অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র এবং বাংলা সাহিত্য
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অপ্রতিদ্বন্ধী জনপ্রিয়তার দরুণ তিনি হয়ে উঠেছিলেন 'অপরাজেয় কথাশিল্পী'।
রাজু পারাল: অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মতারিখ ১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। সেই হিসেবে এবছরটা তিনি সার্ধশতবর্ষ পূর্ণ করলেন। বছরভর তাই নানা পত্র-পত্রিকা, প্রকাশনা ও স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলি তাঁকে নিয়ে যে আলোচনা চক্র ও শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন সে ব্যাপারে নিশ্চিত।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অপ্রতিদ্বন্ধী জনপ্রিয়তার দরুণ তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কথাশিল্পীর প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, ‘তোমার লেখনী বাঙালির চিত্ততন্তুকে হাসি ও অশ্রুর নবতর ও গভীরতর ব্যঞ্জনায় অভিব্যক্ত করে তুলেছে।’ এই আশীবাণী মিথ্যা হওয়ার নয়; বাংলা সাহিত্যের জ্যোতি, শিখায় অমর কথাশিল্পী যে দীর্ঘায়ু সঞ্চার করেছেন, ইতিহাসই তার প্রমাণ। তাঁর লেখা গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ আজও মানুষকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত, অনুপ্রাণিত করছে প্রতিনিয়ত। বিচিত্র অভিজ্ঞতার অংশীদার হয়ে তিনি আমাদের জন্য যে সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন তা রবীন্দ্রত্তোর যুগের সূচনা ও সমৃদ্ধি বলা চলে।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত জীবন কাটিয়ে তিনি সমাজের বিচিত্র পরিবেশে বড় হয়েছেন। তাই নিজের চোখে দেখেছেন ইংরেজ ও জমিদারদের অত্যাচার, বাল্য বিবাহ, শিক্ষা বিস্তারের আন্দোলন, কথায় কথায় এক ঘরে হওয়া, অশিক্ষিত নারী-পুরুষের অন্ধকার অবস্থা। বাল্যকাল থেকে বিচিত্র অভিজ্ঞতায় পূর্ণ মানুষটির চরিতকথাও তাই বিশাল, সাহিত্যকর্মও তাই প্রচুর। শরৎচন্দ্রের কল্পনাবিলাসী মন, সাহিত্যের নানা অঙ্গনে নিষ্ফল লেখনী চালনা, শিল্পচর্চা, সঙ্গীত চর্চা অচিরেই তাঁকে বিখ্যাত করে তোলে। কিভাবে তিনি সাহিত্যের অঙ্গনে এলেন সে সম্পর্কে নিজেই বলেছেন, ‘আমার শৈশব ও যৌবন ঘোর দারিদ্রের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। অর্থের অভাবেই আমার শিক্ষা লাভের সৌভাগ্য ঘটেনি। পিতার নিকট হইতে অস্থির স্বভাব ও গভীর সাহিত্যানুরাগ ব্যতীত আমি উত্তরাধিকার সূত্রে আর কিছুই পাই নাই। পিতৃদত্ত প্রথম গুণটি আমাকে ঘর ছাড়া করেছিল, আমি অল্প বয়সে সারা ভারত ঘুরে এলাম। পিতার পান্ডিত্য ছিল অগাধ। ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা– এক কথায় সাহিত্যের সকল বিভাগেই তিনি হাত দিয়েছিলেন, কিন্তু কোনটাই শেষ করিতে পারেননি। তাঁর লেখাগুলি আজ আমার কাছে নেই, কবে কেমন করে হারিয়ে গেছে, সে কথা আজ মনে পড়ে না।— এখনও স্পষ্ট মনে আছে, ছোটবেলায় কতবার তাঁর অসমাপ্ত লেখাগুলি নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিয়েছি। কেন তিনি এগুলি শেষ ক’রে যাননি এই বলে কত দুঃখই না করেছি। অসমাপ্ত অংশগুলি হ’তে পারে ভাবতে ভাবতে আমার অনেক বিনিদ্র রজনী কেটে গেছে।’
বলাবাহুল্য, পিতৃসূত্রে প্রাপ্ত এই সম্পদকে কাজে লাগিয়েই তিনি হয়ে উঠেছিলেন অপরাজেয় কথাশিল্পী। আজ শুধু বাংলা বা ভারতবর্ষে নয়, বিশ্বসাহিত্যের দরবারে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এক বিস্ময়কর প্রতিভা।
