ট্রাম্পের হুমকি, মোদির নীরবতা: কোন দিকে যাচ্ছে ভারত?
ডোনাল্ড ট্রাম্প কখন কী করেন, কার সঙ্গে বন্ধুত্বের অবনতি হয় এবং কার সঙ্গে তাঁর নতুন করে সম্পর্ক শুরু হয়, তা সত্যিই আন্দাজ করে নেওয়া মুশকিল।
সুমন ভট্টাচার্য (বিশিষ্ট সাংবাদিক): গড়পড়তা বলিউডি ছবিও এইরকম চিত্রনাট্য লিখতে পারে না। এইরকম ‘দোস্তি’, এইরকম একইসঙ্গে উচ্চারণ, এবং তারপরে এইরকম শত্রুতা। আমি ডোনাল্ড ট্রাম্প (Trump) এবং নরেন্দ্র মোদির সম্পর্কের ওঠাপড়া নিয়েই বলছি। এটা সত্যি কথা, যে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের তথাকথিত সবচেয়ে শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট একটু খামখেয়ালি চরিত্রের। তিনি নির্বাচনের সময় তাঁর প্রিয় ‘বন্ধু’ এবং তারপরে বেশ কিছু দিন পর্যন্ত ঘনিষ্ঠ ‘সুহৃদ’ এলন মাস্কের সঙ্গে যতটা তিক্ততা তৈরি করেছেন, এটা বলা অস্বাভাবিক নয়, যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বন্ধু’ থাকা কঠিন।
[আরও পড়ুন: Indas Floods: লাগাতার বৃষ্টিতে জলবন্দী ইন্দাসের একাধিক গ্রাম, স্কুলে কমিউনিটি কিচেন চালু করল পুলিশ]
ডোনাল্ড ট্রাম্প (Trump) কখন কী করেন, কার সঙ্গে বন্ধুত্বের অবনতি হয় এবং কার সঙ্গে তাঁর নতুন করে সম্পর্ক শুরু হয়, তা সত্যিই আন্দাজ করে নেওয়া মুশকিল। এবং তার পিছনে নির্দিষ্ট কোনও রাজনৈতিক দর্শন আছে, এমনটাও কেউ দাবি করতে পারবে না। কিন্তু এলন মাস্কের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির একটা তফাৎ রয়েছে। এলন মাস্ক এখনও পর্যন্ত শুধুই ব্যবসায়ী। যদিও তিনি আমেরিকা নামে একটি রাজনৈতিক দল খুলেছেন। তার তুলনায় নরেন্দ্র মোদি পৃথিবীর দ্বিতীয় সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং প্রায় ১১ বছর ধরে তিনি ভারতবর্ষ শাসন করছেন। বাজার হিসেবেও ভারতবর্ষ খুব ছোট নয়।
সেইরকম একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে যে ভাষায় এবং যেভাবে ডোনাল্ড নিয়মিত আক্রমণ করে চলেছেন এবং ভারতবর্ষের সরকারের তরফ থেকে কোনও উত্তর দেওয়া হচ্ছে না, তা সত্যিই ভাবা যায় না। রাজনৈতিকভাবে আমি নরেন্দ্র মোদির বিরোধী হতে পারি, কিন্তু রাহুল গান্ধির মতো আমি বলতে পারব না, যে ভারতবর্ষের অর্থনীতি মৃত; বরং ভারতবর্ষের যে বিরাট অর্থনীতিকে ‘মনমোহনীয় অর্থনীতি’ দিয়ে প্রাক্তন কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী তৈরি করে গিয়েছেন, সেই অর্থনীতিকে কীভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির মুখেও টিঁকিয়ে রাখা যায়, সেটাই ভাবনার বিষয় হওয়া উচিত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প (Trump) যখন একের পর এক হুমকি দিয়ে চলেছেন, তখন নরেন্দ্র মোদি বা তাঁর মন্ত্রিসভার কেউই কোনও উত্তর দিচ্ছে না।
বরং এমনতর লক্ষণও দেখা যাচ্ছে, যে রুশ অয়েল আমদানি বন্ধ করে ভারতবর্ষ ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবির কাছে মাথা ঝোঁকাচ্ছে। এটা অন্তত ভারতের মতো বিরাট অর্থনীতির, বিরাট জনসংখ্যার একটি গণতন্ত্রের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়।
কেন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর নীতি নিয়ে আমাদের আলোচনা করতে হচ্ছে? কারণ, নরেন্দ্র মোদিকে ‘বন্ধু’, ভারতবর্ষকে ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ বলার পরেও যেভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দিয়েছেন এবং রাশিয়ার থেকে তেল আমদানির জন্য আরও জরিমানা হতে পারে বলে হুমকি দিয়েছেন, তা অভাবনীয়। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে, যাদের আমরা গোদি মিডিয়াই বলি, অর্থাৎ যাঁরা মোদিভক্ত, তাঁরা পর্যন্ত প্রশ্ন তুলেছেন, যদি নরেন্দ্র মোদির ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ‘বন্ধু’ থাকে, তাহলে শত্রুর দরকার কী? সত্যিই সে কথা।
