সম্পাদকীয়

Online Trolling: ট্রল সংস্কৃতি- জনপ্রিয়তার ফাঁদ নাকি মানসিক নির্যাতনের হাতিয়ার?

বিষয়টির সূত্রপাত নব্বই-এর দশকে হলেও জনপ্রিয়তা বেড়েছে ২০১১ সালের পর থেকে।

শম্পা পাল: ডিজিটাল মিডিয়ায় বা সংবাদমাধ্যমে অথবা সামাজিক মাধ্যমগুলো খুললেই আজকাল দেখা যায় ‘ট্রল করা’ হচ্ছে। কিন্তু এই বিষয়টি কী?  আপাতদৃষ্টিতে আমাদের যেটুকু চোখে পড়ে কোনও বিখ্যাত ব্যক্তি-হতে পারেন তিনি, কোনও বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হতে পারেন বা  অভিনেতা, খেলোয়াড়, সংগীতশিল্পী অথবা সাধারণ মানুষ প্রত্যেকেই এই শব্দটির শিকার হচ্ছেন। প্রসঙ্গত, বিখ্যাত আইরিশ লেখক অস্কার ওয়াইল্ড বলেছিলেন, “Don’t feed the trolls, nothing fuels them so much”। বাক্যটির বাংলা তর্জমা করলে অর্থ দাঁড়ায় ‘ইচ্ছাকৃত কটূক্তি’কে প্রশ্রয় না দিয়ে অগ্রাহ্য করাই উচিত, বিশেষ গুরুত্ব না দেওয়াই ভাল। বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমে ট্রোলিং বিষয়টিকে অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। ট্রোলিং আসলে নির্দিষ্ট কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই কোনও ব্যক্তির প্রতি ধ্বংসাত্মক অথবা বিকৃত ব্যবহার। এই ব্যবহারই কখনও কখনও ব্যক্তিগত আক্রমণের ঊর্ধ্বে গিয়ে অশ্লীল ব্যবহারের পরিচয় দেয়। খুব দ্রুত এই ঘটনাগুলি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে, সংবাদমাধ্যমে, সর্বোপরি গণমাধ্যমে। বর্তমানে আবার অনেক মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়গুলিকে তৈরি করেন কম সময়ে জনপ্রিয়তা পাওয়ার আশায়। সাধারণ মানুষ বিষয়গুলি থেকে সাময়িক কিছু সময়ের জন্য আনন্দ লাভ করে (Online Trolling)।

বিষয়টির সূত্রপাত নব্বই-এর দশকে হলেও জনপ্রিয়তা বেড়েছে ২০১১ সালের পর থেকে। কোন ক্ষুদ্র ঘটনাই দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করছে বিকৃত মন্তব্যের কারণে। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী মানুষদের ক্ষেত্রে এই ট্রোলিং প্রভাব ফেলেছে প্রতি মুহূর্তে। বর্তমানে কিশোর-কিশোরী এবং যুবক-যুবতীরা অনেক বেশি মাত্রায় সামাজিক মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত। তাই তাদের ক্ষেত্রে এই জাতীয় ঘটনার প্রভাব পড়েও অনেক বেশি। তবে শুধুমাত্র কমবয়সীদের মধ্যে এমন প্রভাব দেখা যাচ্ছে সেটাও সঠিক নয়, মধ্যবয়স্ক মানুষরাও ট্রোলিং-এর নেতিবাচক প্রভাবের শিকার। মানুষ হতাশার শিকার হচ্ছেন, ধীরে ধীরে মানসিক অবসাদ গ্রাস করছে মানুষকে। সামাজিকভাবে মানুষ পারস্পরিক মেলামেশা ত্যাগ করে একাকিত্বকেই বেছে নিচ্ছেন। এই ঘটনাই কখনও কখনও আত্মহত্যায় প্ররোচিত করছে মানুষকে (Online Trolling)।

আরও পড়ুন: Celebrity Romance: লন্ডনের রাস্তায় প্রেমে মজে জাহ্নবী-শিখর, ভাইরাল ভিডিয়ো

সমালোচনা এবং ট্রোলিং এক হতে পারে? সমালোচনা বস্তুনিষ্ঠ, গঠনমূলক, বিজ্ঞান যুক্তিনির্ভর, সৌজন্যমূলক সৃজনশীল আলোচনা। যা একজন মানুষকে সংশোধনের পথ দেখায়। ট্রোলিং-এর ভাষা অবজ্ঞার, অশ্লীল, মজার। ট্রোলিং কোনও নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে হয় না, যে কোনও তুচ্ছ বিষয়কে নিয়েই সাময়িকভাবে কিছুটা সময় অতিবাহিত করার উদ্দেশ্যেই ট্রল করা হয়। অল্প সময়েই অনেক বেশি সংখ্যক মানুষের দ্বারাই তা ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমগুলিতে। মানুষ সেগুলিকে দেখে এবং বিনোদনে অংশগ্রহণ করে। এই বিনোদন কখনও কখনও ব্যাপকভাবে মানুষকে সমস্যার মধ্যে ফেলে। মানুষ পারস্পরিক বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ে (Online Trolling)।

