Bengali Jatra: যাত্রাপালা এবং তার মুকুটহীন সম্রাট ভৈরবনাথ গঙ্গোপাধ্যায়
এই যাত্রাপালা প্রাক আর্যসভ্যতার মতই সাবেক, খাঁটি, দেশীয় এবং স্বকীয়। কিছু সারিবদ্ধ মানুষের বিশেষভাবে একস্থান থেকে আর এক স্থানে যাতায়াতের কথাই যাত্রা নামে পরিচিত।
বিশ্বজিৎ ঘোষ: প্রায় প্রাগৈতিহাসিক যুগের লেখক ভরত মুনি তাঁর ‘নাট্যশাস্ত্র’ গ্রন্থে নাটকের উৎপত্তি, রূপ ও রীতি নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন। এই গ্রন্থটি সংস্কৃত ভাষায় লেখা। ব্যাকরণের ক্ষেত্রে যেমন পাণিনি, অর্থশাস্ত্রে চাণক্য– তেমনই নাট্যশাস্ত্রে ভরতমুনির গ্রন্থকে আকর এবং মূল গ্রন্থ হিসাবে ধরা হয়। এই গ্রন্থটি সংস্কৃত ভাষায় লেখা হলেও আধুনিক এবং আভিজাত্য সম্পন্ন প্রসেনিয়াম থিয়েটার কিন্তু এই গ্রন্থকে সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছে এবং এই গ্রন্থের নীতিমালা বা নাটকের যে বিধান দেওয়া হয়েছে, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন না করলেও এই গ্রন্থকে একেবারে পরিত্যক্ত করেনি। বরং আধুনিক নাটকের বড় বড় কলাকুশলীদের বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এই গ্রন্থের উল্লেখ করতে শোনা যায়। তবে ভরত মুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’ নাটক নামের যে কলার কথা উল্লেখ করেছেন, তারও আগে থেকে দেশীয় খাঁটি যাত্রাপালার অস্তিত্বের অনুমান করা যায়। অনেকটা ইতিহাসের এই ঘটনার মতো। যেমন সিন্ধুসভ্যতা বা আর্যসভ্যতার আগেও দেশীয় সভ্যতার হদিশ পাওয়া যায়। যা বহিরাগত আর্যদের অস্তিত্বের আগেও বর্তমান ছিল। ঠিক তেমনই নীতিনির্ধারণ নিয়মে বাঁধা নাটক বা আধুনিক থিয়েটারের আগেও যাত্রাপালার অস্তিত্ব বর্তমান (Bengali Jatra)।
এই যাত্রাপালা প্রাক আর্যসভ্যতার মতই সাবেক, খাঁটি, দেশীয় এবং স্বকীয়। কিছু সারিবদ্ধ মানুষের বিশেষভাবে একস্থান থেকে আর এক স্থানে যাতায়াতের কথাই যাত্রা নামে পরিচিত। সাধারণত উৎসব অনুষ্ঠানের সময়েই কিছু মানুষের সমারোহ বা বাদ্যগীত যন্ত্র সহকারে যাতায়াতকে যাত্রা বলে চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তী এই যাত্রা তার আলুলায়িত পরিবেশ ছেড়ে বাঁধাধরা মঞ্চের মধ্যে উন্নীত হয়েছে। পরিক্রমার পথ ছেড়ে তা নিয়ম অনুযায়ী বিনোদনের মাধ্যম হিসাবে গড়ে উঠেছে। সেখানে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও তার খাঁটিত্বে কোনও ব্যাঘাত ঘটেনি। গ্রাম বাংলার এই যাত্রাপালার প্রমাণ চৈতন্য জীবনীকারদের লেখনিতেও পাওয়া যায়। এবং স্বয়ং চৈতন্যদেবও এই পালাকীর্তনে অংশগ্রহণ করতেন এমন প্রমাণও পাওয়া যায়। তার সাক্ষ্য প্রমাণ বয়ে নিয়ে চলে বিভিন্ন গৌরচন্দ্রিকা এবং গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদগুলি (Bengali Jatra)।
আরও পড়ুন: Abhisekh Banerjee: গুরুত্বপূর্ণ দলীয় বৈঠকের নেতৃত্ব দেবেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়
ঊনবিংশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্য শিক্ষার আলোকপ্রভায় এই সাবেক যাত্রাপালাতেও আসে আমূল পরিবর্তন। যাত্রা তার স্বাভাবিক ব্যাপার থেকে উঠে আসে পোশাকি পদ্ধতিতে। অর্থাত উন্নীত হয় মঞ্চাসনে। কিন্তু আবারও বলি, তথাকথিত নাটক এবং যাত্রাপালার অনেক পার্থক্য ছিল এবং এখনও তা বর্তমান। যাত্রাপালাকে যিনি আধুনিকতার ছোঁয়াই এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি হলেন ব্রজেন্দ্রনাথ দে। ব্রজেন বাবুর যাত্রাপালার কাহিনি পৌরাণিক। এবং সাবেক কাহিনি থেকে আস্তে আস্তে সামাজিকতার ছাদ ছুঁয়ে বাঙালির হৃদয় জীবনে প্রবেশ করেছিল। ঠিক এই সময় যাত্রাপালায় ব্রজেনবাবুর দেখানো পথে বাঙালির যাত্রাপালাকে মঞ্চ সফলের মধ্যে এক উচ্চতার শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিলেন যিনি, তিনি হলেন ভৈরবনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি সারাজীবন প্রায় দুই শতাধিক যাত্রাপালা রচনা করেন। তবে ভৈরবনাথ বাবু আধুনিকতার ছোঁয়াকে উপেক্ষা না করলেও তিনি যাত্রাপালার খাঁটিত্বকে বজায় রাখতে পেরেছিলেন। তাঁর অশেষ কৃতিত্ব তিনি সামাজিক নাটক রচনার মধ্যে দিয়ে গ্রাম বাংলা এবং তথাকথিত নগরজীবনের ঘরের চরিত্রকে মঞ্চে তুলে এনে মানুষের হৃদয়ে পাকাপাকি ভাবে স্থান করে নিয়েছিলেন (Bengali Jatra)।
Truth of Bengal fb page: https://www.facebook.com/share/1ADtx3ZZeU/
পালাকর্তা ভৈরবনাথবাবুর সর্বাধিক কৃতিত্ব হল, সামাজিক নাটক রচনায়। এরপরে সমাজের সর্বস্তরে তিনি ছাপ ফেলতে পেরেছিলেন। বাঙালির নিজের ঘরের চরিত্র, পাশের বাড়ির চরিত্র, সমাজ এবং ব্যবস্থা-ইংরেজিতে যাকে বলে সোসাইটি এবং সিস্টেম– তার খোলনলচে সাধারণ মানুষের কাছে দিনের আলোর মতো তুলে ধরেছিলেন। শুধু যাত্রাপালার সংলাপ রচনাই নয়, তিনি যাত্রাপালার নির্দেশনা এবং প্রযোজনার কাজেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তবে তাঁর সবচেয়ে কৃতিত্ব তিনি সামাজিক যাত্রাপালায় সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে সমাজকে সচেতন করার কাজ করেন। তবে আর একটা কথা না বললে তাঁর কৃতিত্বের কথা না বলাই থেকে যাবে তা হল, তাঁর যাত্রাপালার যাত্রার নাম এক একটা ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। যেমন ‘মা মাটি মানুষ’, বর্তমানে বঙ্গ রাজনীতির অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়। এছাড়াও তাঁর যাত্রাপালার নাম বা তার প্যারোডি প্রায় প্রবাদে পরিণত হয়েছে, যেমন ‘স্বর্গের পরের স্টেশন’, ‘ঠিকানা পশ্চিমবঙ্গ’ ইত্যাদি। ক্লাসিক বাংলা যাত্রাপালায় ব্রজেনবাবু যদি হন পথপ্রদর্শক বা পালা সম্রাট, তা হলে ভৈরববাবুকে বলা যায় যাত্রাপালার মুকুটহীন রাজা। তিনি তাঁর যাত্রাপালার মাধ্যমে গ্রাম বাংলার সমাজব্যবস্থাকে যেভাবে শিক্ষার পাঠ দিয়েছেন তা যেন বিদ্যালয় শিক্ষারই সমান। তবে তাঁর এই শুভচিন্তনকে বাঙলা তথা বাঙালি গ্রামজীবন বহুদিন মনে রাখবে (Bengali Jatra)।