নরেন্দ্র মোদিকে একেবারে হতবাক করে দিয়ে যেভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প (Trump) পাকিস্তানের সঙ্গে তেলের চুক্তি সেরেছে এবং ভবিষ্যতে পাকিস্তানের থেকে তেল কিনতে হবে বলে ব্যঙ্গ করেছে, তা অভাবনীয়। ভারতবর্ষে যে ধরনের সন্ত্রাসবাদী হামলার পিছনে যাঁর ভূমিকা রয়েছে বলে আমরা মনে করি, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সেই সর্বোচ্চ কর্তা আসিফ মুনিরকে হোয়াইট হাউজে ডেকে লাঞ্চ খাওয়ানো ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় আঘাত। নরেন্দ্র মোদির পিঠে ছুরি ঢুকিয়ে দেওয়ার মতোই। কিন্তু তারপরে তিনি যেভাবে প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে আঁকড়ে ধরে ভারতবর্ষকে ব্যঙ্গ করছেন, তাতে আমেরিকার বিদেশনীতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদর্শ, এই কোনও কিছু নিয়েই আর ভাবা আমাদের উচিত নয়।
অর্থাৎ, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই বা মুসলিম মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্তত মূল বিবেচ্য বিষয় নয়। এতে অবশ্যই আমাদের পুবের প্রতিবেশী দেশ ইউনুস এবং তাঁর মৌলবাদী সাঙ্গোপাঙ্গরা উৎসাহ পেতে পারে, কিন্তু যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এইরকম খামখেয়ালি নীতি নিয়ে চলেন, তিনি কতদিনই বা বাংলাদেশের সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রাখবেন বা বাংলাদেশের থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে রেয়াত করবেন, তাও বলা যাচ্ছে না। বিশেষ করে যেখানে বাংলাদেশের অর্থনীতি পোশাক রফতানির উপরই নির্ভরশীল। বাংলাদেশের কথা থাক, ভারতবর্ষের কথা ভাবা যাক। ভারতবর্ষ কোন পথে? সত্যি এই প্রশ্ন আজ আমাদের সবাইকে ভাবাচ্ছে।
কেন ভারতবর্ষ কোন পথে এই প্রশ্ন আমরা তুলছি? সিপিআইয়ের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক প্রবীণ বামপন্থী নেতা ডি. রাজা দেখলাম একটি চমৎকার ট্যুইট করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে ভারতবর্ষ, ইন্দিরা গান্ধির যে ভারতবর্ষ আমেরিকার চোখে চোখ রেখে কথা বলত এবং বাংলাদেশকে স্বাধীন করার সাহস দেখিয়েছিল, সেই ভারতবর্ষকে নিয়ে নরেন্দ্র মোদি-জয়শঙ্কররা যে এইভাবে আমেরিকার কাছে আত্মসমর্পণ করবেন এবং তারপর ‘লাথি-ঝ্যাটা’ খাবেন, তা কেউ অনুমানও করতে পারেনি।
গত কয়েক বছর ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং আমেরিকার বিদেশনীতিকে কেন্দ্র করেই ভারতবর্ষের বিদেশনীতি আবর্তিত হয়েছে। এবং সেই কারণেই ভারতবর্ষ, বা বলা ভাল নরেন্দ্র মোদির ভারতবর্ষ এতটা ইজরায়েলের দিকে ঝুঁকেছে। ইজরায়েলের দিকে ঝুঁকতে গিয়ে পশ্চিম এশিয়ায় আমাদের পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক তিক্ত হয়েছে। এমনকি ইরান, যে ইরানের থেকেও আমরা বিপুল পরিমাণে তেল কিনি এবং যে ইরানে একটি সমুদ্র বন্দর, চাবাহার আমরাই অর্থ দিয়ে তৈরি করেছি, সেই ইরানের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আসিফ মুনিরকে ডেকে হোয়াইট হাউজে মধ্যাহ্ন ভোজন করানোর পর ইরান আক্রান্ত হলে অন্তত নরেন্দ্র মোদি ফোন ঘুরিয়ে তেহরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।
তারপরে তিনি ‘ব্রিকস’-এও গিয়েছেন এবং সেখানে রাশিয়া ও চিনের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ইজরায়েল এবং আমেরিকার নীতির সমালোচনাও করেছেন। এই যে ‘ব্রিকস’-এ যাওয়া বা রাশিয়া-চিনের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বিকল্প ভাবনার কথা বলা, সেটাই কি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করে দিল? তাহলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Trump) সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত সম্পর্কই বা কী আর মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াইতে ওয়াশিংটন ও নয়া দিল্লির পাশাপাশি চলার শপথই বা কোথায় গেল? বোঝাই যাচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে খামখেয়ালি পদ্ধতিতে চলছেন, তাতে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক অন্তত সুদূরে দুর্ধর্ষ হবে, ভারত আমেরিকার উপর খুব নির্ভর করতে পারবে, এমনটা হওয়া সম্ভব নয়।