ঘরছাড়া, দেশছাড়া শরৎচন্দ্রের মধ্যে যে সাহিত্য প্রতিভা সুপ্ত ছিল তা একদিন প্রকাশিত হয়ে পড়েছিল কুন্তলীন পুরস্কার প্রাপ্ত ‘মন্দির’ গল্পের মাধ্যমে। পরে ‘ভারতী’ পত্রিকায় তাঁর ‘বড়দিদি’ প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্যে তিনি সাদরে গৃহীত হলেন। কোন গুণে শরৎচন্দ্র বাঙালি পাঠকের কাছে এত সমাদর লাভ করেছিলেন। উত্তর খুঁজতে হলে যেতে হবে তাঁর দৃষ্টি ও চিন্তার গভীরে। সমকালীন বাঙালি সমাজের অবক্ষয়ের ঘুণ ধরা রূপটিকে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, দেখেছেন বঞ্চিত, বিত্তহীনের চূড়ান্ত দুর্দশা, শুনেছেন উৎপীড়িতা অনাদৃতা নারীর মর্মযন্ত্রণা। শরৎচন্দ্র সেই চিত্রই তুলে ধরেছেন মানুষের দরবারে, সেই নির্বাক বেদনাকেই ভাষা দিয়েছেন। তাঁর অভয়া, অন্নদাদিদি, কিরণময়ী, রমা, কমললতা-হৃদয়হীন সমাজের নিষ্ঠুর অবিচারের বলি। ‘সংসারে যারা শুধু দিলে, বিনিময়ে পেলে না কিছুই, তারাই আমাকে পাঠালে মানুষের দরবারে নালিশ জানাতে।’ এদের আচরণে, ভাষণে সমাজের যে বেদনাবিধুর চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে শরৎচন্দ্র সেই জীবন চিত্রের নিপুণ নির্মাতা।
খুব অল্প বয়স থেকেই শরৎচন্দ্র তাঁর লেখা শুরু করেন। এন্ট্রান্স পাশ করবার আগেই তিনি পাঠশালার বন্ধু কাশীনাথের নামানুসারে ‘কাশীনাথ’ গল্পটি লেখেন। এই গল্পটি সম্পর্কে শরৎচন্দ্র তাঁর বন্ধু প্রমথ ভট্টাচার্যকে লিখেছিলেন, ‘আমার ‘কাশীনাথ’-টা অতি ছোটবেলাকার লেখা। সে সময়ে ওটা তোমারও ভাল লাগত। আমারও ভাল লেগেছিল, লিখেও ছিলাম। আজ তুমিও বড় হয়েছ, আমিও। তোমারও লাগে নি, আমার তো অতি বিশ্রী লেগেছে। ধন্য সমাজপতি মহাশয়, এও প্রকাশ করেছেন।’
শরৎচন্দ্র সে সময়কার ‘যমুনা’ কাগজেও লিখেছেন অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে। ওই কাগজে তিনি বড় গল্প, ছোট প্রবন্ধ, সমালোচনা ইত্যাদি নানা বিষয়ে লিখতেন। ‘যমুনা’ কাগজের মান যাতে উন্নত হয়, সেজন্য গল্প-প্রবন্ধাদি নিজেই নির্বাচন করে দেওয়ার ভার নিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র। ‘যমুনা’ কাগজের জন্য শরৎচন্দ্র ‘নারীর লেখা’, ‘নারীর মূল্য’, ‘রামের সুমতি’ ইত্যাদি লিখেছিলেন যা প্রকাশিত হয়েছিল যমুনার বিভিন্ন সংখ্যায়। ‘রামের সুমতি’ গল্পটির মতো ‘নারীর মূল্য’ও প্রশংসা লাভ করে। পরের দিকে তিনি ‘যমুনা’য় ‘বিন্দুর ছেলে’, ‘পথ নির্দেশ’ লেখেন।
সেকালের স্বনামধন্য পত্রিকা ‘ভারতবর্ষ’ তেও শরৎচন্দ্র একাধিক লেখা লিখেছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি– বিরাজ বৌ, পণ্ডিতমশাই, আঁধারে আলো, মেজদিদি, দর্পচূর্ণ, পল্লীসমাজ, শ্রীকান্তের ভ্রমণকাহিনী… ইত্যাদি। উল্লেখ্য, ‘শ্রীকান্তের ভ্রমণকাহিনী’ই পরবর্তী সময়ে ‘শ্রীকান্ত’ তাঁর পুস্তক আকারে প্রকাশ পায়।
শরৎচন্দ্রের সবচেয়ে বৃহত্তম উপন্যাস ‘চরিত্রহীন’। যা পুস্তককারে প্রকাশিত হয়েছিল। অন্য কোনও রচনার পিছনে তিনি অতটা পরিশ্রম ও সময় নিয়োগ করেননি যতটা তিনি ওই উপন্যাসের ক্ষেত্রে করেছিলেন।
শরৎচন্দ্র মূলত ঔপন্যাসিক। তাঁর শ্রীকান্ত, গৃহদাহ, পথের দাবী, চরিত্রহীন, দেবদাস, অরক্ষণীয়া, দেনাপাওনা ইত্যাদি উপন্যাসের স্রষ্টা হিসাবে তিনি বরণীয় হয়ে আছেন। অভাগীর স্বর্গ, মহেশ, লালু প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প এবং কিছু প্রবন্ধও তিনি লিখেছেন। সাহিত্য জীবনে তিনি বিভিন্ন ছদ্ম নামে নিজের গল্প, উপন্যাস জনসমাজে তুলে ধরে ছিলেন। ১৯২৩ সালে অতুলনীয় সাহিত্যে সৃষ্টির জন্য তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পান ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’। তাছাড়া ১৯৩৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ডিলিট’ উপাধি পান।
অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের মহাপ্রয়াণের পর তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,
‘যাহার অমর স্থান প্রেমের আসনে
ক্ষতি তার ক্ষতি নয় মৃত্যুর শাসনে।
দেশের মাটি থেকে নিল যারে হরি
দেশের হৃদয় তারে রাখিয়াছে বরি।’
বাস্তবিকই, শরৎচন্দ্রের প্রয়াণে বাঙালি জাতির যে ক্ষতি হয়েছিল, তা অপূর্ণই রয়ে গেছে।
দেড়শো বছর জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধেয় কথাশিল্পীকে আমরা যেন স্মরণ করে তাঁর প্রতি যথার্থ সম্মান জানাতে পারি।




