সম্পাদকীয়

শিশুসাহিত্যের পথপ্রদর্শক প্রমদাচরণ সেন

শিশু সাহিত্যে তাঁর এরূপ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে তুলনাহীন।

রাজু পারাল: তাঁর জীবনটাই ছিল বিস্ময়ে পূর্ণ। ছোটদের তিনি ভীষণ ভালবাসতেন। ছোটদের কথা ভেবে একটি পত্রিকা প্রকাশ করার ইচ্ছা তাঁর বরাবরের স্বপ্ন ছিল। সেটা করতে গিয়ে প্রমদাচরণ (Promodacharan Sen) নিজের জীবনকে তিলে তিলে শেষ করে ফেলেছিলেন। শিশু সাহিত্যে তাঁর এরূপ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে তুলনাহীন।

ছোটদের প্রতি অমলিন ভালবাসা থেকেই তিনি প্রকাশ করেছিলেন ‘সখা’ পত্রিকা। যা বাংলা শিশু সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। তবে এই পত্রিকা বের করতে গিয়ে তাঁকে অনেক কষ্ট স্বীকার হয়েছে। পত্রিকা বের করার সদিচ্ছা নিয়ে ধনী বন্ধুদের কাছ থেকে কিছু টাকা ধারের প্রস্তাব নিয়ে গেলেও তারা তাঁকে টাকা দেননি। উল্টে তাঁকে অপমান করেছেন। নিরাশ হলেও হতাশ হননি প্রমদাচরণ। যা ভেবেছেন তা তিনি একদিন করবেনই। দৃঢ়চেতা প্রমদাচরণ কম খেয়ে, না-খেয়ে পত্রিকা প্রকাশের জন্য টাকা সঞ্চয় করেছিলেন সেই সময়ে।

কথিত আছে, সে সময়ে তিনি কেবল দু’বেলা দু’মুঠো ডাল-ভাত খেতেন। আর কোনও খাবার ছুঁতেন না। এভাবে শরীরকে কষ্ট দিয়ে তিনি বেশিদিন সুস্থ থাকতে পারেননি। একসময় শরীরের দুর্বলতা দেখা যায়, চেহারা ভেঙে যায়। কিন্তু সেদিকে তাঁর ভ্রুক্ষেপ ছিল না। তিনি তখন বিভোর ছিলেন পত্রিকা প্রকাশের স্বপ্নে। শেষপর্যন্ত নিজের সম্পাদনায় প্রকাশ করেছিলেন ‘সখা’ পত্রিকা (১৮৮৩)।

‘সখা’ পত্রিকা প্রকাশের পর প্রমদাচরণ তৃপ্তির হাসি হেসেছিলেন এই ভেবে যে তাঁর কষ্ট বৃথা যায়নি। বলাবাহুল্য, সে সময়ে পত্রিকাটি শিশুদের মনে দারুণ প্রভাব ফেলে। প্রথম দিকে গ্রাহক ছিল ছয়শো, পরে তা হাজার ছাড়ায়। তবে আড়াই বছর মাত্র সম্পাদনা করার সুযোগ পেয়েছিলেন বইটি। ততদিনে ক্ষয়রোগ বাসা বেঁধেছে তাঁর শরীরে। মাত্র সাতাশ বছর বয়সেই নিভে যায় তাঁর জীবনদীপ। প্রমদাচরণের অবর্তমানে সাময়িকভাবে ‘সখা’ পত্রিকার সম্পাদনা করেছিলেন তাঁর শিক্ষক শিবনাথ শাস্ত্রী। পরে এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন অন্নদাচরণ সেন ও নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য।

শিশু সাহিত্যিক প্রমদাচরণ (Promodacharan Sen) জন্ম নেন অবিভক্ত বাংলার খুলনার সেনহাটিতে, ১৮৫৯ সালের ১৮ মে। বাবা তারিণীচরণ পেশায় ছিলেন কলকাতার এন্টালি থানার দারোগা। সাত বছর বয়সেই মা-কে হারান প্রমদাচরণ। গ্রামের পাঠশালায় শিক্ষাজীবন শুরু করেন প্রমদাচরণ। ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ছাত্র বৃত্তি পেয়ে গ্রামের স্কুল থেকে একসময় কলকাতায় আসেন পড়াশোনা করতে।

বাবা তারিণীচরণ চাইতেন ছেলে সুশিক্ষিত হোক। তাই তিনি প্রমদাচরণকে ভর্তি করে দেন হেয়ার স্কুলে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে পুরো স্কুলেই প্রমদাচরণের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তিনি ভাল বক্তৃতা দিতেন এবং প্রায়ই তাঁর উদ্যোগে আলোচনাসভা বসতো। মুখ্য বক্তা হতেন প্রমদাচরণ। সমবেত সকলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতেন তাঁর কথা। প্রমদাচরণের প্রেরণায় ছাত্ররা নানা গঠনমূলক কাজেও অংশগ্রহণ করতেন নানা সময়ে।

কলকাতার হেয়ার স্কুল ছিল প্রমদাচরণের (Promodacharan Sen) মানসিক বিকাশের একটি বড় ধাপ। কারণ শিবনাথ শাস্ত্রীর মতো পণ্ডিত ব্যক্তি এবং ব্রাহ্ম সমাজের একজন প্রভাবশালী ব্যাক্তিত্বকে তিনি পেয়েছিলেন শিক্ষক হিসেবে। শিবনাথ শাস্ত্রীও তাঁর এই প্রিয় ছাত্রটিকে অসম্ভব ভালবাসতেন, স্নেহ করতেন। প্রমদাচরণের সংক্ষিপ্ত কর্মজীবনের বহু অধ্যায়ে গুরু-শিষ্যের এই সম্পর্কের আভাস পাওয়া যায়।

