SIR Hearing West Bengal: এসআইআর-শুনানিতে বয়স্কদের জন্য কি একটু মানবিক হতে পারত না কমিশন?
শুনানি পর্ব শুরু হতেই দেখা গিয়েছে, হাসপাতাল থেকে নাকে নল গোঁজা এক বৃদ্ধ এসেছেন তলব পেয়ে। শুনানিতে এসেছেন ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বাও।
জয়ন্ত চক্রবর্তী: এসআইআর শুনানিতে কাদের ডাকা হচ্ছে? এতদিন যাঁরা নির্বিঘ্নে ভোট দিয়ে এসেছেন তাঁদেরই আবার প্রমান দিতে হচ্ছে তিনি বৈধ ভোটার কিনা। কারণ, তাঁদের ২০০২ সালে দেওয়া তথ্যের মধ্যে নাকি গরমিল পাওয়া গিয়েছে। ডাক পাওয়াদের মধ্যে আছেন ‘সেনাইল’ হয়ে যাওয়া কিছু মানুষ জন। এঁরা না পারছেন বংশের ঠিকুজি কুলজি দিতে। না পারছেন এঁরা দাদু কিংবা দিদিমার নাম বলতে। নির্বাচন কমিশন এঁদেরও তলব করছে। শুনানি পর্ব শুরু হতেই দেখা গিয়েছে, হাসপাতাল থেকে নাকে নল গোঁজা এক বৃদ্ধ এসেছেন তলব পেয়ে। শুনানিতে এসেছেন ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বাও। বীরভূমের মানিক পাহাড়ির বক্তব্য, ডাক পেলে না এসে কী করবু। তাই পোয়াতি বউ নিয়েই চলে এলাম। কমিশনের দালানে যদি বৌ বিইয়ে দেয় বটেক, তা হলে ছেলে হলে নাম দিব নির্বাচন। ঠোঁটের ডগায় প্রশ্নটা এসে গেল, কিন্তু যদি মেয়ে হয়? উত্তরটাও যেন প্রশ্নের মতোই তৎপরভাবে এল— সারণি। সার থেকে সারণি। বুঝলেন স্যার?
বোঝার আর বাকি থাকলো না কিছু। স্পেশ্যাল ইনভেস্টিগেশন রিভিউ বা ‘সার’ এই মুহূর্তে গ্রাম বাংলার মানুষের মনে প্রথিত হয়ে বসে গিয়েছে। উদ্বেগে আশঙ্কায় মানুষ ছুটে আসছে শুনানিতে। তাই, মুমূর্ষু রোগী হাসপাতাল ছেড়ে হাজিরা দিচ্ছেন শুনানিতে। ওই যে কারা যেন রটিয়ে দিয়েছে যে তথ্য না মিললে দূরে একটা জেলখানায় পৌঁছে দেওয়া হবে কিংবা বাংলাদেশ পাঠিয়ে দেওয়া হবে। আরে বাবা, এখন বাংলাদেশ তো অগ্নিগর্ভ। আর সেখানে বা নতুন ঠিকানা কী হবে। সাড়া বাংলায় এখন ত্রাহি ত্রাহি রব পড়ে গিয়েছে ‘সার’ নিয়ে। নির্বাচন কমিশন নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল। আপনি আর কী করতে পারেন। আসলে পশ্চিমবঙ্গে ভোট দিচ্ছেন আটবার এমন ভোটারকেও নির্বাচন কমিশন ডেকে পাঠাচ্ছে এমুমেরেশন ফর্মে কিঞ্চিৎ অসঙ্গতি থাকলেই। কোথাও দাদু-বাবার নামে গরমিল আছে। কোথাও আবার পদবির আগে নাম পড়েছে। এরই মধ্যে আবার ভয়ের ডঙ্কা। রবীন্দ্রনাথের কাদম্বরী মরিয়া প্রমাণ করেছিল সে মরে নাই। পশ্চিমবঙ্গের জেনুইন ভোটারদের কী এবার প্রমাণ করতে হবে তিনি একদা ভোট দিয়াছিলেন!
শুনানি পর্বে কমিশন কি আর একটু মানবিক হতে পারত না? এমন নয় যে কমিশনের কাছে অজানা আছে যাদের তলব করা হচ্ছে তাদের বয়স। তা হলে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা তো বটেই অশীতিপর, নবতিপর এমনকী শতায়ুকেও ডাকা হচ্ছে শুনানিতে। অবাক লাগে, এই বৃদ্ধ বয়সে অনেকের ক্ষেত্রে বলা যায় প্রায় জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে যাঅয়া এই মানুষগুলিকে এখন নতুন করে আবার ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে দেখে। এই মানুষগুলির তথ্য সম্পর্কিত যা যা জানা প্রয়োজন, সেটা কি তার বাড়িতেই জেনে নেওয়া যেত না? তা হলে শুরুতে এই ব্যবস্থা করা হয়নি কেন? কেন তাদের চিঠি দিয়ে ডেকে পাঠানো হল, তথ্য নিয়ে শুনানিতে হাজির হওয়ার জন্য?
এসআইআর নিয়ে কোনও আপত্তি নেই। থাকার কথা নয়। কারণ এসআইআর হলেই একটা নির্ভুল ভোটার তালিকা পাওয়া সম্ভব। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার জন্য যা যা করণীয়, সেটা কি করেছেন নির্বাচন কমিশন? এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্তদের যেভাবে অত্যাধিক চাপ নিতে হয়েছে, সেটা কি কাম্য ছিল? রাজ্যেজ্য ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন বিএলও আত্মহত্যা করেছেন অথবা অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছেন। এই মৃত্যুর দায় কার? কেন এই মানুষগুলিকে এইভাবে চলে যেতে হল? একটু সময় নিয়ে ধীর-স্থির ভাবে এই প্রক্রিয়া চালালে হয়তো এতগুলো মানুষের প্রাণ যেত না। আবার অন্যদিকে শুনানিতে যেভাবে বয়স্ক মানুষদের হয়রানি করা হচ্ছে, সেটা ঠিক নয়। অত্যন্ত অমানবিক ঘটনা ঘটছে শুনানি পর্বে। হাসপাতাল থেকে কিছুক্ষণের জন্য ছাড় ছুটে যেতে হচ্ছে শুনানিতে। দাখিল করতে হচ্ছে তথ্যপ্রমাণ। শুধুমাত্র ভোটার তালিকায় নাম থাকবে কিনা এই তাগিদে মরণবাঁচন লড়াই চালাচ্ছে কিছু মানুষ। এটা কেন হবে?
রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হতে আর মাত্র কয়েকটি মাস বাকি। বিপুল জনসংখ্যার রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর পর্ব সেরে নিয়ে নির্বাচন করার লক্ষ্য নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এখানেই প্রশ্ন উঠছে, সাড়ে সাত কোটির ওপর ভোটার যে রাজ্যে, সেই রাজ্যে এত অল্প সময়ে কী করে সম্ভব এসআইআর প্রক্রিয়া? অত্যন্ত কম সময়ে জটিল এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার জন্য কমিশন যেভাবে কাজ শুরু করে, তাতে নানা বিঘ্ন আসাই স্বাভাবিক। কমিশনের এই পরিকল্পনাহীন কাজের মাসুল দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। রেহাই পাচ্ছে না কেউ। বিধানসভা নির্বাচন কবে হবে সেটা জানা কথা কমিশনের। তা হলে এই রাজ্যে যদি কেন আরও কয়েক মাস আগে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু করা হয়নি?






