
Truth of Bengal,রাজু পারাল: অতুলপ্রসাদের রচিত কাব্য-সঙ্গীতগুলি আজও বাংলা সাহিত্যে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। জন্মের সার্ধশতবর্ষ কয়েক বছর আগে অতিক্রান্ত হলেও জনপ্রিয় এই কবির জীবন, কর্মক্ষেত্র ও তাঁর পরিবেশ সম্পর্কে অনেকের কৌতূহল থাকাই স্বাভাবিক। অতুলপ্রসাদ শুধু সুরকার ছিলেন না, ছিলেন অসাধারণ এক কবিও।বাংলাদেশের তরুণ সম্প্রদায় যেভাবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলকে মনে রেখেছে, লোকসংগীত, ভক্তিগীতি গাইছে, সেভাবে অতুলপ্রসাদকে মনে রাখেনি।
মনে রাখতে হবে, বাংলা গানের চার স্থপতি (রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, দ্বিজেন্দ্রলাল ও রজনী কান্ত) ছাড়াও অতুলপ্রসাদ ছিলেন অন্যতম।অতুলপ্রসাদের বৈশিষ্ট্য হল তাঁর গানের সুর মূলত হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত ঘরানার, কিন্তু এর সঙ্গে আশ্চর্য দক্ষতায় কীর্তন, বাউল এবং ইউরোপিয়ান সুরের মিলন ঘটিয়েছিলেন তিনি। হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চায় মেতে উঠার কারণেই লখনউ শহরে বসবাস শুরু করেছিলেন তিনি।
যদিও তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল লখনউতে আইনজীবী হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া। বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে অতুলপ্রসাদ কলকাতায় এসে আইন ব্যবসা শুরুরসঙ্গেসঙ্গেসাহিত্য-আলোচনা, সঙ্গীতচর্চা শুরু করেছিলেন। এই সময়েই আলাপ হয়েছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন সরলা দেবী। সেই আলাপ বন্ধুত্বে মোড় নিয়েছিল যখন অতুলপ্রসাদ ‘খামখেয়ালি’ নামে কবিগুরু প্রতিষ্ঠিত একটি সাহিত্য-সঙ্গীত সভার সদস্য হন।
ওই সভার সদস্যরা ছিলেনজ্ঞানেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, লোকেন পালিত প্রমুখ। এই সভার বাঁধাধরা কোনও নিয়ম ছিল না। কবিতা, গান, হাস্যরস, গল্প এইসব নিয়ে নির্মল আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি করাই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। ওই সভাতেই কবি এবং গায়ক অতুলপ্রসাদের পরিচয় পেলেন কবিগুরু। মুগ্ধ হয়ে ডাকলেন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে।
অন্তরঙ্গ চায়ের আড্ডায় সেখানে মিলন হল দুই কবি ও সঙ্গীত সাধকের। রবীন্দ্রনাথের ওপর তাঁর ছিল প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। তাই রবীন্দ্রনাথের ডাকে সাড়া দিতেন সবসময়েই। ১৯২৩ সালে কাশীতে যে ‘উত্তর ভারতীয় বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলন’ হয়েছিল তাতে রবীন্দ্রনাথের ডাকে লখনউ ছুটে গিয়েছিলেন অতুলপ্রসাদ। একসময়ে রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির কথা শুনে অতুলপ্রসাদ উত্তর ভারতের বঙ্গীয় সম্মেলনে গেয়েছিলেন অপূর্ব সেই গান,’মোদের গরব মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা।
‘ কবিগুরুর সঙ্গে আজীবন অতুলপ্রসাদের সম্পর্ক ছিল। মাঝে মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ আসতেন লখনউতে আর অতুলপ্রসাদও যেতেন শান্তিনিকেতনে।অতুলপ্রসাদের গানে কবিত্ব ও সঙ্গীতের সুন্দর সহাবস্থান দেখা যায়। সেখানে ভারী ভারী কথার উল্লেখ নেই, আছে সহজ কবিত্বের ছোঁয়া।
‘মেঘেরা দল বেঁধে যায় কোন দেশে,
ও আকাশ, বল আমারে!
তারা কেউ বা রঙিন ওড়না গায়ে,
কেউ বা সাদা, কেউ নীল বেশে,
ও আকাশ, বল আমারে।’
অন্যদিকে বাংলা ভাষার গজল রচনার পথিকৃৎ অতুলপ্রসাদ। ‘কে গো তুমিবিরহিনী’, ‘কত গান তো হল গাওয়’ এই গানগুলি উল্লেখযোগ্য। অতুলপ্রসাদের কলম থেকেই বেরিয়েছিল, ‘পরের শিকল ভাঙিস পরে, নিজের নিগড় ভাঙ রে ভাই… সার ত্যজিয়ে খোসার বড়াই! তাই মন্দির মসজিদে লড়াই।
প্রবেশ করে দেখ রে দু’ভাই- ন্দরে যে একজনাই।’ পরাধীন ভারতের যে গানগুলি শুনলে দেশের মানুষের চকচকে চোখ আর দৃঢ়বদ্ধ মুষ্ঠির কথা মনে পড়ে, তার অনেকগুলির রচয়িতার নাম অতুলপ্রসাদ সেন। যেমন, ‘উঠ গো ভারতলক্ষ্মী, উঠ আদি জগৎজনপুজ্যা / দুঃখ-দৈন্য সব নাশি, কর দূরিত ভারতলজ্জা’, ‘হও ধরমেতে ধীর, হও করমেতে বীর,’ ‘বলো বলো বলো সবে, শত-বীনা-বেনু-রবে ইত্যাদি। অমায়িক মানুষটি সবার কাছে ছিলেন সমান জনপ্রিয়। নিজের জীবনে যা অর্থ উপার্জন করেছিলেন তা থেকে সাধ্যমতো দানও করেছেন বিভিন্নজায়গায়। অতুলপ্রসাদ ২৬ আগস্ট ১৯৩৪ সালে অমৃতলোকে যাত্রা করেন।






