শুধু রাষ্ট্রনায়ক নন, ড. রাধাকৃষ্ণণ ছিলেন একজন মহান শিক্ষক ও দার্শনিক
দুর্ভাগ্যজনকভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্রমশ বাণিজ্যিকীকরণের পথে হাঁটছে।
ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী (রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত জাতীয় শিক্ষক): শিক্ষকতা মানবসমাজের সর্বশ্রেষ্ঠ ও মহত্তম পেশাগুলির একটি। শিক্ষক কেবল জ্ঞানদানকারীই নন, তিনি চরিত্রগঠনের কারিগর, সমাজনির্মাতা এবং জাতির ভবিষ্যৎ স্থপতি। শিক্ষকতার মহান আদর্শ হল শিক্ষার্থীর মধ্যে মানবিকতা, সত্যনিষ্ঠা, জ্ঞানপিপাসা এবং নৈতিকতার বীজ বপন করা। কিন্তু আজ যখন আমরা চারপাশে তাকাই, দেখি এই আদর্শ অনেকাংশেই কলুষিত হয়ে পড়েছে।
[আরও পড়ুন: শুক্রেও কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টি, উত্তরবঙ্গে বাড়বে বর্ষার দাপট]
অনেক শিক্ষক শিক্ষকতাকে কেবল জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করছেন, শিক্ষার্থীর চরিত্রগঠনের দায়িত্বকে অস্বীকার করছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্রমশ বাণিজ্যিকীকরণের পথে হাঁটছে। এই অস্থির সময়ে আমাদের মনে পড়ে এক মহান দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক- ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের (Dr. Sarvepalli Radhakrishnan) নাম। তিনি ছিলেন এমন এক শিক্ষক যিনি শিক্ষকতার আসল মানে সমাজকে শিখিয়েছিলেন। তাঁর জীবন ও কর্ম আজও আমাদের সামনে এক আলোকবর্তিকা, এক অনন্য দিকনির্দেশনা। যখন শিক্ষকতার আদর্শভ্রষ্ট হয়, তখন তাঁর শিক্ষাদর্শই আমাদের আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে পারে।
শিক্ষকতার মহিমা:
ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
ভারতবর্ষে শিক্ষক বা ‘গুরু’ প্রাচীনকাল থেকেই পূজনীয়। গুরুকুল প্রথায় শিক্ষকের ভূমিকা ছিল সর্বোচ্চ। শিষ্যরা শিক্ষকের আশ্রমে থেকে শুধু বিদ্যাই নয়, জীবনযাপনের সবকিছু শিখত। শিক্ষক ছিলেন একদিকে জ্ঞানপ্রদাতা, অপরদিকে নৈতিকতার রক্ষক।
তবে আধুনিক কালে শিক্ষকের ভূমিকা বদলেছে। বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে কাঠামোগত, শিক্ষকরা হয়েছেন বেতনভোগী কর্মচারী। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অনেকটাই কমেছে। তদুপরি সমাজে ভোগবাদ, প্রতিযোগিতা ও লোভের বিস্তার শিক্ষকতার মহত্ত্বকে আঘাত করেছে।
ড. রাধাকৃষ্ণণ বলেছেনঃ
‘The true teachers are those who help us think for ourselves.’
ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ (Dr. Sarvepalli Radhakrishnan), জীবন ও আদর্শ
ড. রাধাকৃষ্ণণ (১৮৮৮–১৯৭৫) কেবল রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক মহান শিক্ষক ও দার্শনিক। অল্প বয়স থেকেই তাঁর মধ্যে জ্ঞানের প্রতি গভীর আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। তিনি দর্শনশাস্ত্রে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন এবং তাঁর লেখনী ও বক্তৃতার মাধ্যমে ভারতীয় দর্শনের মহিমা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন।
তাঁর জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল শিক্ষকতার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। তিনি মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনা দিয়ে শুরু করে পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের ও বিদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেন। একসময় তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যাপক হিসেবে ভারতীয় দর্শন পড়িয়েছেন। তাঁর ব্যক্তিত্বে ছিল বিনয়, মানবিকতা ও সহিষ্ণুতা।
তিনি বলেছেনঃ
‘Teachers should be the best minds in the country.’
