সম্পাদকীয়

Museum History: ইতিহাসের পাতায় লুকিয়ে থাকা সভ্যতার সংরক্ষক— কীভাবে গড়ে উঠল জাদুঘরের ধারণা?

বাংলায় 'জাদুঘর' শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হল 'মিউজিয়াম'। 'মিউজিয়াম' শব্দটির মুখ্য উৎস প্রাচীন গ্রিক শব্দ 'মউসিয়ন',

রাজু পারাল: জাদুঘরের আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকে অজানা অতীতের ইতিহাস। এক-একটা জাদুঘর দর্শকদের নিয়ে যায় বাস্তবের মধ্যে লুকিয়ে থাকা রূপকথার জগতে। জাদুঘরের নিদর্শনে লুকিয়ে থাকে সভ্যতার হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সংগ্রামের চিহ্ন। জাদুঘর বা সংগ্রহশালা সম্বন্ধে মানুষের আগ্রহ চিরকালের। অতীতকালের নানা ঐতিহাসিক উপাদান সংরক্ষিত থাকলে সেগুলি বর্তমান সময়েও আমরা দেখতে পাই। আর এই কাজটা সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করে জাদুঘর। মানব সমাজের হারিয়ে যাওয়া অতীতকে প্রাণবন্ত করে তোলে জাদুঘর। মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, শিক্ষাপ্রদান, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি এবং শান্তি বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম জাদুঘর। আন্তর্জাতিক জাদুঘর কাউন্সিল প্রতি বছর তাই ১৮ মে দিনটিতে ‘আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস’ পালন করে থাকে। ১৯৭৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত দিবসটি পালন হয়ে আসছে (Museum History)।

বাংলায় ‘জাদুঘর’ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হল ‘মিউজিয়াম’। ‘মিউজিয়াম’ শব্দটির মুখ্য উৎস প্রাচীন গ্রিক শব্দ ‘মউসিয়ন’, যার অর্থ হল গ্রিক পুরানের শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক মিউসদের মন্দির। এই ধরনের মন্দিরগুলিকে কেন্দ্র করে প্রাচীন শিল্পকলা ইত্যদির সংগ্রহশালা গড়ে উঠত। প্রাচীনকালে মেসোপটেমিয়া, এথেন্স, আলেকজান্দ্রিয়ায় জাদুঘরের অস্তিত্ব ছিল বলে জানা যায়। বর্তমানেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য জাদুঘরের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক মিউজিয়াম কাউন্সিল এক তথ্যে জানিয়েছিল, বিশ্বের ২০২টি দেশে ৫৫ হাজারের বেশি জাদুঘর রয়েছে। অতীতে অভিজাত শ্রেণির লোকেদের ব্যক্তিগত, পরিবারিক বা কোনও প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে জাদুঘরগুলি গড়ে উঠত। তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিভিন্ন দুর্লভ সামগ্রী, কৌতূহলদ্দীপক প্রাকৃতিক বস্তু, মানুষের সৃষ্ট কিছু সামগ্রী প্রাচীন জাদুঘরগুলিতে স্থান পেত।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রাচীন জাদুঘরগুলি একসময় সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হলেও সেখানে প্রবেশের যথেষ্ট সুবিধা ভোগ করত উচ্চ ও মধ্যবর্তী শ্রেণির মানুষ। বাকিদের কাছে জাদুঘরে প্রবেশ করা ছিল যথেষ্ট কঠিন। উদাহরণস্বরূপ, লন্ডনের ‘ব্রিটিশ মিউজিয়ামে’র কথা বলা যায়। ওই মিউজিয়ামে প্রবেশের জন্য দর্শনার্থীদের লিখিত আবেদনের ভিত্তিতে অনুমতি পেতে অন্তত দু’সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হতো। তবে সেই সব জটিল প্রক্রিয়া এখন আর নেই। বর্তমানে বিশ্বের সমস্ত জাদুঘরগুলিতেই টিকিট কেটে প্রবেশ করার অগাধ অনুমতি পাওয়া যায় (Museum History)।

