সম্পাদকীয়

শব্দব্রহ্ম থেকে শব্দ-দানব: যখন সুর হয় যন্ত্রণা

মানুষের শ্রবণসীমা ক্ষমতার বাইরে, অতি উচ্চগ্রামের শব্দই -শব্দ-দূষণ!

প্রভাত কুমার মিত্র (বিশিষ্ট সমাজকর্মী): বিভিন্ন কম্পন যখন বাতাসের মাধ্যমে,মানুষের বা পশু-পাখির কানে প্রবেশ করে -সেটাকেই বলে শব্দ। শব্দব্রহ্ম! শব্দ না থাকলে আমাদের জীবনটা বিরস হয়ে যেত। পারস্পরিক কথা বার্তা,আলাপ চারিতা,গান বাজনা,পাখির ডাক, ঝরনার শব্দ, বৃষ্টির শব্দ, এসবের মিষ্টি ছন্দে আমরা শান্তি পাই। কিন্তু এই শব্দই যদি আমাদের শ্রবণ ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন তা এক যন্ত্রণার কারণ হয়, নানারকম রোগ ব্যাধির কারণ হয়। মানুষের শ্রবণসীমা ক্ষমতার বাইরে, অতি উচ্চগ্রামের শব্দই -শব্দ-দূষণ!

সব শব্দই-শব্দ দূষণ নয় অবাঞ্ছিত, বিরক্তিকর, অপ্রীতিকর অথবা আতি উচ্চগ্রামের শব্দকেই বলে-শব্দ দূষণ। আমাদের কান-ই চমৎকারভাবে বলে দেবে শব্দ কি। সাধারণভাবে, বিরক্তিকর উচ্চগ্রামের শব্দ, যা অস্বস্তি অথবা জ্বালাতনের পর্যায়ে চলে যায়, তাই শব্দ দূষণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী ৬৫ ডেসিবেলের বেশি শব্দকেই শব্দ দূষণ বলে। ৭৫ ডেসিবেলের বেশি হলে শব্দ ক্ষতিকারক, আর ১২০ ডেসিবেল হারে তা যন্ত্রণাদায়ক! সুপারিশ করা হয়, দিনের বেলা ৬৫ ডেসিবেল শব্দ সহনীয় আর রাতের বেলা ঘুমোবার সময়, শব্দ যেন ৩০ ডেসিবেলের বেশি না হয়।

মানুষের শ্রবণযোগ্য শব্দ বিভিন্ন উৎসের কম্পাঙ্কের তারতম্য অনুযায়ী পরিমাপ করা হয়। সেই পরিমাপকে বলে ‘ডেসিমেল’। টেলিফোন এবং অডিওমিটার-এর আবিস্কর্তা অ্যালেকজান্ডার গ্রাহাম বেল-কে সম্মান জানাতে ‘ডেসিমেল’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। অডিওমিটার এমন একটি যন্ত্র, যা মানুষের শব্দ শোনার ক্ষমতাকে পরিমাপ করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিদান অনুযায়ী, মানুষের শ্রবণ ক্ষমতার নিরাপদ মাত্রা হল ৮৫ ডেসিমেল, সর্বোচ্চ আট ঘন্টা পর্যন্ত। ৮৫ ডেসিমেল-এর বেশি শব্দ দীর্ঘ সময় ধরে কানে গেলে, কানের স্পর্শকাতর টিস্যুগলি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে অথবা শ্রবণ শক্তি চিরতরে চলে যেতে পারে।

সমস্ত শব্দ দূষণের উৎস মানুষ। মাইকের শব্দ,বাজির শব্দ, রাস্তায় ট্রাম, বাস, ট্যাক্সি, লরি, মোটরের হর্ণ সহ যানবাহন চলাচলের শব্দ হয় অতি উচ্চগ্রামে। আকাশ দিয়ে এরোপ্লেন উড়ে যাওয়ার শব্দ হয় ১৩০ ডেসিবেল।বাড়ি ভাঙা, বাড়ি তৈরি, ব্রিজ তৈরিতেও হয় অতি উচ্চগ্রামের শব্দ। বার, রেষ্টুরেন্টে কোলাহল আর যখন গান বাজনা হয় তখন তা ১০০ ডেসিবেল ছাড়িয়ে যায়। জীব জন্তুদের শব্দ, যেমন কুকুরের ডাক-এর তীব্রতা ৬০ থেকে ৮০ ডেসিবেল।

ভারতে আইন করা হয়েছে, রাত দশটার পরে কোনও জমায়েতে বা পার্টিতে জোরে গান বাজনা নিষিদ্ধ। খুব জোরে গান বাজনা মানসিক অসুস্থতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং বধির হয়ে যাওয়র কারণ হতে পারে। সেইজন্য আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত-ঘরে এবং বাইরের শব্দকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে আইন, আইনই থেকে গেছে।

যেকোনও পুজো, অনুষ্ঠান, বিয়েবাড়ি, রাজনৈতিক জমায়েতে অসম্ভব জোরে মাইক বা ডিজে বাজানো এখন এক রেওয়াজ হয়েছে। এর উদ্দেশ্য বোধহয় একটাই, সবাইকে নিজেদের ক্ষমতা এবং প্রতিপত্তি জানানো। কাউকে তোয়াক্কা না করে, অপরের অস্বস্তি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে। এক ধরণের বিজাতীয় নিম্নস্তরের আনন্দ হয়-এক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে। এমনকি হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, বাড়ির অসুস্থ বয়স্ক মানুষদের কথাও এই শব্দ বিস্ফোরণের সময় মানা হয়না। ফলে এই শব্দদানবের অত্যাচারে মানসিক বৈকল্য, মানসিক অস্বস্তি, এমনকি নিজেদের মধ্যে কথা বলাও বন্ধ হয়ে যায়।

শব্দ দূষণ কিন্তু নিয়ন্ত্রিত করা যায়, যদি আমরা নিজেরা একটু সচেতন হই। আমরা বাড়িতে বাসনপত্র রাখার সময় সাবধানে সেগুলি রাখতে পারি, যাতে শব্দ কম হয়। জেনারেটর বা ইনভার্টার থেকে যেন কম শব্দ বার হয়। মোটর বাইকে যেন সাইলেস্নর লাগানো থাকে। টিভি দেখার সময় যেন কম ভলিউম থাকে। জন্মদিন, পার্টি, বিয়েবাড়িতে যেন কম হইহুল্লোর হয়। পাড়া বা ক্লাবের পুজোতে যেন ডিজে বা মাইকের শব্দ দানব অপরকে অতিষ্ঠ করতে না পারে -এগুলি নিয়ন্ত্রিত করা আমাদেরই কাজ। সবাইকে সচেতন হতে হবে শব্দ দূষণের ভয়াবহ কুফল সম্পর্কে। স্কুল, কলেজ, পঞ্চায়েত সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সচেতনতা শিবিরের মাধ্যমে সবাইকে সচেতন করতে হবে শব্দ দূষণ সম্পর্কে। এমনকি শিশুদের পাঠ্য বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত এই বিষয়টি।

Related Articles