শিক্ষকতার মহান দর্শন
ড. রাধাকৃষ্ণণ শিক্ষকতার যে দর্শন আমাদের সামনে রেখেছেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
১) শিক্ষক হলেন আলোকবর্তিকা- তিনি মনে করতেন, শিক্ষক সমাজে আলোকবর্তিকার মতো, যিনি অন্ধকার দূর করে আলোর পথ দেখান।
২) শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল তথ্য সংগ্রহ নয়- তাঁর মতে, শিক্ষা মানে শুধু তথ্য মুখস্থ নয়, বরং সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার বিকাশ।
৩) গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক- তিনি গুরু-শিষ্য পরম্পরায় ঐতিহ্যের গুরুত্বে বিশ্বাসী ছিলেন।
৪) নৈতিকতার গুরুত্ব- তিনি চরিত্র গঠনের শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন।
তিনি বলেছেনঃ
‘The end-product of education should be a free creative man, who can battle against historical circumstances and adversities of nature.’
শিক্ষকতার আদর্শের অবক্ষয় – বর্তমান বাস্তবতা
আজকের দিনে আমরা দেখতে পাই শিক্ষাক্ষেত্রে নানা ধরনের সংকট—
১) শিক্ষকরা অনেকেই শিক্ষকতাকে শুধু চাকরি হিসেবে দেখছেন।
২) শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিবর্তে কোচিং সেন্টারে পড়ানোর প্রবণতা।
৩) দুর্নীতিগ্রস্ত নিয়োগ যোগ্য শিক্ষককে বঞ্চিত করছে।
৪) ছাত্র-শিক্ষকের আন্তরিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ছে।
ফলে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত অনুপ্রেরণা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
রাধাকৃষ্ণণ (Dr. Sarvepalli Radhakrishnan) বলেছেনঃ
“The true purpose of education is not only to acquire knowledge but also to make men truthful, moral and compassionate.”
সমাধানের পথ : ড. রাধাকৃষ্ণণের (Dr. Sarvepalli Radhakrishnan) দৃষ্টিতে
এই অবস্থায় ড. রাধাকৃষ্ণণের শিক্ষাদর্শ আমাদের সামনে কিছু পথ খুলে দেয়—
১. শিক্ষকের আত্মশুদ্ধি : শিক্ষককে প্রথমে নিজেকে আদর্শবান হতে হবে।
২. শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণ থেকে মুক্ত করা।
৩. শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক পুনর্গঠন।
৪. নৈতিক শিক্ষার প্রসার।
৫. শিক্ষকের মর্যাদা পুনরুদ্ধার।
রাধাকৃষ্ণণ (Dr. Sarvepalli Radhakrishnan) বলেছেনঃ
“When we think we know, we cease to learn.”
আজ যখন শিক্ষকতার মহান আদর্শ কলুষিত, তখন ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের জীবন ও চিন্তা আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, শিক্ষকতা শুধুমাত্র পেশা নয়—এটি এক মহান দায়িত্ব, এক পবিত্র সাধনা। একজন শিক্ষক যদি প্রকৃত শিক্ষক হতে চান, তবে তাঁকে জ্ঞান, চরিত্র, বিনয় ও মানবিকতার সমন্বয় ঘটাতে হবে। আমরা যদি আবার সেই শিক্ষকতার আদর্শকে ফিরিয়ে আনতে চাই, তবে ড. রাধাকৃষ্ণণের শিক্ষাদর্শকেই সামনে রাখতে হবে।
[আরও পড়ুন: দেশের সেরা দশে যাদবপুর, কেন্দ্রের স্বীকৃতিতে খুশি মুখ্যমন্ত্রী]
তাঁর উক্তি (শিক্ষক দিবসে বক্তৃতা, ১৯৬২):
‘Instead of celebrating my birthday, it would be my proud privilege if September 5th is observed as Teachers’ Day.’
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, শিক্ষক জাতির নির্মাতা। শিক্ষকতার আদর্শ যদি ভ্রষ্ট হয়, তবে জাতি অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। কিন্তু যদি শিক্ষক সত্যিকার শিক্ষক হন, তবে সেই আলোয় আলোকিত হবে পুরো সমাজ।