ট্রলের আবার ইতিবাচক দিকটিও দেখা যায়। রাষ্ট্রের আর্থ সামাজিক, রাজনৈতিক সমস্যায় ব্যাপকভাবে জনমত গড়ে তুলতে ট্রলের ভূমিকা আছে বৈকি। আর্থিক কেলেঙ্কারি হোক বা শিক্ষা দুর্নীতি, সব ক্ষেত্রে ট্রোলিং হয়েছে ব্যাপক। এই ধরুন, সাম্প্রতিকতম সময়ের ভারতবর্ষের সবথেকে আলোচ্য বিষয় ছিল অপারেশন সিঁদুর। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানে হামলার প্রসঙ্গে যখন সব থেকে বেশি বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রির সমস্ত মাধ্যমে প্রশংসা চলছে, হঠাৎই সেখানে যবনিকা পতন। আমেরিকা দাবি করে বসল যে তাদেরই হস্তক্ষেপে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ বিরতি ঘটেছে। আর তৎক্ষণাৎ সামাজিক মাধ্যমগুলিতে শুরু হল বিদেশ সচিবকে কেন্দ্র করে ট্রোলের বন্যা। তাই ট্রলিং কখনও কখনও শুধুমাত্র উত্ত্যক্ত করাকেই বোঝায় না, অনেক জটিল বিষয় অতি সাধারণ মানের চিন্তাভাবনায় পর্যবসিত হয় (Online Trolling)।

Bangla Jago fb page: https://www.facebook.com/share/193NB43TzC/

এত কিছু সত্ত্বেও যখন ট্রোলিং এত জনপ্রিয়, তখন নিশ্চয়ই আপনাদেরও মনে প্রশ্ন জাগবে জনপ্রিয়তার কারণ কী? আসলে অল্প সময়ে কোনও গোষ্ঠীর মধ্যে কিছু সংখ্যক মানুষ কোনও একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে বা ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে উত্ত্যক্ত বাক্যবিনিময় শুরু করে। জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ অল্প সময়ের মধ্যে একটি গোষ্ঠীর অনেক মানুষের সঙ্গে পারস্পরিক ভাব বিনিময় ঘটে, ঘৃণাসূচক মন্তব্যের দ্বারা খুব সহজে জনপ্রিয় হওয়া যায়। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় এর চল অনেক বেশি। এই মুহূর্তে আপনাদের কাছে যে মানুষটির কথা বলব তিনি তার পেশাগত জীবনে, দীর্ঘ অভিনয় জীবনে কখনওই বিতর্কের সম্মুখীন হননি। বাঙালি তথা আপামর ভারতবাসীর কাছে তাঁর অভিনয় বহুল প্রশংসিত। তিনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এই মানুষটিও জীবনের শেষ সময়ে এসে অপমানজনক ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। যে মানুষগুলি নিছক মজার উদ্দেশ্যে এই ধরনের কুরুচিকর কাজ করে থাকেন মনোবিদরা তাদের উদ্দেশে বলেছেন এগুলি বিকৃত মস্তিষ্কপ্রসূত (Online Trolling)।

রাজনৈতিক ট্রল দেশে এই মুহূর্তে মারাত্মক। এই বিষাক্ত বিষয়টিকে প্রতিহত করার একমাত্র অস্ত্র অগ্রাহ্য করা। অনেকেই নিজের পরিচয় গোপন রেখে আপত্তিকর মন্তব্য করে। তাদের ফাঁদে পা না দিয়ে বিষয়টিকে এড়িয়ে চলুন। কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনকে না জেনে অহেতুক আক্রমণ করবেন না। সামাজিক মাধ্যমগুলিতে আজকাল এই বিষয়টির উপর নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। যে কোনও সাধারণ মানুষ ও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। প্রয়োজনে কুরুচিসম্পন্ন ব্যক্তিটিকে ব্লক করতে পারে। গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে পরিচিত মানুষ ছাড়া অপরিচিত মানুষের মন্তব্য করার সুযোগ বন্ধ করে রাখতে পারে। আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। ট্রলিং কল্যাণকর স্বার্থে কখনওই ব্যবহৃত হতে পারে না। আসুন প্রত্যেকে সতর্ক হই, সচেতন ভাবে অশ্লীল ট্রোলিং বন্ধ হোক আগামী দিনে।

 

Related Articles