‘জাদুঘর’ বা ‘মিউজিয়ামে’র প্রসঙ্গ উঠলেই কলকাতা মিউজিয়ামের কথা এসে যায়। ‘ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম অ্যাক্ট’ গঠিত হলে কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটির মূল্যবান সংগ্রহগুলি (পুঁথি, মুদ্রা, বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান, শিল্পদ্রব্য ইত্যাদি) প্রদর্শনের জন্য একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়। সংগ্রহশালা নির্মাণের জন্য জায়গা নির্বাচন করা হয় কলকাতার প্রাণকেন্দ্র জওহরলাল নেহরু রোড ও সদর স্ট্রিটের জংশনে (আজকের চৌরঙ্গি রোড)। সুবিশাল এই ভবনটিই ‘ভারতীয় জাদুঘর’ নামে পরিচিত। এই ভবনটির গাম্ভীর্য বহুকাল ধরেই মানুষের মনকে এক জাদুকরি স্পর্শে আকর্ষণ করে আসছে। কেবল বাড়ির বাইরের শোভাই নয়, ভিতরের প্রতিটি ঘরের জীবন্ত ইতিহাস দেখতে দেখতে দর্শনার্থীরা বিচিত্র অনুভূতির মুখোমুখি হয়। কলকাতার এই জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮১৪ সালের ২ ফ্রেবুয়ারি। প্রতিষ্ঠাতা কিউরেটর ছিলেন ডেনিস উদ্ভিদবিদ ন্যাথানিয়েল ওয়ালিচ। পূর্বে এই মিউজিয়াম ‘এশিয়াটিক সোসাইটি মিউজিয়াম’ পরে ‘ইম্পিরিয়াল মিউজিয়াম’ এবং আরও পরে ‘ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৮৭৮ সালে জনসাধারণের জন্য কলকাতার এই মিউজিয়ামটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তার পর থেকেই শুরু হয় জাদুঘরের যাত্রাপথ। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, পৃথিবীর ৯টি সেরা জাদুঘরের মধ্যে অন্যতম এই ‘ভারতীয় জাদুঘর’। কী নেই এখানে? পুরাতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, প্রাণিতত্ত্ব, উদ্ভিদবিদ্যা, ললিতকলা, কারুশিল্প ইত্যাদি বিভিন্ন বিভাগের অমূল্য সম্ভার সংগৃহীত হয়েছে এই জাদুঘরে। একটি আলাদা কক্ষে (মিশর গ্যালারি) সংরক্ষিত আছে চার হাজার বছরের পুরনো মমি। যা এখানকার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। ১৮৮২ সালে মমিটি কলকাতায় আসে। এক ব্রিটিশ অফিসার এই মিশরীয় মমিটি ১৮৪৫ সালে ‘এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল’কে উপহার দিয়েছিলেন যা ১৮৮২ সালে ভারতীয় জাদুঘরে স্থানান্তরিত করা হয়।

তবে কলকাতার ভারতীয় মিউজিয়াম ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উল্লেখযোগ্য সব মিউজিয়ামের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশ মিউজিয়াম, ভাটিক্যান মিউজিয়াম, লুভ্যর মিউজিয়াম, হারমিটেজ মিউজিয়াম, চার্লসটন মিউজিয়াম, উফফিজি গ্যালারি, দ্য ফিল্ড মিউজিয়াম, দ্য ক্লিভল্যান্ড মিউজিয়াম ইত্যাদির কথা বলা যায় (Museum History)।

উনবিংশ শতকের শেষ থেকে শুরু করে বিংশ শতকের প্রথমভাগ পর্যন্ত সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ব্যাপক উদ্যোগ দেখা দেয় এবং বহু নতুন নতুন জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই জন্য এই যুগকে ‘জাদুঘরের যুগ’ বলা হয়। এই কালপর্বে আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বহু নতুন নতুন জাদুঘর নির্মিত হয়। ১৭৯৩ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে বিশ্বের বৃহত্তম জাদুঘর ‘লুভ্যর মিউজিয়াম’ নির্মিত হয়। এখানেই শোভা পাচ্ছে লিওনার্দো দ্য ভ্রিঞ্চি’র আঁকা ‘মোনালিসা’ নামক বিখ্যাত শিল্পকর্মটি। হাজার হাজার বছরের পুরনো ইতিহাসের জগতে ফিরে যেতে হলে জাদুঘরে আসতেই হবে সকলকে। সে সাধারণ মানুষ হোক বা কোনও গবেষক।

Related Articles