সম্পাদকীয়

Eco Tourism: ইকো-ট্যুরিজম কি সত্যিই প্রকৃতি সংরক্ষণে কার্যকর?

ইকো-ট্যুরিজম মূলত এমন এক পর্যটন ধারা, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের সহাবস্থান তৈরি হয়।

বিশ্বজিৎ বৈদ্য, (বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক): মানুষের জীবনে ভ্রমণ এক অমোঘ আকর্ষণ। প্রকৃতি দর্শন, নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিতি, মানসিক প্রশান্তি এবং আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই ভ্রমণের নেশায় উদ্বুদ্ধ। কেবল ব্যক্তিগত তৃপ্তিই নয়, আধুনিক বিশ্বে পর্যটন শিল্প অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। বৈশ্বিক জিডিপি-র একটি বড় অংশ পর্যটন খাত থেকে আসে এবং কোটি কোটি মানুষ এই খাতের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। তথাপি পর্যটন শিল্পের দ্রুত বিস্তার একদিকে যেমন উন্নয়নের দরজা খুলছে, অন্যদিকে প্রকৃতির উপর অত্যন্ত চাপ তৈরি করছে। পাহাড় কেটে হোটেল, সমুদ্রসৈকতে প্লাস্টিক বর্জ্য, অরণ্যে নিরবচ্ছিন্ন ভিড়— এসব মিলিয়ে জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য আজ মারাত্মক সঙ্কটের মুখে। এই সঙ্কট নিরসনের দাবিতে উত্থিত হয়েছে নতুন ধারণা— ইকো-ট্যুরিজম বা পরিবেশবান্ধব পর্যটন। কিন্তু এই ইকো-ট্যুরিজম কি সত্যিই প্রকৃতি সংরক্ষণে কার্যকর, নাকি কেবল ব্যবসার নতুন নাম, এই প্রশ্নই আজকের আলোচনার কেন্দ্রে (Eco Tourism)।

ইকো-ট্যুরিজম মূলত এমন এক পর্যটন ধারা, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের সহাবস্থান তৈরি হয়। পর্যটকরা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেন, তবে তাঁরা প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেন না। বরং এই ভ্রমণের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হয় এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে উৎসাহিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, লাতিন আমেরিকার কোস্টারিকা ইকো-ট্যুরিজমে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছে। সেখানকার ঘন অরণ্য ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটন আয় স্থানীয় মানুষের উন্নয়নে ব্যবহৃত হয়। ফলে প্রকৃতি রক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নও সম্ভব হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ সেনার গাড়ি আটক, ট্রাফিক আইন ভাঙার অভিযোগ! প্রকাশ্যে সিসিটিভি ফুটেজ

তর্কের পক্ষে যুক্তি হল, ইকো-ট্যুরিজম পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তোলে। একজন পর্যটক যখন জঙ্গলে হাঁটতে হাঁটতে বিরল পাখির ডাক শোনেন বা প্রবাল দ্বীপে গিয়ে দেখেন সাগরের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র কতটা সংবেদনশীল, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই পরিবেশ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। এই অভিজ্ঞতা কেবল ভ্রমণের আনন্দ নয়, বরং তার জীবনাচরণে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। তিনি হয়তো নিজ শহরে ফিরে গিয়ে প্লাস্টিক কম ব্যবহার করবেন, অথবা জলবায়ু আন্দোলনের সমর্থক হবেন। অর্থাৎ, ইকো-ট্যুরিজম একদিকে স্থানীয় প্রকৃতি সংরক্ষণে সাহায্য করে, অন্যদিকে বৈশ্বিক পরিবেশ আন্দোলনে জনসচেতনতা সৃষ্টি করে (Eco Tourism)।

আবার ভারতের সিকিম রাজ্যের অভিজ্ঞতা এর একটি বড় উদাহরণ। সেখানে সরকার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্যোগে ‘প্লাস্টিক ফ্রি ট্যুরিজম’ চালু হয়েছে। পর্যটকদের প্লাস্টিক বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, স্থানীয় পরিবারগুলোকে হোম স্টে চালাতে উৎসাহিত করা হয়েছে, এবং ভ্রমণকে প্রকৃতি-কেন্দ্রিক রাখা হয়েছে। এর ফলে সিকিম আজ ভারতের একটি অন্যতম পরিবেশবান্ধব পর্যটন গন্তব্য। একইভাবে কেরলের ব্যাকওয়াটার অঞ্চলেও হাউসবোট ট্যুরিজম স্থানীয় জেলেদের জীবিকা দিয়েছে, সেই সঙ্গে নদী-খাল সংরক্ষণে অর্থ জুগিয়েছে।

