বাবার পরিচয়ই শেষ কথা নয়, সন্তানের পরিচয়ে মায়ের অধিকারই এখন চূড়ান্ত, রায় আদালতের
নাবালিকা সম্পূর্ণভাবে একক মায়ের তত্ত্বাবধানে বড় হচ্ছে, তার স্কুলের নথিতে মায়ের নাম ও জাত (কাস্ট) বহনের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
Truth of Bengal: একক মাতৃত্বের স্বীকৃতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল বোম্বে হাই কোর্টের ঔরঙ্গাবাদ বেঞ্চ। আদালত জানিয়ে দিল, যে নাবালিকা সম্পূর্ণভাবে একক মায়ের তত্ত্বাবধানে বড় হচ্ছে, তার স্কুলের নথিতে মায়ের নাম ও জাত (কাস্ট) বহনের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। শিশুর কল্যাণ ও সর্বোত্তম স্বার্থই এ ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে বিবেচ্য— স্পষ্ট বার্তা বিচারপতিদের। আদালত পর্যবেক্ষণ করে বলেছে, যে ব্যক্তি শিশুর জীবন থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন, তার জাতিগত পরিচয় শিক্ষাগত নথিতে বহন করতে নাবালিকাকে বাধ্য করা সামাজিক বাস্তবতা ও ন্যায্যতার পরিপন্থী। একক মাকে সন্তানের নাগরিক পরিচয়ের পূর্ণ উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া দয়া প্রদর্শন নয়, বরং সংবিধানের মূল্যবোধের প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ।
Recognising Single Mother As ‘Complete Parent’ Is Not Charity: Bombay High Court Orders Removal Of Father’s Name From Child’s School Record | @NarsiBenwal #BombayHighCourt https://t.co/Mp2gQ0fYIS
— Live Law (@LiveLawIndia) February 19, 2026
![]()
২০২৫ সালে এক ১২ বছরের কিশোরী ও তার একক মা এই মর্মে হাই কোর্টে আবেদন করেন। তাঁদের অভিযোগ, ২০২৫ সালের ২ জুন শিক্ষা আধিকারিক একটি চিঠির মাধ্যমে স্কুলের নথিতে ছাত্রীর নাম ও জাত সংশোধনের আবেদন খারিজ করে দেন। সেই সিদ্ধান্তকেই চ্যালেঞ্জ জানানো হয় আদালতে। মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়, জন্মের সময় ও প্রাথমিক নথিভুক্তির পর্যায়ে শিশুর জন্মসনদে পিতার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে স্কুলের রেকর্ডেও বহাল থাকে। কিন্তু পরবর্তীকালে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। মায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন অপরাধ সংক্রান্ত একটি ফৌজদারি মামলায় পিতার নাম জড়িয়ে পড়ার পর থেকে শিশুটি সম্পূর্ণভাবে মায়ের একক হেফাজতে রয়েছে। আবেদনকারীদের বক্তব্য ছিল, স্কুলের নথিতে পিতার নাম ও পদবি বহাল থাকা কেবল একটি তথ্যে ত্রুটি নয়; বরং তা শিশুর জন্য অপ্রয়োজনীয় সামাজিক ঝুঁকি তৈরি করছে। এমন এক সমাজে, যেখানে নামই অনেক সময় পারিবারিক ইতিহাস ও বংশপরিচয়ের নির্দেশক, সেখানে এই নথিভুক্ত পরিচয় তার বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা ও আত্মপরিচয় নির্মাণে প্রভাব ফেলতে পারে।

রাজ্য সরকার সেকেন্ডারি স্কুল কোডের উল্লেখ করে এই সংশোধনের বিরোধিতা করে জানায়, বিধি অনুযায়ী এমন পরিবর্তন সম্ভব নয়। যদিও একই সঙ্গে সরকার স্বীকার করে যে প্রশাসনিক নথি মূলত জনকল্যাণ ও শাসনকার্যের স্বার্থে তথ্য সংরক্ষণের জন্য, এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতি সত্ত্বেও পুরনো ফরম্যাটের অজুহাতে পরিচয়কে স্থায়ীভাবে আটকে রাখার উদ্দেশ্যে নয়। বিচারপতি বিভা কানকনওয়াড়ি এবং হিতেন এস ভেনেগাভকর সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ ১৪ মার্চ ২০২৪ সালের এক সরকারি সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে রায় দেয়। ওই সিদ্ধান্তে সমতা ও মর্যাদার নীতিকে ভিত্তি করে বলা হয়েছে যে, সরকারি নথি, বিশেষত স্কুল ও শিক্ষাগত কাগজপত্রে মায়ের নাম বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আদালত পর্যবেক্ষণ করে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনও নীতিগত ঘোষণা নয়; বরং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতিফলন। একটি স্কুলের নথি বহু বছর ধরে শিশুর সঙ্গে থাকে— বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অতিক্রম করে কখনও পেশাগত ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ফলে এই নথির তথ্যের সামাজিক প্রভাব অস্বীকার করা যায় না।

ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানায়, যে শিশু একমাত্র মায়ের তত্ত্বাবধানে বড় হচ্ছে, তাকে কেবল পুরনো ফরম্যাটের কারণে পিতার নাম ও পদবি বহনে বাধ্য করা যায় না। বাস্তবে যদি অভিভাবকত্ব সম্পূর্ণ মাতৃকেন্দ্রিক হয়, তবে নথিতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পিতার উপস্থিতি চাপিয়ে দেওয়া প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নয়। আদালত আরও বলে, পরিচয় অবশ্যই পিতার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে— এই ধারণা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর উত্তরাধিকার। অতীতে যেখানে বংশপরিচয়কে পুরুষের সম্পত্তি হিসেবে দেখা হত এবং নারীদের জনপরিচয়ের ক্ষেত্রে গৌণ ভাবা হত, সেই মানসিকতারই প্রতিফলন এই ধারণা। সমসাময়িক ভারতে, বিশেষত একক মাতৃত্ব ও একচ্ছত্র মাতৃত্বকালীন হেফাজতের ক্ষেত্রে, এই পূর্বধারণা নারী ও সন্তানের উপর কাঠামোগত বোঝা চাপায়। আদালত উল্লেখ করে, ভারতে স্কুলের নথিতে নাম ও জাত উল্লেখ সামাজিক ধারণা, সহপাঠীদের আচরণ, সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি এবং শিশুর নিজস্ব মানসিক পরিচয়বোধকে প্রভাবিত করতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পিতার জাত বহাল রাখা শিশুর বাস্তব সামাজিক পরিচয় বা আইনসম্মত অভিভাবকত্বের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বিশেষ পরিস্থিতিতে জাত নির্ধারণ কেবল জৈবিক উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না বলেও আদালত মন্তব্য করে।