শিবনাথ শাস্ত্রীর লেখা ‘আত্মচরিতে’ মেলে সেই সব কথা। তিনি লিখেছেন, ‘…প্রমদা হেয়ার স্কুলে আমার কাছে পড়িত এবং সে সময়ে আমি ছাত্র দিগকে লইয়া যে সমস্ত সভা-সমিতি করিতাম তাহাতে উপস্থিত থাকিত। সেই সময় হইতে সে আমাকে পিতার ন্যায় ভালবাসিত এবং সর্ববিষয়ে আমার অনুসরণ করিত। ধর্মপুত্র কথাটি যদি কাহারও প্রতি খাটা উচিত হয়, তাহা হইলে বলা যায় যে প্রমদা আমার ধর্মপুত্র ছিল। ইহার পরে সে ব্রাহ্মসমাজে প্রবিষ্ট হয় এবং আমার বাড়ির ছেলের মতো হয়।’

হিন্দু বংশের ছেলে হয়ে ব্রাহ্ম হওয়ায় পিতা তারিণীচরণ মেনে নিলেন না। ছেলে প্রমদাচরণকে তাই বাড়ি থেকে বিতাড়িত করলেন। সেই সময়ে তিনি সিটি কলেজিয়েট স্কুলে চাকরি পান। মাইনে পেতেন ছাব্বিশ টাকা। সে সময়ে ওই টাকাই ছিল অনেক। পরিবারিক দায়দায়িত্ব ছিল না। মাইনের কিছুটা ব্যয় করতেন দান-ধ্যানে, ছাত্র কল্যাণে। ছোটদের নিয়েই সে সময়টায় বেশিরভাগ সময় কাটাতেন প্রমদাচরণ।

সিটি কলেজিয়েট স্কুলেই প্রমদাচরণ সে সময়ে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘নীতি বিদ্যালয়’। তাঁর শিক্ষক পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী প্রায়ই আসতেন এই নীতি বিদ্যালয়ে। তিনি নানা উপদেশ-পরামর্শ দিতেন। নীতি বিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিয়ে প্রমদাচরণ একবার বেড়াতে গিয়েই পত্রিকা প্রকাশের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন ছাত্রদের। পরে সেই ইচ্ছাই বাস্তবে পরিণত করেন তিনি। অনেক বাধা বিপত্তির মধ্যেও তিনি প্রকাশ করলেন ‘সখা’ পত্রিকা। তাঁর ত্যাগ, কষ্ট স্বীকার বৃথা যায়নি শেষপর্যন্ত।

ছোটদের প্রতি প্রমদাচরণের সুগভীর ভালবাসা, নিষ্ঠার সঙ্গে পত্রিকা সম্পাদনা, শিশু সাহিত্যের জন্য তাঁর আত্ম-নিবেদন শিবনাথ শাস্ত্রীকে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছিল। সেকথা শিবনাথ শাস্ত্রীর রচনায় ফুটে ওঠে সখা’য় মুদ্রিত একটি রচনায়। তিনি লিখেছেন, ‘সখার যাহাতে ভালো হয়, ইহা পড়িয়া যাহাতে তোমাদের উপকার হয়, যাহাতে তোমরা আমোদ ও উপদেশ পাও সে জন্য উনি সারা মাস ভাবিতেন। এই সখার জন্য উনি কি খাটুনি খাটিয়াছেন তাহা তোমরা জানো না। দেশ-বিদেশ হইতে ভালো ভালো বই আনাইয়াছেন, ভালো ভালো ছবি সংগ্রহ করিয়াছেন, কত বই পড়িয়াছেন, সে পরিশ্রম কেহ দেখে নাই। এত যে খাটিতেন কেবল এই জন্য যে দেশের বালক-বালিকাদের পড়িয়া উপকার হইবে।’

ছোটদের মনের মতো করে সখা’র প্রত্যেকটা সংখ্যা সাজাতেন প্রমদাচরণ। গল্প, উপন্যাস, কবিতার পাশাপাশি থাকত রকমারি নিবন্ধ, মনীষীদের জীবনী, দেশ-বিদেশের সংবাদ ইত্যাদি। প্রকাশিত রচনার মধ্যে দিয়ে বালক-বালিকাদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশ ঘটানোই ছিল প্রমদাচরণের উদ্দেশ্য। ‘সখা’ পত্রিকায় প্রমদাচরণ (Promodacharan Sen) নিজে যেমন লিখতেন, তেমনই সমসাময়িক ছোটদের লেখকদের দিয়েও ভাল লেখা লিখিয়ে নিতেন। তালিকায় ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরি, খগেন্দ্রনাথ মিত্রে’র মতো শিশু সাহিত্যিকরা। উল্লেখ্য, উপেন্দ্রকিশোর পরবর্তীকালে যে ‘সন্দেশ’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন তার আড়ালে ছিল সখা পত্রিকার এক বৃহৎ ভূমিকা।

১৮৮৫ সালের ২১ জুন প্রয়াত হন প্রমদাচরণ। তাঁর অবর্তমানে সাময়িকভাবে সখা’র সম্পাদনা করেছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রী। পরে সে দায়িত্ব নেন অন্নদাচরণ সেন ও নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য। প্রমদাচরণের অকালপ্রয়াণ বাংলা সাহিত্যে এবং বাঙালি সমাজের কাছে যে একটি বড় ক্ষতি সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।

Related Articles