কিন্তু এর বিপরীত দিকও উপেক্ষা করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ‘ইকো-ট্যুরিজম’ কেবল একটি ব্যবসায়িক কৌশল। বাস্তবে যেখানে পরিবেশ সংরক্ষণের বদলে প্রকৃতিকে আরও বেশি ক্ষতি করা হয়। যেমন সুন্দরবনে পর্যটনকে ‘ইকো-ট্যুরিজম’ বলা হলেও, সেখানকার বাস্তবতা ভিন্ন। বাঘ দেখার নেশায় নদীপথে অসংখ্য নৌকা, অনিয়ন্ত্রিত হোটেল এবং পর্যটকদের অবহেলায় ছড়িয়ে পড়া প্লাস্টিক বর্জ্য বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত করে তুলছে। ফলে এখানে ‘ইকো-ট্যুরিজম’ পরিবেশ সংরক্ষণের বদলে পরিবেশ ধ্বংসের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে (Eco Tourism)।

আর একটি বড় সমস্যা হল ‘ক্যারিং ক্যাপাসিটি’ বা বহনক্ষমতা। প্রতিটি অঞ্চলের একটি সীমা আছে, তার বেশি পর্যটক প্রবেশ করলে পরিবেশ তা সহ্য করতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে এই সীমা মানা হয় না। উদাহরণস্বরূপ, উত্তরাখণ্ডে অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ হিমালয়ের ভঙ্গুর পরিবেশকে চরম সঙ্কটে ফেলেছে। হিমবাহ দ্রুত গলছে, হিমানী সম্প্রপাত বাড়ছে, পাহাড়ি জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে। অথচ এখানেও ইকো-ট্যুরিজমের নাম ব্যবহার করে পর্যটন বাড়ানো হচ্ছে।

আফ্রিকার কেনিয়া বা তানজানিয়ার সাফারি ট্যুরিজমও একই দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। সিংহ, হাতি বা জেব্রা দেখার জন্য অগণিত পর্যটক জঙ্গলে ঢুকছেন, ফলে প্রাণীকুলের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। আবার স্থানীয় অর্থনীতি এতে সমৃদ্ধ হচ্ছে, যা জনগণকে সংরক্ষণের দিকে টেনে নিচ্ছে। ফলে এখানে দ্বিমুখী চিত্র— অর্থনীতি বাড়ছে, তবে প্রকৃতির স্বাভাবিকতা কমছে (Eco Tourism)।

Truth of Bengal fb page: https://www.facebook.com/truthofbengal

তর্কের উভয় দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইকো-ট্যুরিজম কার্যকর হতে হলে কিছু শর্ত মানতেই হবে। প্রথমত, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ। যদি তারা পর্যটন থেকে আয় পায়, তবে তারা নিজেরাই প্রকৃতি রক্ষায় উদ্যোগী হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারকে কঠোরভাবে পরিবেশ আইন প্রয়োগ করতে হবে। তৃতীয়ত, পর্যটকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা দায়িত্বশীল ভ্রমণকারী হন। আর চতুর্থত, ক্যারিং ক্যাপাসিটির সীমা অতিক্রম না করতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকা চাই।

ইকো-ট্যুরিজমে আদৌ কি পরিবেশ রক্ষা করা যায়? এর উত্তর সরল নয়। হ্যাঁ, ইকো-ট্যুরিজম প্রকৃতিকে রক্ষা করতে পারে, তবে তখনই যখন এটি সত্যিকারের পরিবেশবান্ধব, সৎ উদ্দেশ্যপ্রসূত এবং সীমিতভাবে পরিচালিত হয়। অন্যথায়, এটি পরিবেশ রক্ষার আড়ালে প্রকৃতিকে আরও ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে (Eco Tourism)।

সর্বোপরি বলা যায়, ইকো-ট্যুরিজম একটি দ্বিমুখী বাস্তবতা। এটি একদিকে মানুষের ভ্রমণপ্রিয়তা মেটায় এবং পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তোলে, অন্যদিকে ব্যবসায়িক স্বার্থে অপব্যবহৃত হলে পরিবেশ ধ্বংস ত্বরান্বিত করে। তাই আমাদের দায়িত্ব হলো ইকো-ট্যুরিজমকে সুস্থায়ী উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা, ব্যবসার মুখোশ হিসেবে নয়। প্রকৃত অর্থে এটি কার্যকর হলে ইকো-ট্যুরিজম শুধু পরিবেশ রক্ষাই করবে না, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ ও ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবীও গড়ে তুলবে।

Related Articles