সমস্যা হচ্ছে নরেন্দ্র মোদি-জয়শঙ্কররা গত ১১ বছরে আমেরিকার উপর নির্ভরশীল হতে গিয়ে অন্য বিশ্বের সঙ্গে যে সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা ছিল, তা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছে। এটা তো সত্যি, যে আমেরিকার বাইরেও একটা বিরাট বিশ্ব আছে এবং একটা বিরাট বাজারও রয়েছে। শশী থারুর সংসদের বাইরে যে কথাটা মনে করিয়ে দিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আছে, দক্ষিণ আফ্রিকা আছে, ব্রাজিল আছে বা বলা চলে লাতিন আমেরিকার সব দেশগুলোই আছে। ফলে বাজার ধরার জন্য বা ভারতবর্ষের পণ্য রফতানির জন্য নতুন নতুন দেশ খুঁজতে অসুবিধা হুওয়ার কথা নয়। কিন্তু গত ১১ বছরে নরেন্দ্র মোদি আমেরিকা এবং ইজরায়েলের দিকে ঝুঁকতে গিয়ে আমাদের পুরোনো বন্ধু আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার দেশগুলিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে।
এখন তাঁকে যদি বিদেশনীতিকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করতে হয়, তা শুধু কঠিনই নয়, যথেষ্ট সময় সাপেক্ষ। এবং যেহেতু তিনি গত ১১ বছরে এই বাজারগুলি ধরার, এদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেননি, সেজন্য সেখানে ঢুকতেও তাঁর কষ্ট হতে পারে। কিন্তু ভারতবর্ষের দীর্ঘ ঐতিহ্য, ইন্দিরা গান্ধি থেকে অটলবিহারী বাজপেয়ী ওয়াশিংটনের বাইরে যে ‘বন্ধু’দের বৃত্ত গড়ে তুলেছিলেন, সেখানে ঘুরে বেড়ালে বা সেখানে বাজার ধরার চেষ্টা করলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এইসব হুমকিকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়া যায়। নরেন্দ্র মোদি, জয়শঙ্কর বা ভারতবর্ষের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ কি সেটা পারবেন? নির্মলা সীতারমণের দক্ষতা নিয়ে অনেকের মতোই আমারও যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। কিন্তু রাহুল গান্ধির মতো আমি ভারতবর্ষের অর্থনীতিকে ‘মৃত’ বলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘এনডোর্স’ বা সিলমোহর দিতে পারি না।
[আরও পড়ুন: The Kerala Story: জাতীয় পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক! কেরলের মুখ্যমন্ত্রীকে পাল্টা সুদীপ্ত সেনের পরামর্শ]
বরং সময়টা ভারতবর্ষের সবার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ার। অবশ্যই নরেন্দ্র মোদিকে তাঁর ভুল স্বীকার করানো এবং নরেন্দ্র মোদি জয়শঙ্করদের নতুন রাস্তা খুঁজতে বাধ্য করা। এবং নরেন্দ্র মোদি ও জয়শঙ্করদের হয় সংসদে বা বাইরে কোথাও জোড় হাতে নতমস্তকে স্বীকার করিয়ে নেওয়ার, যে তাঁদের এতদিনের বিদেশনীতি ভুল পথে চলেছে। সরকার যদি সেটা স্বীকার করে নেয়, নরেন্দ্র মোদি-জয়শঙ্কররা যদি নতমস্তকে যদি নিজেদের ভুল স্বীকার করে নতুন রাস্তায় চলতে রাজি হন, তাহলে গোটা ভারতবাসী বা আমরা সবাই তাঁদের পিছনে দাঁড়াব না কেন? দাঁড়ানোই তো উচিত। দাঁড়াব এই কারণে, যে আমেরিকার এই ঔদ্ধত্য, ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Trump) এই খামখেয়ালিপনা তো ভারতবর্ষের ১৪০ কোটি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে না। আমেরিকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর খামখেয়ালিপনা দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এবার গোটা বিশ্বকে তিনি দুরমুশ করতে চাইছেন। ভারতবর্ষ, গান্ধির ভারতবর্ষ, বুদ্ধের ভারতবর্ষ কি ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই খামখেয়ালিপনার সামনে নতজানু হবে নাকি নিজের রাস্তা নিজেরাই খুঁজে নেবে?






